শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬ ।। ১৩ চৈত্র ১৪৩২ ।। ৮ শাওয়াল ১৪৪৭


মহাকবি আল্লামা ইকবালের সমাধিসৌধে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

ড. খালিদ হোসেন

২০২৫ সালের শেষের দিকে পাঞ্জাব সরকারের দাওয়াতে লাহোর সফর করি। লাহোরের আকাশ সেদিন যেন ইতিহাসের এক মলিন পাতা উল্টে দিচ্ছিল।  ঘন মেঘের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়েছে। আর বাতাসে এক অদ্ভুত নীরবতার সুর—যেন শতবর্ষ আগের কোনো কণ্ঠ আজও ভেসে আসে। সেই আবহেই আমি পৌঁছালাম হাজুরি বাগে—যেখানে ইতিহাস, স্থাপত্য আর আত্মার এক অপূর্ব মেলবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মহাকবি আল্লামা ইকবালের মাজার।

 বাদশাহী মসজিদের গাম্ভীর্য আর লাহোর দুর্গের ঐতিহাসিক প্রাচীরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ইকবালের সমাধিটি যেন সময়ের এক নিঃশব্দ সাক্ষী। লাল বেলেপাথরের সেই স্থাপত্য দূর থেকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে—না, শুধুই সৌন্দর্যের জন্য নয়; বরং তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক গভীর চিন্তার ঐতিহ্যের জন্য।

প্রথম দেখাতেই মনে হলো, এটি কেবল একটি সমাধি নয়—এ যেন এক দর্শনের আশ্রয়স্থল, যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি খোদাই যেন কোনো অদৃশ্য কবিতার পঙক্তি।

স্থাপত্যের নিঃশব্দ ভাষা

সমাধির কাছে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে মুঘল ও মুরিশ শৈলীর অপূর্ব সংমিশ্রণ। লাল বেলেপাথরের দৃঢ়তা যেন একদিকে শক্তির প্রতীক, অন্যদিকে ভেতরের মার্বেল পাথরের কোমলতা যেন আত্মার সূক্ষ্মতার কথা বলে। জানা গেল, এই মার্বেল পাথরগুলো আফগান সরকারের উপহার—যেন এক মুসলিম বিশ্ব থেকে আরেক বিশ্বকে ভালোবাসার নিদর্শন।

খোদাইকৃত নকশা, ক্যালিগ্রাফির রেখা, আর স্থাপত্যের প্রতিটি বাঁক—সবকিছু মিলিয়ে মনে হলো, ইকবালের চিন্তা ও কবিতার মতোই এই সমাধিও গভীর, সংযত, অথচ অসীম বিস্তৃত।

নীরবতার ভেতর এক সংলাপ

সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে যখন পবিত্র কুরআনের সুরা পাঠ করছিলাম তখন চারপাশের কোলাহল যেন দূরে সরে গেল। মনে হলো, এই নীরবতার মধ্যেই ইকবালের সেই অমর আহ্বান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—

"খুদিকে কর বুলন্দ ইতনা..."

লাহোরের আকাশ যেন সেদিন অশ্রুসিক্ত ছিল। মহাকবি আল্লামা ইকবালের সমাধির দিকে এগোতেই হঠাৎ অঝোর ধারায় নেমে এলো বৃষ্টি—মনে হলো, প্রকৃতি নিজেই যেন শ্রদ্ধার নীরব অর্ঘ্য নিবেদন করছে এই মহান কবির প্রতি।

সমাধি প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর মুহূর্তটি ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সিকিউরিটির সদস্যরা গার্ড অব অনার-এর মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ ভঙ্গিতে আমাকে ঘিরে লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কার্পেটের ওপর পড়ছিল ছন্দের মতো—যেন ইকবালের কবিতারই কোনো অদৃশ্য আবৃত্তি। সেই আবহের মধ্যেই আমি ধীর পায়ে সমাধি সৌধে প্রবেশ করি।

সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে এক গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। যথারীতি জিয়ারত করলাম, পাঠ করলাম ফাতেহা। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে গেছে—চারপাশে শুধু নীরবতা, আর সেই নীরবতার ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে এক অনির্বচনীয় অনুভূতির স্রোত। পরিদর্শন বইতে কয়েকটি বাক্য লিখে যেন নিজের শ্রদ্ধা নিবেদন সম্পূর্ণ করলাম।

সমাধি সৌধের গায়ে উৎকীর্ণ ছিল কবির অমর সব পঙক্তি। প্রতিটি শব্দ যেন জীবন্ত, প্রতিটি পঙক্তি যেন আজও কথা বলে। চোখ বুলাতে বুলাতে মনে হচ্ছিল, এ শুধু পাথরে খোদাই করা অক্ষর নয়—এ যেন এক জাতির চেতনা, এক যুগের স্বপ্ন।

কৈশোর থেকেই আল্লামা ইকবালের প্রতি আমার এক গভীর অনুরাগ। মাদরাসার দিনগুলোতে “শিকওয়া” ও “জওয়াবে শিকওয়া” পড়ার সময় যে আবেগ হৃদয়ে দোলা দিয়েছিল, তার রেশ আজও অম্লান। এখনো অনেক পঙক্তি স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করে। পরবর্তীকালে “বাংগে দারা” ও “কুল্লিয়াতে ইকবাল” অধ্যয়ন করতে গিয়ে তাঁর চিন্তার গভীরতা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তৃতি আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে।

আজ, সেই প্রিয় কবির সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে যেন ফিরে গেলাম কৈশোরের সেই দিনগুলোতে। স্মৃতির পাতা একে একে খুলে যেতে লাগল—ক্লাসরুম, পাঠ্যবই, আর মনের ভেতর জন্ম নেওয়া এক নতুন চেতনার সূচনা।

বৃষ্টিভেজা সেই বিকেলে, ইকবালের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে আমি শুধু একজন ভ্রমণকারী ছিলাম না—আমি ছিলাম এক অনুরাগী পাঠক, এক স্মৃতিমগ্ন মানুষ। সেই মুহূর্তে অনুভব করলাম, কিছু স্থান শুধু দেখা হয় না—সেগুলো অনুভব করা হয়, হৃদয়ে ধারণ করা হয় চিরকাল।

কত মানুষ প্রতিদিন এখানে আসে—কেউ ইতিহাসের টানে, কেউ কবিতার প্রেমে, কেউবা আত্মার খোঁজে। কিন্তু সবাই ফিরে যায় এক ধরনের প্রশান্তি নিয়ে। যেন এই স্থান মানুষকে নিজের ভেতরের গভীরে ডুব দিতে শেখায়।

এক স্মৃতিময় বিদায়

হাজুরি বাগ ছেড়ে যখন ফিরছিলাম, তখন পেছনে তাকিয়ে আবারও একবার সমাধিটিকে দেখলাম। লাল পাথরের সেই স্থির অবয়ব যেন বলছিল—

মানুষ চলে যায়, কিন্তু চিন্তা, আদর্শ আর কবিতা কখনো মরে না।

ইকবালের মাজার তাই কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা—যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে নতুন করে চিনতে শেখে।

লেখক: সাবেক ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

আরএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ