রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ।। ২৭ পৌষ ১৪৩২ ।। ২২ রজব ১৪৪৭


জামায়াতের অকস্মাৎ চুপসে যাওয়ার নেপথ্য কারণ কী?

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

মুজাহিদ সগীর আহমদ চৌধুরী

আন্দোলনরত আট দলীয় জোটের সর্বশেষ মহাসমাবেশটি ছিল ৬ ডিসেম্বর ২০২৫ সিলেটে। বিভাগীয় সমাবেশসমূহের শেষপর্যন্ত জামায়াতের মিয়া গোলাম পারওয়ার, আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও মুজিবুর রহমান সাহেবরা যখন পীর সাহেব চরমোনাইয়ের সামনে আসতেন তখন অত্যন্ত আদব ও এহতেরামের সাথে দুজানু হয়ে বসতেন। কোন সমাবেশ কোথায় হবে, কোথায় কে সভাপতিত্ব করবেন, কার নাম কোথায় হবে, মাইকিং কারা করবেন, স্টেজ কারা তৈরি করবেন—প্রত্যেকটি কাজে অক্ষরে অক্ষরে তারা পীর সাহেব চরমোনাইয়ের শরণাপন্ন হতেন, তাঁর থেকে পরামর্শ নিতেন, তাঁর অনুমতি নিতেন। পীর সাহেবকে তাঁরা অনেকটা তাদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন, সমাবেশে সমাবেশে তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন।

৬ ডিসেম্বর সিলেট মহাসমাবেশের পর আন্দোলনরত আট দলের সর্বশেষ লিয়াজো কমিটির মিটিং হয় ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ খেলাফত মজলিসের কার্যালয়ে। এটাই শেষ। এরপর থেকে রহস্যজনকভাবে জামায়াত নেতারা যোগাযোগ বন্ধ করে দেন, ফোনে কল দিলে রিসিভ করেন না এবং নানা অজুহাতে লিয়াজোঁ কমিটির মিটিংয়ের তারিখ পিছিয়ে দিতে থাকেন। অতঃপর ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হলে ২৯শে ডিসেম্বর মনোনয়ন দাখিলের সর্বশেষ তারিখ পর্যন্ত প্রায় কুড়িটা দিন হাতে ছিল, এই সময়টা আট দলের সম্মিলিত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার জন্য যথেষ্ট ছিল। আর এই সময়ে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় কোনো কাজই ছিল না। পীর সাহেব চরমোনাই শুধু এই উদ্দেশ্যে ১২ ডিসেম্বর থেকে লাগাতার ঢাকায় অবস্থান করলেও সবকিছু অগোছালো রেখে জামায়াতের আমীর ডা. শফীকুর রহমান হঠাৎ লন্ডন উড়াল দেন।

আট দলের উদ্যোগে বিভাগীয় শহরে মহাসমাবেশ হলো। সমাবেশসমূহে জামায়াতের নেতারা বুড়ো আঙুলের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সরকার গঠনের ঘোষণা দিলেন, বক্তব্যের সময় লাফ মেরে মেরে ইসলামি সরকার গঠন করবেন বলে মানুষকে স্বপ্ন দেখালেন, ইসলাম কায়েম করবেন বলে আলোড়ন তুললেন, ইসলামি হুকুমত ফরজ বলে জনগণকে মাসআলা শেখালেন, বর্তমান ব্যবস্থা শিরক বলে সতর্ক করলেন! কিন্তু কী এমন হলো যে, জামায়াত-আমীরের লন্ডন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তাদের সেই হুক্কা হুয়া বন্ধ হয়ে গেল? বিদেশি লবি হুজুরে ডেকে নিয়ে কী এমন কড়া নির্দেশ দিলো যে, ইসলামি জোটকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নিতে বাধ্য হলো জামায়াত? নিজেদেরকে আর “ইসলামি” বলে পরিচয় না দিয়ে অনেকটা সেক্যুলার বলে ঘোষিত হতে অনুপ্রাণিত করলো?

পত্রপত্রিকায় বলা হয় যে, “জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট”। হোক। যদি এটাই হয় তাহলে জামায়াত হচ্ছে একটি সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও ক্যাডারভিত্তিক স্মার্ট দল। অতএব এই স্মার্ট দল হওয়ার দাবি হচ্ছে যে, বিএনপির মতো বিশৃঙ্খল দল যেখানে শরীকদেরকে সন্তুষ্ট করে ২৭শে ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০০ আসনে নিজেদের প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করতে পেরেছে, সেই ক্ষেত্রে জামায়াতের মতো একটা সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও স্মার্ট দলের পক্ষে তা তো আরও কমপক্ষে এক সপ্তাহ পূর্বেই ঘোষিত হওয়ার কথা ছিল। ৮ ডিসেম্বর থেকে তারা কী করছিলেন? শরীকদের নিয়ে কেন মিটিং চালিয়ে যায়নি জামায়াত? এমন কী জটিলতা ছিল যে, রাত্র-দিন প্রয়োজনে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে হলেও মিটিংয়ের পর মিটিং করে সেটার সমাধান করা যেতো না? যে আন্তরকিতা, যে ধরনের শলাপরামর্শ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে মহাসমাবেশগুলো সুসম্পন্ন হয়েছে সেটায় যদি ছেদ না ঘটানো হতো তবে আসনসংখ্যা নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন থাকতো না। বাস্তবতার নিরিখে যেকোনো সংখ্যা যেকেউ মেনে নিতে আন্তরিক ছিলেন।

কিন্তু জামায়াত সেই সহজ-সরল পথে যায়নি। প্রথমত তারা কোনো মিটিংয়ের আয়োজন করেনি, আয়োজিত মিটিং এড়িয়ে গেছে। আলোচনাই যেখানে হয়নি সেখানে পত্রপত্রিকায় খবর চাউর করা হলো ‘সংখ্যাতত্ত্ব’। কাউকে কাউকে লোভী, স্বার্থপর ও ক্ষমতালিপ্সু বলে প্রচার করা হলো। মহাসমাবেশগুলো যেধরনের আন্তরিকতা, বোঝাপড়া ও শলাপরামর্শের ভিত্তিতে সুসম্পন্ন হয়েছে তার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে হঠাৎ জামায়াত একতরফাভাবে এনসিপিকে যুক্ত করার মাধ্যমে মোড়লিপনা শুরু করে। সর্বশেষে যুক্ত হয়েও জামায়াত নিজেকে সেখানকার মোড়ল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পায়তারা শুরু করে। আসন বিতরণের কারবার একক কব্জায় নিয়ে নেয়। তাও ঠিক আছে, মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু নূন্যতম আলোচনা করে ২৭শে ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত প্রার্থীতালিকা চূড়ান্ত করা যেতো। এতে করে শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সতর্কতামূলক কোনো কোনো আসনে একাধিক ব্যক্তি মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারতেন।

প্রত্যেক দলই প্রায় আসনে তাদের প্রার্থী চুড়ান্ত করেছে। কিন্তু সমঝোতা হলে সকলেই যে মনোয়ন পাবেন তা তো নয়। কাজেই যারা মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে আশান্বিত ছিলেন না তারা অনেকটা অপ্রস্তুতও ছিলেন। শেষমুহূর্তে প্রার্থিতা চূড়ান্ত না হওয়ায় দলসমূহ একযোগে সারাদেশে তাড়াহুড়ো করে মনোনয়ন দাখিল করতে বাধ্য হয়। এই হয়রানিটার দায় কার? জামায়াত কি ইচ্ছেকৃতভাবেই শরীকদের সাথে এই হয়রানিমূলক আচরণটা করেনি? এর দায় কি তারা এড়াতে পারবেন? জামায়াত চেয়েছিল এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় একটা ধাক্কা দিতে ইসলামি দলসমূহকে। সেই ধাক্কায় যাতে শরীকদের অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী কট খেয়ে যায়। জামায়াতের এই কুচালাকিটা কি উচিত হয়েছে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জামায়াত কি এই ‘ঐক্য’ নিয়ে আন্তরিক? এই ঐক্য কি তারা ধরে রাখতে চায়? যদি ধরে রাখতে আন্তরিক হয়েই থাকে তবে বিগত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তাদের উদ্যোগ কী? এটাকে কার্যকর করতে তারা কী কী পদক্ষেপ আসলে নিয়েছে? এ পর্যন্ত কয়টা মিটিং হয়েছে? মিটিং আদৌ হয়েছে কিনা? অবশ্যই না। স্রেফ কালক্ষেপণ হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে শুধু মিডিয়ায় একখানা সুন্দর ও মিষ্টিমধুর বিবৃতি দিয়েছে। সমঝোতা থেকে কোনো দল বেরিয়ে যাওয়ার খবর বেরিয়ে গেলে ফোন করে শুধু একটু ধৈর্য ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু সেই ধৈর্যটা কতদিন? সমাধান কীভাবে? গায়েবিভাবে নাকি বৈঠকীভাবে এই মহারহস্য হয়ে আছে পুরো প্রক্রিয়ায়।

বস্তুত জামায়াত ‘ইসলামে’র নামে এই ঐক্য আর রাখতে চায় না। চায় এটা ভেঙে যাক। তারা এখন বিদেশি প্রেসক্রিপশনে সেক্যুলার হতে চায়। এনসিপি, এবিপি ও এলডিপির জোট এজন্যই। তাতে ইসলামি দলসমূহের অনুমোদন লাগবে কেন? ইসলামি ঐক্য অপ্রয়োজনীয় বিধায় গোলাম পারওয়াররা এখন চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের সামনে দুজানু হয়ে বসার অভিনয়টাও আর করেন না। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা তো দূরের কথা, কলটাও রিসিভ করেন না। ক্ষমতায় যাওয়া এখন দুঃস্বপ্ন তাদের, ইসলামি হুকুমত তো বহুত দূর কি বাত। লন্ডন থেকে ফিরে এমনভাবে চুপসে গেছে এই জামায়াত, এখন পরান বাঁচাতে তারেক জিয়ার ধারস্থ হয়ে বিএনপির জাতীয় সরকারে ‘পানাহ’ চাইতে বাধ্য হচ্ছে। মহাসমাবেশের সময়কার সেই উজ্জ্বল চেহেরা কি আছে তাদের নেতৃবৃন্দের? কিছুটা মলিনতার চাপ লক্ষণীয় নয়?

৯-২৯ ডিসেম্বর, যথেষ্ট সময়। এই সময়ে আসন সমঝোতার চেয়ে দ্বিতীয়  গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর একটাও ছিল না। প্রয়োজনে নির্ঘুম রাত কাটানো প্রয়োজন  ছিল। কল্পনা করুন, যদি ২৭শে ডিসেম্বরের পূর্বেই ৩০০ আসনে তালিকা প্রস্তুত করে ঘোষণা করা যেতো সম্মিলিতভাবে, তাহলে সারা দেশে কী আলোড়নইনা তুলতে সক্ষম হতো এই ইসলামি জোট। কিন্তু সেই আবেগ, সেই সম্ভাবনা, সেই উদ্দীপনায় পানি কে ঢেলে দিলো? এটাকে কে নস্যাৎ করলো? এটার ধ্বংসের নায়ক কে? জামায়াত, মওদূদী জামায়াত, ইসলামের নামধারণকারী সেক্যুলার জামায়াত! হঠাৎ বালেগ হয়ে যারা কথিত “ইসলামি ঐক্যে”র জন্য উত্তেজিত ছিলেন এবং বুড়ো বয়সে জামায়াতের ওপর ভর করে যাদের এমপি হওয়ার খায়েশ হয়েছিল এটা তাদের জন্য চপেটাঘাত, মাথায় জুতোর বারি, তোরা কপাল পোড়া।

লেখক: ইসলামী আন্দোলন নেতা ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট

আরএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ