বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ ।। ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ২২ রমজান ১৪৪৭

শিরোনাম :
হরমুজ প্রণালী দিয়ে এক লিটার তেলও বের হতে দেব না: ইরান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বেতন ও কর্মদিবস কমাল পাকিস্তান আইজিপির সঙ্গে এফবিআই প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎ ‘ইরানে আমেরিকা ও ইসরাইলের হামলায় বিশ্ব শান্তি হুমকির মুখে’ যে কারণে কওমি মাদরাসা আপনার জাকাত ও দানের বেশি হকদার যুব সংগঠক আমিনুল ইসলাম সাদীকে জাতীয় পদকে ভূষিত করার দাবি ‘নিরাপদ অভিবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন আলেমরা’ নানুপুর মাদরাসায় ৪০ দিনের ইতেকাফে প্রায় তিন হাজার মুসল্লি শুরু হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, দেশবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর টেকনাফে কওমি পড়ুয়া আব্দুল্লাহ সাঈদের ধারাবাহিক সাফল্য

যে কারণে কওমি মাদরাসা আপনার জাকাত ও দানের বেশি হকদার

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মাওলানা সাইফুদ্দীন গাজী ||

প্রচলিত কওমি মাদরাসা একটি শতাব্দী প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষাধারা, যার ইতিহাস ঐতিহ্য, সেবা, অবদান, কীর্তি অনস্বীকার্য। বর্তমান সময়ে বেসরকারি উদ্যোগে এমন শিক্ষাসেবা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা সেক্যুলার হয়ে যাওয়ার পরে মুসলিমদের মূলধারার দ্বীনী শিক্ষা-দীক্ষা ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে এসব মাদরাসা। মুসলিম উম্মাহর ঈমান, ইলম, আমল, আখলাক, শিক্ষা সংস্কৃতি রক্ষায় এসব মাদরাসার অবদান সবার আগে। সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে রয়েছে এর নিরঙ্কুশ প্রভাব। এতে সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। নেই সরকারি দান অনুদান। বরং স্বাধীন শিক্ষাধারা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এখানে সরকারি অনুদান গ্রহণ করা হয় না। এটি আল্লাহর ওপর ভরসা করে কওম ও জাতির দান-অনুদানের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। নানা কারণে এসব বেসরকারি কওমি মাদরাসা আপনার দান সাদকা জাকাত ফিতরা, ডোনেশনের বেশি হকদার। সেই কারণগুলো বিশ্লেষণ করাই এ লেখার লক্ষ্য।

এক. কুরআনবর্ণিত জাকাতের খাতগু‌লো এখানে রয়েছে

আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে জাকাত-সাদাকার ৮টি খাত উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ করেছেন :

إِنَّمَا ٱلصَّدَقَـٰتُ لِلۡفُقَرَاۤءِ وَٱلۡمَسَـٰكِینِ وَٱلۡعَـٰمِلِینَ عَلَیۡهَا وَٱلۡمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمۡ وَفِی ٱلرِّقَابِ وَٱلۡغَـٰرِمِینَ وَفِی سَبِیلِ ٱللَّهِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِیلِۖ فَرِیضَةࣰ مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِیمٌ حَكِیمࣱ ۝٦٠﴾ [التوبة ٦٠]

সুরা তওবার এ আয়াত অনুসারে যাকাতের হকদার হলো : ১. ফকীর- অসচ্ছল ব্যক্তি। ২. মিসকীন- সম্পদহীন ব্যক্তি। ৩. আমিল বা জাকাত আদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তি। ৪. মনোরঞ্জন-উদ্দেশ্য ব্যক্তি। ৫. দাসমুক্তিতে। ৬. ঋণগ্রস্থের ঋণপরিশোধে। ৭. আল্লাহর পথে। ৮. পাথেয়হীন মুসাফির।

বর্তমানে ৪ ও ৫নং অপ্রচলিত, অবশিষ্ট ৬টি খাত প্রচলিত আছে। প্রচলিত ৬টি খাতের প্রায় সবগুলো কোনো না কোনো ভাবে কওমি মাদরাসায় পাওয়া সম্ভব। কওমি মাদরাসার অধিকাংশ ছাত্রই অসচ্ছল ও সম্পদহীন, তারা হলো কুরআনে বর্ণিত ফকীর ও মিসকীন। এখানে আছে দূর দূরান্ত থেকে আসা মুসাফির তালিবে ইলম। আছে আল্লাহর রাস্তার মেহমান, যদি আমরা ‘ফী সাবীলিল্লাহ’র ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করি। নবীজি সা. ইরশাদ করেছেন :

من خَرج في طلب العلم فهو في سَبِيلِ الله حتى يرجع».  [حسن] - [رواه الترمذي]

“যে ব্যক্তি ইলমের সন্ধানে বের হলো, সে আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে।” (তিরমিযী)

এখানে আছে আমিলীন বা জাকাত উসূলে দায়িত্ববান লোক। যদিও তারা ইসলামী হুকুমত কর্তৃক নির্ধারিত নয়, তথাপি কারও কারও মতে এরাও আলিমদের অন্তর্ভূক্ত। মোটকথা, কওমি মাদরাসায় কুরআনের বর্ণিত জাকাত-সাদাকা প্রদানের মোটামোটি সবগুলো খাতই বিদ্যমান। এমতাবস্থায় আপনার জাকাত ও সাদাকা যথাযথ খাতে পৌঁছাতে চাইলে নির্দ্বিধায় এখানে দান করতে পারেন।

দুই. ইলমের সেবা ও সহ‌যো‌গিতা

আপনি কওমি মাদরাসায় দান করা মানে শুধু গরীব-মিসকীনকে দান করাই নয়; বরং এর মাধ্যমে ইলমে দ্বীনের সেবায় নিজেকে শরীক করা। এর মাধ্যমে আপনি তালিবে ইলম ও উলামায়ে কেরামকে সেবা ও সম্মান করলেন। এদের প্রতি আপনি মহব্বত ও ভালোবাসা প্রকাশ করলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :

اغد عالما ، أو متعلما ، أو محبا ، أو مستمعا ، ولا تكن الخامس فتهلك

 ‘তুমি আলিম হও, অথবা তাদের ছাত্র হও, অথবা তাদের মহব্বতকারী হও, অথবা তাঁদের অনুগত হও, পঞ্চম কিছু হইয়ো না; অন্যথা হালাক হয়ে যাবে।’ (তহাবী শরীফ : ৬১১৬)

এখানকার তালিবে ইলম ও তাঁদের শিক্ষকেরা পার্থিব উচ্চাভিলাষ ত্যাগ করে শুধুমাত্র ইলম অর্জন ও ইলম শিক্ষাদান করার জন্যে মাদারাসায় পড়ে আছেন। যেভাবে নবীজির সরাসারি ছাত্র আসহাবে সুফফার সাহাবীগণ সুফ্ফায় পড়ে থাকতেন। ইচ্ছে করলে তারাও দুনিয়ার রুজি-রোজগারে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তারা কেবলই দ্বীনের খেদমতের জন্য এখানে পড়ে আছেন। আপনি তাদের দান করা মানে এমন খালেস দ্বীনের খাদেমদের খেদমত করলেন, যেভাবে নবী কারীম সা. ও বিত্তবান সাহাবায়ে কেরাম আসহাবে সুফফার খেদমত করতেন। ইলমের সংরক্ষণ ও দ্বীন ইসলাম প্রচার-প্রসারে আপনিও শরীক হয়ে গেলেন, যা আপনার জন্যে পরম সৌভাগ্যের বিষয়।

তিন. ইয়াতিমের ভরণপোষণ করা

প্রত্যেক কওমী মাদরাসায় বিপুল পরিমাণ ইয়াতীম আছে। কোথাও কোথাও স্বতন্ত্র ইয়াতিমখানাও আছে। মাদরাসাকর্তৃপক্ষ এদের লালন-পালন করে এবং এদের তা’লীম তারবিয়াত করে মানুষ করে তোলে। আপনি এখানে দান করা মানে ইয়াতিমদের তত্ত্বাবধানের আপনিও অংশগ্রহণ করলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :

أنا وكافل اليتيم في الجنة هكذا

“আমি ও ইয়াতিমের লালনপালন কারী জান্নাতে এভাবে কাছাকাছি থাকব। নবীজি সা. হাতের তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল একত্র করে ইশারা করলেন। (বুখারী, মুসলিম)

চার. সাদাকায়ে জারিয়ায় যুক্ত হওয়া

অন্যদেরকে দান করা অনেক সময় সাময়িক ও অস্থায়ী হয়। কিন্তু তালিবে ইলমের জন্য দান করা দ্বারা আপনার দান সাদাকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল। হাদীস শরীফে কমপক্ষে ১২টি কাজকে সাদাকায়ে জারিয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মূলনীতি হল, যেসব কাজের ফায়েদা দীর্ঘস্থায়ী হয়, সেসব কাজে অংশগ্রহণ করার দ্বারা নেকীও দীর্ঘস্থায়ী হয়, যাকে আরবীতে সাদাকায়ে জারিয়া বলে। কওমি মাদরাসাগুলোতে সাদাকায়ে জারিয়ার অনেকগুলো খাত পাওয়া যায়, যা সুধী পাঠকের অজ্ঞাত নয়। এখানে আলিম  ও নেককার তৈরিতে অর্থায়ন করা, তাদের ভবন তৈরি করে দেওয়া, কোনো কিতাবপত্র খরিদ করে দেওয়া, নলকূপ বা পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া সবগুলিতেই আপনি সাদাকায়ে জারিয়ার সওয়াব লাভ করবেন।

পাঁচ. কল্যাণকর কাজে সহযোগী হওয়া

কওমী মাদরাসায় দান করা মানে আপনি কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করলেন এবং আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করলেন। তিনি ইরশাদ করেছেন :

وَتَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُوا۟ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَ ٰ⁠نِۚ

 তোমরা কল্যাণকর ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগী হও, গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না। (সূরা মায়েদা-২)

ছয়. নেককারদের খাবার দেওয়া

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :

ولا يأكل طعامك إلا تقي.

“তোমরা খাবার যেন মুত্তাকী ছাড়া কেউ না খায়।” (তিরমিযী, আবু দাঊদ)

অর্থাৎ তোমার সম্মানজনক খাবার যেন মুত্তাকী পরহেজগার ও নেককার লোকেরাই খায়, ফাসিক ফাজের যেন না খায়। হাঁ, অভাব অনটনে ইমার্জেন্সী মানবিক সেবার সবার জন্যই উন্মুক্ত, সেখানে ভেদাভেদ করার অনুমতি নেই।

আপনি আর্তমানবতার দিকটি বিবেচনা করলে যেভাবে কওমি মাদরাসার গরীব ছাত্রদেরকে আপনার দানের বেশি হকদার পাবেন, তেমনি মুত্তাকী মানুষ খুঁজে খাওয়াতে চাইলে তাদেরকে সবার আগে পাবেন ইনশাআল্লাহ। তারা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি নেককার, আমলদার, মুত্তাকী খোদাভীরু। তারা নামায রোযা তিলাওয়াত যিকির সহ হরেক রকম আমল করে, যা সাধারণের পক্ষে সম্ভব হয় না। উপরুক্ত হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আপনার সম্মানজনক দান ও দাওয়াতে তারা বেশি অগ্রাধিকার রাখে।

সাত. আল্লাহওয়ালাদের দোয়া লাভ করা

কওমি মাদরাসায় দান করার কারণে এদের দুআ আপনি লাভ করবেন। রূহের দুআ তো আছেই, এখানে প্রায়শ সম্মিলিতদুআ করা হয়। যারা মাদরাসার জন্যে দান পাঠায়, তাদের জন্যে নিয়মিত দুআ করা হয়। আপনি সেখানে দান করার দ্বারা তাদের দুআর অংশিদার হলেন। 

মোটকথা, বহুদিক বিবেচনায় কওমি মাদরাসা আপনার দানের অনেক বেশি হকদার। তবে এর অর্থ এই নয়- আপনি আপনার গরীব নিকটাত্মীয়দের ভুলে যাবেন। কিংবা অন্য কোথায় দেওয়া হতে বিরত থাকবেন। বরং এর অর্থ হল- আপনি নির্দ্বিধায় এখানে দান করতে পারেন, যেখানে দান করলে আপনার ফরয জাকাত আদায় হয়ে যাবে। উপরন্তু এ দানের মাধ্যমে বহুমুখি সওয়াব অর্জনের সুযোগ রয়েছে, যে কারণে অন্যান্য অনেক খাতের তুলনায় এখাতটি আপনার দানের জন্য অগ্রাধিকার রাখে।

তবে কোনো মাদরাসায় দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হয়ে নেবেন :

১. সেখানে গোরাবা ফাণ্ড আছে কি না? গোরাবা ফান্ড না থাকলে সেখানে ফরজ দান করা যাবে না।

প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, শিক্ষক বেতন ইত্যাদির কাজে জাকাত ফিতরা দেওয়া যাবে না। তবে নফল দান ও ডোনেশন করা যাবে।

২. মাদরাসাটি জেনারেল কওমি মাদরাসা কি না? নাকি প্রাইভেট মাদরাসা। যেসব মাদরাসা প্রাইভেট বা বাণিজ্যিক, সেগুলোতে ফরয জাকাত ওয়াজিব ফিতরা দেওয়া যাবে না। বানিজ্যিক মাদরাসা চেনার উপায় হল- যে মাদরাসার আয়-ব্যয় সব পরিচালকদের সাথে জড়িত, মাদরাসার সাথে নয়। ছাত্রদের কাছ থেকে সংগৃহিত অর্থ ও অন্যান্য অর্থ শিক্ষকবেতন , বোর্ডিং খরচ বাবত ব্যয় করার পরে অবশিষ্ট অর্থ পরিচালকগণ নিজেরা ভাগ করে নিয়ে যান, সেগুলো বানিজ্যিক মাদরাসা। এখানে জাকাত দেওয়া যাবে না। এ জাতীয় মাদরাসার পক্ষে জাকাত কালেকশন করাও জায়িয হবে না। হাঁ, যদি পরিচালকের নির্ধারিত বেতন থাকে এবং তিনি নির্ধারিত বেতনের বাইরে অর্থ গ্রহণ করেন না, এবং সেখানে গোরাবা ফাণ্ড থাকে, যা গরিব ছাত্রদের জন্যে যথানিয়মে ব্যয় করা হয়; তাহলে সেখানে জাকাত ফিতরা দান করতে অসুবিধা নেই। আল্লাহু আলাম।

লেখক: মাদরাসা শিক্ষক, লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট

আইএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ