মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ।। ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০ ।। ১৭ শাবান ১৪৪৫


আলেমঘনিষ্ঠতার বৈশিষ্ট্য হারালেই বিপদ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন ||

ইসলামের নামে অনেক সংগঠনই পৃথিবী দেখেছে। এখনও অসংখ্য সংগঠন আপন মনে আপন পথে চলমান। এর মধ্যে তাবলিগ জামাতের কোনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে কি? আমাকে এভাবে জিজ্ঞেস করলে বলব- আছে। আর তা হলো আলেম-ঘনিষ্ঠতা। প্রথমত এই জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস রহ. একজন আলেমের পুত্র আলেম। শুধু আলেম খান্দানে জন্মেছেন তাই নয়- তাঁর খান্দানের সকল সাবালক সন্তানই একদা হাফেজে কুরআন হতো। যেন জন্মটাই ছিল আলেমের পরিবেশে; ইলমের উষ্ণতায় মুগ্ধ প্রাঙ্গণে। তারপর ইলম অর্জন করেছেন সমকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে। এখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন ভারতবর্ষের কিংবদন্তি মহাপুরুষ শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদ হাসান দেওবন্দী রহ.।

মনে রাখা ভালো, ইসলামে জ্ঞানের মূল্য ভাষাতীত। আমাদের প্রিয়তম নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের সূচনা এই জ্ঞান থেকে। ‘ইকরা’ এলো সাথে ‘নবুওয়াত’ও এলো। কিন্তু হজরত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জ্ঞানের মশাল হাতে আলোকিত সমাজ নির্মাণের পথে অবতীর্ণ হয়েছিলেন- সে জ্ঞানের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞান ও কর্ম, ইলম ও আমলে নিখুঁত সমন্বয়। ফলে যারাই পরবর্তীকালে ইলমের সাথে আমলের সমন্বয় আছে এমন পথে চলেছেন তারাই যথাযথ সিরাতে মুস্তাকিমের সন্ধান পেয়েছেন। দেওবন্দ মাদরাসার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হলো, এই ইলম ও আমলের সমন্বয়। মাওলানা ইলিয়াস রহ. এই অপার্থিব সমন্বিত ঝর্ণা থেকেই সংগ্রহ করেছেন জ্ঞানের সুধা। ফলে সিরাতে মুস্তাকিমের সাথে তাঁর বন্ধন হয়েছে সুদৃঢ়।

তাবলিগ জামাতের কর্মসূচি বিন্যাসে তাঁর এই মানসিক গঠন কার্যকর ছিল সন্দেহ নেই। এ কারণেই তিনি কালেমা নামাজের সঙ্গে ইলমকে একটি মৌল কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তারপর যাঁরাই এ জামাতের দায়িত্বে এসেছেন তারা সকলেই ছিলেন সময়ের সচেতন বোদ্ধা আলেম। হজরতজি মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবী রহ. রচিত আরবি ভাষার আকরগ্রন্থ ‘হায়াতুস সাহাবা’, হাদিসশাস্ত্রের অন্যতম ভাষ্যগ্রন্থ তাহাবি শরিফের আরবী ভাষায় লেখা সারা বিশ্বে সমাদৃত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আমানিল আহবার’ তাঁর জ্ঞান-পাণ্ডিত্যকে তুলে ধরবার জন্যে যথেষ্ট।

উপমহাদেশে অবিসংবাদিত শায়খুল হাদিস মাওলানা জাকারিয়া রহ. ছিলেন এই জামাতের আমরণ পৃষ্ঠপোষক। মূলত এই আলেমঘনিষ্ঠতার ফলেই দীনের ক্ষেত্রে এই জামাতের অগ্রগতি যেমন চোখে পড়ার মতো তেমনি দীনী আমল ও চিন্তার ক্ষেত্রে এদের স্বচ্ছতাও প্রশংসা করার মতো। হয়তো বা এই কর্মসূচি আলেমঘনিষ্ঠতার ফলেই এর সাথে যারা যুক্ত হচ্ছেন তারা তাদের সন্তানদেরও আলেম বানানোর চেষ্টা করছেন উল্লেখযোগ্যভাবে। তাদের এই অগ্রসরতা দেশ ও জাতি উভয় বিচারেই আমাদের জন্য গর্বের।

ইসলাম ও মুসলমানদের প্রাচীন ইতিহাস আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন, আমল ছাড়া ইলম যেমন অভিশাপ ডেকে আনে- তেমনি ইলম ছাড়া আমলও জাতিকে ঠেলে দেয় বেদআত রেওয়াজ ও কুসংস্কারের মতো গভীর অন্ধকার গুহায়। তাবলিগ জামাতের অতীত মুরব্বিদের সকলেই তাই বিষয়টির প্রতি খুব যত্নবান ছিলেন। আল্লাহর পথে বের হওয়ার পাশাপাশি ‘কেন’ বের হচ্ছে- এই বিষয়টিকেও তাঁরা সমান গুরুত্ব দিতেন। উদ্দেশ্য, যেন চলবার মতো আলো নিয়ে ঘরে ফিরতে পারে প্রতিটি কর্মী।

তাবলিগ জামাত এখন গতিময়। গাড়ি যখন গতি পায় তখন টার্গেট অর্জন তখন ‘শুধু সময়ের ব্যাপার’ হয়ে দাঁড়ায় তেমনি এক্সিডেন্টের ভয় থাকে প্রবল। বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। এও মনে রাখতে হবে, ইলম হলো আলো আর আলেম হলেন পথের বিশ্বস্ত গাইড। আলো ছাড়া পথচলা যেমন নিরাপদ নয়, গাইড ছাড়া পথে নামাও ঝুঁকিমুক্ত নয়- এ মন্ত্রটি মূলমন্ত্র ছয় নাম্বারে যেভাবে উল্লেখ আছে সেভাবেই অনুসরণ করতে হবেÑ এটাই সময়ে প্রত্যাশা। মনে রাখতে হবে- আলেমের হাতে প্রতিষ্ঠিত, আলেমের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা; আলেমের সিলেবাসে সমৃদ্ধ এই কাফেলা যেন আলেমঘনিষ্ঠতার এই বৈশিষ্ট্য হারিয়ে না ফেলে- জাগ্রত প্রহরীর মতো। আল্লাহ এই মহান কাফেলাকে সব অপদৃষ্টি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

লেখক : বরেণ্য লেখক ও মুহাদ্দিস

কেএল/


সম্পর্কিত খবর