মাসউদুর রহমান ফকির, দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:
মিশরের ঐতিহ্যবাহী ও বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এমফিল (MPhil) ডিগ্রি অর্জনের অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার মুনিরা তাহের। তাফসির ও উলুমুল কুরআন বিষয়ে দীর্ঘ তিন বছরের গবেষণা শেষে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফলাফল ‘মুমতাজ’ (Excellent) গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক সায়েন্স ফর ফরেনার স্টুডেন্টস’-এর অধীনে অনুষ্ঠিত থিসিস ডিসকাশন সেমিনারে তাঁর গবেষণাপত্রের ওপর আলোচনা ও মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমাম আহমদ আত-তাইয়্যিব মিলনায়তনে আয়োজিত এ সেমিনারে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
মুনিরা তাহেরের গবেষণার বিষয় ছিল তাফসির ও উলুমুল কুরআন। তাঁর এমফিল থিসিসের শিরোনাম ‘হুরূফুল মাআনি এবং পবিত্র কুরআনের দ্বিতীয়ার্ধের তাফসিরে এর প্রভাব—সংকলন ও পর্যালোচনা।’
দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণাপত্র পর্যালোচনা ও একাডেমিক মূল্যায়নের পর সুপারভাইজার প্যানেল তাঁকে সর্বোচ্চ ‘মুমতাজ’ (Excellent) গ্রেড প্রদান করেন।
আল-আজহারের মাস্টার্স শিক্ষার্থী আহমাদুল্লাহ আল জামি গবেষক মুনিরা তাহেরের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার থেকে তাঁর এই অর্জনের তথ্য উঠে এসেছে।
তিনি মুনিরা তাহেরের সাফল্যকে বাংলাদেশের নারীদের জন্য একটি ‘বিশাল অর্জন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মুনিরা তাহেরকে দেখে বাংলাদেশের দ্বীনি ঘরানার আরও অসংখ্য নারী শিক্ষার্থী বড় স্বপ্ন দেখবেন এবং আল-আজহারের মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে অনুপ্রাণিত হবেন।
আহমাদুল্লাহ আল জামি আরও বলেন, ইসলামের সূচনা যুগের মতো বর্তমানেও বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলো থেকে গবেষক আলেমা তৈরি হওয়া সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সাহস, পরিবারের সহযোগিতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। মুনিরা তাহের তাঁর সাফল্যের মাধ্যমে সেটিই প্রমাণ করেছেন।
দুর্গাপুর থেকে মিশর দীর্ঘ একাডেমিক পথচলা
মুনিরা তাহেরের জন্ম নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায়। তাঁর বাবা মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের (রহ.) ছিলেন দুর্গাপুর জামিউল উলূম কাচারি মাদ্রাসা ও ফাতিমা (রা.) মহিলা মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা।
শৈশবে নিজ এলাকায় হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেন মুনিরা। এরপর দুর্গাপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে ২০১০ সালে তিনি মিশরে পাড়ি জমান।
এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও কঠিন একাডেমিক পথচলা। ২০১৮ সালে অনার্স, ২০২১ সালে দশ কিরাত এবং ২০২২ সালে মাস্টার্স (তামহিদি) সম্পন্ন করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে এমফিলের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেন।
টানা তিন বছর গবেষণা, অধ্যয়ন ও একাডেমিক পরিশ্রমের পর অবশেষে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল সেমিনারে সর্বোচ্চ ‘মুমতাজ’ গ্রেড অর্জন করেন মুনিরা তাহের।
কুরআন শিক্ষিকা হিসেবেও দায়িত্ব পালন
দীর্ঘদিন ধরে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণার পাশাপাশি মুনিরা তাহের মিশরের ‘জামইয়্যা সুফারা আল-হিদায়া’-তে কুরআন শিক্ষিকা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের নারী শিক্ষার্থী, বিশেষ করে মাদ্রাসা ও দ্বীনি শিক্ষাধারার সঙ্গে যুক্ত নারীদের জন্য এটি অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মুনিরা তাহেরের দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা প্রমাণ করে সুযোগ, পরিবারের সহযোগিতা, অধ্যবসায় ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে বাংলাদেশের নারীরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারেন।
আইও/