মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬ ।। ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
মাদরাসা শিক্ষার কারিকুলাম যুগোপযোগী ও কর্মসংস্থানমুখী করার উদ্যোগ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ছেলেদের জন্যও উপবৃত্তির ভাবনা সরকারের বাইতুল মোকাররম প্রতিষ্ঠায় শামসুল হক ফরিদপুরীর অনন্য অবদান হেরা গুহার নিঃসঙ্গ ভাবনা বুলবুল হত্যা: সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে ওসির সঙ্গে ইসলামী যুব আন্দোলনের সাক্ষাৎ দুই দিনের সফরে ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি ঢাকা মেডিকেল এলাকার আশপাশ যেন গাঁজাখোর জোন: কে এম শরীয়তুল্লাহ জামেয়া দ্বীনিয়া দারুল আবরার মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা হেলাল উদ্দিন আফতাবি-র ইন্তেকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমীরে মজলিসের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১ হাজার ২৩২

বাইতুল হিকমাহ: যে জ্ঞানকেন্দ্র একসময় আলোকিত করেছিল বিশ্বকে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

একসময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসু মানুষ ছুটে আসতেন বাগদাদে। কারণ, তখনকার পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই শহর। আর সেই বৌদ্ধিক জাগরণের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাইতুল হিকমাহ। যা ছিল পশ্চিমা বিশ্বে ‘হাউস অব উইজডম’ নামে পরিচিত।

আব্বাসীয় খেলাফতের সময় প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ইসলামের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। যেখানে গবেষণা, অনুবাদ, শিক্ষা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজ হতো। এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ পর্যন্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল সে সময়ের জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্রথম দিকের বৃহৎ গ্রন্থাগারগুলোর একটি।

রাজধানী বদলের পর শুরু হলো নতুন অধ্যায়

আব্বাসীয় খেলাফতের দ্বিতীয় খলিফা যখন রাজধানী দামেস্ক থেকে বাগদাদে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন, তখনই বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন হয়। রাজধানী পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতাও ছিল। আব্বাসীয়রা উমাইয়া খেলাফতকে উৎখাত করলেও দামেস্কের বহু মানুষ তখনও উমাইয়াদের প্রতি অনুগত ছিলেন। ফলে নতুন সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে শহরটি যথেষ্ট নিরাপদ বা স্থিতিশীল ছিল না।

অন্যদিকে বাগদাদ ছিল ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত এই নগরী ছিল বাণিজ্য ও কৃষির জন্য আদর্শ। পাশাপাশি এটি সাসানীয় সাম্রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী তিসিফুনের কাছাকাছি হওয়ায় পারস্যের জ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বাগদাদ দ্রুত আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কেন্দ্রেও পরিণত হয়।

কেবল গ্রন্থাগার নয়, ছিল সাম্রাজ্যের মেধাকেন্দ্র

নবম থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত বাইতুল হিকমাহ ছিল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের বৌদ্ধিক প্রাণকেন্দ্র। এর কাজ ছিল জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা এবং নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটানো।

আজকের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় বা থিংক ট্যাংক যেমন গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, এক হাজার বছর আগে সেই ভূমিকাই পালন করত ‘বাইতুল হিকমাহ’। বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান কিংবা দর্শন নিয়ে কাজ করতে চাইলে নবম শতকে বাগদাদের চেয়ে ভালো গন্তব্য আর ছিল না।

আব্বাসীয় শাসকেরা পণ্ডিতদের রাষ্ট্রের অর্থায়নে গবেষণার সুযোগ দিতেন। তাঁদের শুধু পূর্বসূরিদের জ্ঞান অনুসরণ করতে নয়, বরং তা যাচাই, সমালোচনা এবং আরও সমৃদ্ধ করতে উৎসাহিত করা হতো। গ্রিস, পারস্য ও ভারত—যেখান থেকেই জ্ঞান আসুক না কেন, তা গ্রহণ করে নতুন গবেষণার ভিত্তি তৈরি করা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

অনুবাদের মাধ্যমে জ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত

বাইতুল হিকমাহর সবচেয়ে বিস্ময়কর উদ্যোগ ছিল এর সুবিশাল অনুবাদ কর্মসূচি। রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হতো এ সুসংগঠিত জ্ঞান-প্রকল্প।এখানে মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি পণ্ডিতেরা একসঙ্গে কাজ করে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের রচনা থেকে শুরু করে প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ পর্যন্ত অসংখ্য বই আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন।

অনুবাদকদের মর্যাদা ছিল অত্যন্ত উচ্চ। ঐতিহাসিক বর্ণনায় রয়েছে, তাঁদের মধ্যে অনেককে অনূদিত বইয়ের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে পুরস্কৃত করা হতো।

তবে অনুবাদের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যেত না। অনূদিত গ্রন্থ নিয়ে নিয়মিত পাঠ, আলোচনা, বিতর্ক, সংশোধন এবং নতুন গবেষণা চলত। ফলে বাগদাদ মধ্যযুগীয় বিশ্বের জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

যেখানে পরিচয়ের চেয়ে বড় ছিল জ্ঞান

বাইতুল হিকমাহর সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর মুক্ত বৌদ্ধিক পরিবেশ। মধ্যযুগে এমন প্রতিষ্ঠান খুবই বিরল ছিল, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে জ্ঞান ও যুক্তির মূল্য বেশি ছিল।

একই কক্ষে একজন মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী, একজন খ্রিস্টান চিকিৎসক এবং একজন ইহুদি গণিতবিদকে আরবি ভাষায় একই বৈজ্ঞানিক সমস্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতে দেখা যেত। সে সময় আরবিই ছিল বিজ্ঞান ও শিক্ষার আন্তর্জাতিক ভাষা।

বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও চিন্তার এই সমন্বয়ই বাগদাদকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষানগরীতে পরিণত করেছিল—যখন ইউরোপের প্যারিস বা অক্সফোর্ড তখনও জ্ঞানচর্চার বিশ্বকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সে সময় একটি প্রবাদ বহুল প্রচলিত ছিল— “কায়রো লেখে, বৈরুত ছাপে, আর বাগদাদ পড়ে।”

যেভাবে নিভে যায় এক স্বর্ণযুগের পিদিম

১২৫৮ সালে হুলাগু খান-এর নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী বাগদাদ আক্রমণ করে। এটি শুধু একটি নগর দখলের ঘটনা ছিল না; ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ।

কয়েক সপ্তাহের অবরোধ শেষে মঙ্গোল বাহিনী আব্বাসীয় রাজধানীতে প্রবেশ করে। এরপর শুরু হয় নির্বিচার লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ। গ্রন্থাগারগুলো ধ্বংস করা হয়, অগণিত পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং বহু আলেম, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত নিহত হন।

বাইতুল হিকমাহর অমূল্য সংগ্রহগুলো টাইগ্রিস নদী-তে নিক্ষেপ করা হয়। পরবর্তী সময়ের অনেক লেখক উল্লেখ করেছেন, বইয়ের কালি মিশে নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল, আর মানুষের রক্তে তা লাল দেখাচ্ছিল। এই বর্ণনা প্রতীকী হোক বা বাস্তব, এতে সন্দেহ নেই যে মানবসভ্যতা সেদিন তার অন্যতম বৃহৎ জ্ঞানভাণ্ডার হারিয়েছিল।

বাইতুল হিকমাহর পতনের মধ্য দিয়ে বাগদাদের স্বর্ণযুগেরও অবসান ঘটে। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্র প্রায় রাতারাতি বিলীন হয়ে যায় এবং মানবসভ্যতা হারায় এমন এক বৌদ্ধিক ঐতিহ্য, যার শূন্যতা আর কখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

কোথায় আজ সেই বাইতুল হিকমাহ?

বাইতুল হিকমাহর কোনো স্থাপনা আজ আর অবশিষ্ট নেই। মঙ্গোলদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে এই জ্ঞানকেন্দ্রের কোনো দৃশ্যমান নিদর্শন টিকে থাকতে পারেনি।

তবে ইতিহাসবিদদের মতে, আধুনিক বাগদাদের আল-মুতানাব্বি স্ট্রিট, যা টাইগ্রিস নদীর তীরবর্তী পুরোনো আব্বাসীয় এলাকার কাছে অবস্থিত, আজও সেই জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে আছে।

দশম শতকের কবি আল-মুতানাব্বির নামে নামকরণ করা এই সড়কটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইরাকের বইপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক ও বুদ্ধিজীবীদের মিলনস্থল। দর্শন, রাজনীতি, সাহিত্য, ধর্ম, এমনকি নিষিদ্ধ বই—আরবি ভাষায় যা-ই প্রকাশিত হোক না কেন, তার সন্ধান এখানে মিলত।

বাইতুল হিকমাহর দেয়াল আজ আর নেই, কিন্তু তার জ্ঞানচর্চার চেতনা এখনো বেঁচে আছে আল-মুতানাব্বি স্ট্রিটের বইয়ের দোকান, পাঠক আর বিতর্কের সংস্কৃতির মধ্যে।

ইরাকে বইপ্রেমীদের মধ্যে আজও একটি প্রবাদ শোনা যায়— “চোর বই পড়ে না, আর যে বই পড়ে, সে চুরি করে না।”

 

মূল : কেইটলিন গ্রাহাম

ভাষান্তর : শরিফ হাসানাত


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ