রমাদান মহান আল্লাহর অফুরান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এটি মানবজাতির জন্য আধ্যাত্মিক উন্নয়ন, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম সুযোগ। এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ। রমাদানকে ফলপ্রসূ করতে প্রথমে এর শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
এই মাসের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানবজাতির হিদায়াতের আলোকবর্তিকা পবিত্র কোরআন নাজিল হওয়া। কোরআন যেকোনো জাতির উন্নতি ও অবনতির মাপকাঠি। রসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ এই কোরআনের মাধ্যমে কোনো জাতিকে উন্নতি দান করেন আর কোনো জাতির অবনতি ঘটান (মুসলিম)। তাই, কোরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা হলো রমাদানের সার্থকতা অর্জনের প্রথম ধাম।
রমাদান আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এক মহাজাগতিক পরিবর্তন সূচিত হয়। জান্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, জাহান্নামের কপাট রুদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। রমাদানের প্রতি দিন ও রাতে অসংখ্য মানুষকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এই মাসে আমলের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
আর সিয়ামের পুরস্কার তো স্বয়ং আল্লাহ নিজ হাতে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন— যার মাধ্যমে রমাদানের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য কতটা তা গভীরভাবে উপলব্ধ হয়।
ব্যবসায়ীদের যেমন ব্যবসার বিশেষ মৌসুম থাকে, যে মৌসুমে তারা সারা বছরের ঘাটতি পুষিয়ে নেয়, ঠিক তেমনি ঈমানদারদের জীবনে আমলের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার একটি বিশেষ মৌসুম হলো রমাদান। এই গুরুত্বপূর্ণ মাসটি অবহেলায় কাটিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়।
রমাদানকে ফলপ্রসূ করার জন্য কয়েকটি পরামর্শ
১. হারামের সংস্রব থেকে নিজেকে দূরে রাখা : রসুল (সা.) বলেছেন, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার হিসেবে গণ্য হবে। (তিরমিজি) আল্লাহ সিয়ামের বিধান এ জন্য আরোপ করেছেন, যেভাবে আমরা রমাদানের দিনের বেলা পানাহার নিজের ওপর হারাম করেছি, তদ্রূপ যেন আল্লাহ কর্তৃক অন্যান্য সব নিষিদ্ধ বিষয়ও হারাম জ্ঞান করে বর্জন করি।
যদি সারা দিন সিয়াম পালন করি, কিন্তু মিথ্যা, গিবত, হারাম উপার্জন এবং অশ্লীল বিনোদন ত্যাগ করতে না পারি, তবে সেই সিয়াম শুধু উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই হারামের সংস্রব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা সিয়ামের প্রকৃত দাবি।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সঙ্গে আদায় করা : বিশেষ করে রমাদানের দিনগুলোতে এ ব্যাপারে বেশি যত্নবান হওয়া উচিত। এর সহজ উপায় হলো আজানের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদে চলে যাওয়া। নবী করিম (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দাদের থেকে সালাতের হিসাব নেওয়া হবে। সালাত যথাযথভাবে আদায় হয়ে থাকলে সে সফল হবে ও মুক্তি পাবে। সালাত যথাযথ আদায় না হয়ে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হবে (নাসায়ি)।
৩. কোরআন তিলাওয়াত করা : রমাদান কোরআন নাজিলের মাস। কাজেই এই মাসে অধিক পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। তিলাওয়াতের সময় আয়াতের অর্থ, প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা অনুধাবনের চেষ্টা করা উচিত। রসুল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সিয়াম এবং কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তাকে পানাহার ও জৈবিক কর্ম থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আর কোরআন বলবে, ‘আমি তাকে রাত্রে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছিলাম। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।’ তখন তাদের উভয়ের সুপারিশ গৃহীত হবে (মুসনাদে আহমাদ)।
৪. ইসলামী জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করা : ব্যক্তিগতভাবে এবং পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামের মৌলিক জ্ঞানার্জনে সচেষ্ট থাকা যেতে পারে। আমলের মাস রমাদানে এর অভ্যাস করে ফেলতে পারলে সারা বছর এর প্রভাব থাকবে ইনশাল্লাহ।
৫. দোয়া এবং তাহাজ্জুদে মনোনিবেশ করা : রসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন— কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে এমন, যে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দেব। কে আছে এমন, যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। (বুখারি)
রমাদানে আমরা সবাই সাহরি খাওয়ার জন্য ভোররাতে ঘুম থেকে উঠি। খাবার প্রস্তুত হতে যতক্ষণ লাগে, আমরা চাইলেই এর মধ্যে কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে ফেলতে পারি। অথচ আলস্যবশত আমরা ফজিলতপূর্ণ সময়টা অহেতুক কাটিয়ে দিই। এটা উচিত নয়।
আমাদের সিয়াম তখনই উপকার বয়ে আনবে এবং ফলপ্রসূ হবে, যদি আমরা তাকওয়ার পথে অগ্রসর হতে পারি। সুতরাং আসুন, রামাদানকে আমাদের জীবনের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি এবং এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত নেক আমলে ব্যয় করার চেষ্টা করি, বদ আমল থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। এই মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে যথাযথভাবে কোরআন এবং সুন্নাহর প্রদর্শিত পথ এবং পদ্ধতি অনুসারে আমলের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টা করি।
এনএইচ/