বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ।। ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ ।। ২ রমজান ১৪৪৭


ইফতারের গুরুত্ব ও ফজিলত

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

||নাজমুল হাসান||

সারাদিন সিয়াম সাধনার পর সূর্যাস্তে রোজা ভঙ্গ করার জন্য যে খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা হয়, তাকেই ইফতার বলা হয়। ইফতার শুধু ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত, বরকতময় ইবাদত এবং মুসলিম সমাজের এক ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ। বাংলার মাটিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইফতারের সংস্কৃতি লালিত হয়ে আসছে। সময়ের পরিবর্তনে খাদ্যের ধরনে ভিন্নতা এলেও ইফতার করা ও করানোর চর্চা আজও সমানভাবে প্রাণবন্ত।

রমজান মাসজুড়ে দেশের শহর-গ্রাম, অলিগলি ও বাজারে দেখা যায় নানান পদের ইফতারির সমাহার। মসজিদের মিনার থেকে মাগরিবের আজান ধ্বনিত হলে কিংবা ইফতারের সাইরেন বাজলে চারপাশে এক অনন্য আবহ সৃষ্টি হয়। যেদিকে চোখ যায়, ইফতারের প্রস্তুতি ও আনন্দঘন পরিবেশ। অনেকে পথচারীদের ইফতারে শরিক হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারগুলো প্রতিবেশীদের বাড়িতে ইফতারি পাঠায়। এতে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য আরও গভীর হয়।

ইফতার কেবল উপমহাদেশেই নয়, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও মুসলিম ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এমনকি অমুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরাও মুসলিম কূটনীতিকদের সম্মানে ইফতার আয়োজন করে থাকেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রমজান উপলক্ষে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়, যা ইফতারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও সুদৃঢ় করে।

সম্প্রীতি, উদারতা ও সামাজিক বন্ধন জোরদারে ইফতারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ কারণেই ২০২৩ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা UNESCO ইফতারকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইফতার কেবল ধর্মীয় আচার নয়; বরং মানবিক সংযোগ ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার এক অনন্য মাধ্যম।

হাদিসে ইফতারের ফজিলত সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। Abu Huraira (রা.) থেকে বর্ণিত, Muhammad (সা.) বলেছেন, “রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে—একটি ইফতারের সময়, অন্যটি তার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।” (তিরমিজি)

অন্য এক হাদিসে জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “প্রতিটি ইফতারের সময় এবং প্রতি রাতে কিছু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।” (ইবনে মাজাহ)

তিনি আরও বলেছেন, “মানুষ যতদিন সূর্যাস্তের পর দ্রুত ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের ওপর থাকবে।” (সহিহ মুসলিম)

ইফতারের সময় দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। Abu Huraira (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না—রোজাদারের দোয়া, যতক্ষণ না সে ইফতার করে; ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া; এবং মজলুমের দোয়া।” (জামে তিরমিজি)

আরও বর্ণিত আছে, “ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া কবুল করা হয়।” (আবু দাউদ)

ইফতার করা যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি কোনো রোজাদারকে ইফতার করানো আরও বড় ফজিলতের বিষয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে; অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।” (তিরমিজি)

অতএব, ইফতার কেবল দিনের সমাপ্তি নয়; এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক উজ্জ্বল মুহূর্ত। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ইফতার পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও তাকওয়ার চেতনা জাগ্রত করে—যা রমজানের প্রকৃত শিক্ষা বহন করে।

এনএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ