সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪ ।। ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ ।। ২৩ শাবান ১৪৪৫


যা হচ্ছে তা সমালোচনা নয় বরং বিষোদগার: মুহাম্মদ বদরুজ্জামান


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ফটো এডিট : কাউসার লাবীব

ইসলামী সঙ্গীতের কোনো সর্বজনবিদিত সংজ্ঞা নেই। তবে সাধারণ চিন্তা অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গুনগান, ইসলামী অনুশাসন, চেতনা ও মূল্যবোধআশ্রিত গানগুলোকেই ইসলামি সঙ্গীত হিসেবে জ্ঞান করা হয়। ইসলামি সংস্কৃতির একটি বিশেষ অংশও মনে করা হয় ইসলামি সঙ্গীতকে। বর্তমানে ইসলামি সংস্কৃতি চর্চায় ধর্মীয় সঙ্গীত চর্চার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। 

তবে ইসলামি সঙ্গীত নিয়ে সম্প্রতি বিতর্কে সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। ইসলামি সঙ্গীত ও শিল্পীদের নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির জের ধরে ইসলামি সঙ্গীতাঙ্গন নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। ইসলামি সঙ্গীত কি সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে, এমন প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

চলমান এসব বিতর্ক ও ইসলামি সঙ্গীতের আবেদন, ইসলাম প্রচারে অবদান ইত্যাদি বিষয়ে আওয়ার ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছেন হলি টিউনের প্রধান নির্বাহী ও কলরবের নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ বদরুজ্জামান। চুম্বকাংশ তুলে ধরেছেন আবু হামদান। 

আওয়ার ইসলাম: বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ইসলামি সঙ্গীতের আবেদন কতটুকু?

মুহাম্মদ বদরুজ্জামান: এ দেশে অনেকদিন ধরেই ইসলামি সঙ্গীতের বিষয়, ভাব, কথা ও সুরের ক্ষেত্রে কোনো বিপ্লব আমরা দেখিনি। চর্চা হয়েছে; তবে তা এতোটা অপেশাদারভাবে যে, কালের অন্য শিল্প-সাহিত্যের সাথে তা পাল্লা দিতে পারেনি কোনোদিনই। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো চিন্তার সংকীর্ণতা। কোনো কিছু তৈরি করতে হলে, গ্রহণ করবার মত উদার ও সর্বজনীনতা থাকা চাই।

মরহুম আইনুদ্দিন আল আজাদ রহ. এই পথে অনেকটাই আলো জ্বালিয়েছেন। আরও অনেকেই আছেন তাদের অবদানের কথাও আমি স্মরণ করছি। বর্তমানে ‘বছরে প্রায় ১০ কোটি মানুষ ইসলামী সঙ্গীত শোনে’। আলহামদুলিল্লাহ!

বিয়ে বাড়িতে ইসলামি সঙ্গীতেরও কনসার্ট হতে পারে, এমন ধারণা আগে ছিল না। যেখানে অশ্লীলতা আর গান-বাজনার ঘনঘটা ছিল সেখানে সুস্থ সংস্কৃতি দিনিদিন জায়গা করে নিচ্ছে।  ইসলামি সঙ্গীত শিল্পীরা কলেজের অনুষ্ঠানেও পারফর্ম করছে। নর্তকী ডেকে এনে যেখানে নাচ গান হতো সেখানে এই পরিবর্তন আমাদের শিল্পীদের হাত ধরেই এসেছে।

আমরা আদর্শ, রুহানিয়াত ও আধ্যাত্মিকতার জায়গা থেকে ইসলামি সঙ্গীত চর্চা করি। আমি মনে করি, অদূর ভবিষ্যতে ইসলামি সঙ্গীত হয়ে উঠতে পারে দ্বীনের দাওয়াতের আধুনিক মাধ্যম। তরুণ প্রজন্মকে গান বাজনার নেশা থেকে বের করে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার কোমর ভেঙে ইসলামি আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হবে বলে আশা রাখি।

আওয়ার ইসলাম: ইসলামি সঙ্গীতের সর্বজনীন ও শক্তিশালী হবার পথে কী কী বাধা রয়েছে বলে মনে করেন?

মুহাম্মদ বদরুজ্জামান: ইসলামী সঙ্গীতের সর্বজনীন ও শক্তিশালী হবার পথে প্রথম বাধাটি হলো  – আমাদের মানসিক দৈন্যতা। কতিপয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও বিতর্কের জের ধরে আমরা বারবার সুস্থ সংস্কৃতির চর্চাকে কলংকিত করার চেষ্টা করি। সম্প্রতি নানা ইস্যু সামনে এনে শিল্পীদের বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

একটা শ্রেণী নিয়মিত ট্রল ও সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে গোটা ইসলামি সঙ্গীতাঙ্গনকে কলুষিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই সংকট আজকে নতুন নয়। অনেক অনেক প্রাচীন এই সমস্যা। আজও কোনো ফলপ্রসূ সমাধানে উপনীত হয়নি।

ইসলামি সঙ্গীতের সর্বজনীন ও শক্তিশালী হবার পথে আরেকটি বাধা হলো –মানসম্মত লিরিক ও মৌলিক সুর। তবে কলরব পরিবার সবসময় চেষ্টা করে একটি সঙ্গীত যেন কালজয়ী হয়ে ওঠে। সুরে সুরে মানুষের হৃদয়ে ইসলামের মাহাত্ম, আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গুনগান, ইসলামী অনুশাসন, চেতনা ও মূল্যবোধআশ্রিত মেসেজ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।

আওয়ার ইসলাম: ইসলামি সঙ্গীত শিল্পীরা কি সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে?

আসলে ব্যাপারটা এমনয় নয় যে সবাই গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। যদি এমনটা হতো তবে ইসলামী সঙ্গীতের আবেদন দিনে দিনে কমে যেত। হ্যাঁ, কেউ কেউ বিখ্যাত হওয়ার প্রচেষ্টায় নানা ধরণের অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তাদের ব্যাপারে আমি একা এ বিষয়ে মতামত দিতে চাই না।

এখানে নানা গোষ্ঠী আছে, বিভিন্ন মতবাদের শিল্পী রয়েছেন। একেকজনের চিন্তা-চেতনা একেকরকম। কেউ মাহের জেইনকে ফলো করছে আবার কেউ মিশারিকে দেখে শিখছে। সব অঙ্গণের মতো ইসলামি সঙ্গীত ইন্ড্রাস্টিতেও শ্রেণী বিভাজন রয়েছে। কেউ যদি সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় তার সামগ্রিক দায়ভার পুরো ইন্ড্রাস্ট্রির ওপর বর্তায় না।এটা যুক্তিযুক্ত কথাও নয়।

তবে আমি সকল শিল্পীদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলতে পারি, আমাদের মনে রাখতে হবে ইসলামি সঙ্গীত এ দেশের মানুষের মনে সুস্থ সংস্তৃতির ধারণা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে। সুতরাং, আমাদের সবসময় সচেতন থাকতে হবে, ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার সময় প্রশ্নবিদ্ধ বা বদনাম হতে পারে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা।

আওয়ার ইসলাম: আপনি কি মনে করেন প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ড থেকে রক্ষা করতে ইসলামি সঙ্গীতের জন্যও সেন্সর থাকা উচিৎ? 

মুহাম্মদ বদরুজ্জামান: অবশ্যই আমি মনে করি। বড়দের নির্দেশনা পেলে এই অঙ্গণ আরও এগিয়ে যাবে। কলরব থেকে এমন একটি উদ্যোগের কথা দীর্ঘদিন ধরে ভাবা হচ্ছে। গানের কথা, সুর ও অন্যান্য বিষয়াদি যেন শরিয়াহ সম্মত হয় সেজন্য একটা সেন্সরের অনুভব করি। ভবিষ্যতে এ ধরণের উদ্যোগ কলরবের হাত ধরে শুরু হবে ইনশাআল্লাহ! 

আওয়ার ইসলাম: সাম্প্রতিক একজন কলরব শিল্পীর দ্বিতীয় বিবাহ করা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম। এ বিষয়ে আপনারা কি ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মুহাম্মদ বদরুজ্জামান: আপনি যে ব্যাপারটি প্রশ্নের সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন সেটা হচ্ছে কলরবের জনপ্রিয় শিল্পী আবু রায়হানের দ্বিতীয় বিবাহ।আরও নানা অভিযোগ তোলা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।এটাকে সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল বললে ভুল হবে না।

তারা হয়তো জানেন না যে, আবু রায়হানকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে কলরব পরিবার। এ বিষয়ে তদন্ত করতে ৩ সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়েছে। ১৫ দিনের ভেতরে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি এবং একটি সুষ্ঠু সমাধানও পাব বলে আমরা করছি।

আওয়ার ইসলাম: ইসলামি সঙ্গীত নিয়ে যারা সমালোচনা করছেন তাদের উদ্দেশ্যে কোন বার্তা আছে কি?

মুহাম্মদ বদরুজ্জামান: বিষয়টা নিয়ে যারা জলঘোলা করছেন, ফেসবুকে ট্রল করছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলব, সমালোচনা করতে পয়সা লাগে না, যে কেউ ফেসবুকে দুই লাইন লিখতেই পারে। তবে যা হচ্ছে সেটাকে আমি সমালোচনা নয় বরং বিশোদগার বলব। এ সবই এক ধরনের স্ট্যান্ডবাজি।

তবে কেউ যদি গঠনমূলক সমালোচনা করেন আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই। তার পরামর্শের আলোকে আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধনের চেষ্টা করি। তবে নগ্নভাবে অনেকে যাচ্ছেতাই ভাষা ব্যবহার করে বিশোদগার করেন। শুধু কলরব নয়, ওলামায়ে কেরামের প্রতিও তাদের  নিয়মিত বিশোদগারমূলক কর্মকান্ড আমাদের শিক্ষা ও শিষ্টাচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এটা এক ধরনের মানসিক দৈন্যতা।

আপনি খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের ব্যাপারে যারা সমালোচনা করছেন তাদেরও অনেক ভুল-ত্রুটি রয়েছে। কারণ, মানুষ মাত্রই ভুল করে। সমালোচকদের প্রতি আমার অুনরোধ থাকবে, ভুল ধরে দিন তবে ভুল ধরতে গিয়ে যেন নিজেদের কোনো ভুল না হয়।

এমএম/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ