বিশেষ প্রতিনিধি
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের পাত্তানি, ইয়ালা ও নারাথিওয়াত—মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই তিন প্রদেশে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে পরিচয়, অধিকার ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ঘিরে সংঘাত। ঐতিহাসিক পাটানি সুলতানাতের উত্তরাধিকার বহনকারী মালয়-মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাংশ দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় থাই শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল’ (বিআরএন)-এর এক নেতার স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে পুরোনো প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে—দক্ষিণ থাইল্যান্ডের মুসলিমদের এই দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতি কি স্বাধীন পাটানি রাষ্ট্র, নাকি থাইল্যান্ডের ভেতরেই কোনো স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক কাঠামো?
বর্তমান পাত্তানি, ইয়ালা ও নারাথিওয়াতসহ দক্ষিণ থাইল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে পাটানি নামে পরিচিত মালয়-মুসলিম সুলতানাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। উনিশ ও বিশ শতকে অঞ্চলটির ওপর সিয়ামি রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। ১৯০২ সালে পাটানি সুলতানাতের অবসান ঘটে এবং ১৯০৯ সালের অ্যাংলো-সিয়ামিজ চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ মালয়া ও সিয়ামের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারিত হলে ঐতিহাসিক পাটানি অঞ্চল বিভক্ত হয়ে যায়।
এরপর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক একীকরণ জোরদার হয়। থাই ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাধান্য, স্থানীয় মালয় ভাষা ও পরিচয়ের সংকট এবং ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রশ্নে অসন্তোষ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বড় অংশ জাতিগতভাবে মালয় এবং ধর্মীয়ভাবে মুসলিম। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। ফলে ব্যাংককের কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে স্থানীয় পরিচয়ের এই দূরত্বই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে একাধিক মালয়-মুসলিম সংগঠন গড়ে ওঠে। স্বাধীন পাটানি বা বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সক্রিয় এসব সংগঠনের মধ্যে পরবর্তীকালে বিআরএন, পাটানি ইউনাইটেড লিবারেশন অর্গানাইজেশনসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দীর্ঘদিনের নিম্নমাত্রার সংঘাত ২০০৪ সালে নতুন করে ভয়াবহ রূপ নেয়। ওই বছরের জানুয়ারিতে নারাথিওয়াতের একটি সেনা শিবির থেকে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। এরপর ধারাবাহিক হামলা, বোমা বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে দক্ষিণাঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
২০০৪ সালের পর থেকে সংঘাতে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। থাইল্যান্ডের সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী ডিপ সাউথ ওয়াচের হিসাবে, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২০ হাজার ৮৪৭টি সহিংস ঘটনা এবং ৭ হাজার ২০১ জন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ২০০৪ সাল থেকে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে মুসলিম ও বৌদ্ধ—উভয় সম্প্রদায়ের বেসামরিক মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বিদ্রোহীরা রয়েছেন।
অর্থাৎ, এটি কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নয়; দুই দশকের সহিংসতায় পুরো অঞ্চলের সাধারণ মানুষই দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছে।
বিআরএন দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগঠনগুলোর একটি। ১৯৬০-এর দশক থেকে সংগঠনটি স্বাধীন পাটানি রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।
সম্প্রতি এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিআরএনের শান্তি-আলোচনা প্রতিনিধিদলের মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ সিরি বলেন, তাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তার বক্তব্যে দীর্ঘদিনের সেই দাবিই আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—দক্ষিণ থাইল্যান্ডের মালয়-মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নিজেদের জন্য পৃথক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চায়।
তবে বিআরএনের সাম্প্রতিক অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিতও রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক বছরের বিরতির পর থাই সরকার ও বিআরএনের মধ্যে শান্তি আলোচনা আবার শুরু হলে সংগঠনটি প্রথমবারের মতো তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক কাঠামোর একটি তুলনামূলক স্পষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করে।
সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (আরএসআইএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিআরএন থাইল্যান্ডের ভেতরে ‘স্বশাসন’ বা স্বায়ত্তশাসনের একটি কাঠামোর কথা তুলে ধরেছে। এতে আইনসভা, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় ক্ষমতা ভাগাভাগি, মালয়-মুসলিম পরিচয়ের সুরক্ষা এবং মুসলিমদের জন্য প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে শরিয়াহভিত্তিক বিধানের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবে শিক্ষা, ভাষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অধিকারের কথাও রয়েছে।
অর্থাৎ, বিআরএনের রাজনৈতিক অবস্থান এখন শুধু ‘স্বাধীনতা অথবা কিছুই নয়’—এমন সরল কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নেই। সংগঠনের সামরিক অংশে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও রাজনৈতিক আলোচনায় থাইল্যান্ডের ভেতরে স্বশাসনের সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।
থাই সরকার ও বিআরএনের মধ্যে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা শুরু হয় ২০১৩ সালে। কিন্তু একাধিক দফা বৈঠক হলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান আসেনি।
এর একটি বড় কারণ হলো—সহিংসতা কমানোর পাশাপাশি সংঘাতের রাজনৈতিক মূল কারণগুলো কীভাবে সমাধান করা হবে, সে প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব রয়ে গেছে।
২০২৬ সালের আগস্টে থাইল্যান্ডের প্রধান শান্তি আলোচক থানুত সুওয়ানানন্দা বলেন, শুধু সহিংসতা কমানোর বিনিময়ে সাময়িক সমঝোতা নয়; সংঘাতের রাজনৈতিক মূল কারণ, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন।
এদিকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে একটি হামলায় পাঁচ থাই নিরাপত্তাকর্মী নিহত হওয়ার পর শান্তি আলোচনা আবারও স্থবির হয়ে পড়ে। আগস্টে পাত্তানি, ইয়ালা ও নারাথিওয়াতে ধারাবাহিক অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণের ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংঘাতের কেন্দ্রে শুধু ভূখণ্ডের প্রশ্ন নেই; রয়েছে পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নও।
মালয়-মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্থানীয় শাসনে অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। বিআরএনের স্বায়ত্তশাসন প্রস্তাবেও এসব বিষয়কে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরএসআইএসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত স্বশাসন কাঠামোয় মালয়-মুসলিম পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা এবং মুসলিমদের জন্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে শরিয়াহ প্রয়োগের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ কারণেই দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংঘাতকে শুধু নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। দীর্ঘদিনের পরিচয়, শাসন ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
বর্তমানে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংকটের সামনে কয়েকটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ রয়েছে। একদিকে বিআরএনের একটি অংশ স্বাধীন পাটানি রাষ্ট্রের দাবি ধরে রাখতে পারে। অন্যদিকে থাইল্যান্ডের ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন রেখে ব্যাপক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পথও আলোচনায় রয়েছে।
আরএসআইএসের বিশ্লেষণ বলছে, বিআরএনের স্বশাসন প্রস্তাব শান্তি আলোচনায় একটি নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ব্যাংকক কতটা রাজনৈতিক ছাড় দিতে প্রস্তুত এবং বিআরএন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটা আলোচনাভিত্তিক সমাধানে এগিয়ে আসে তার ওপর।
মালয়েশিয়ার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সাল থেকে কুয়ালালামপুর দুই পক্ষের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। ফলে থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী পক্ষের ভূমিকা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স
আইও/