শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬ ।। ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ২৫ সফর ১৪৪৮

শিরোনাম :
দক্ষিণ সুদান ও আবেই সফরে গেলেন সেনাপ্রধান জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণে কর্পোরেট দখলের আশঙ্কা ‘হলগুলোতে ছাত্রদের মারামারি ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ সুগম করছে’  আওয়ামী নৃশংসতার বৈশ্বিক প্রচারণা জোড়দারের আহ্বান ইসলামী আন্দোলনের একজন শিক্ষকই বদলে দিতে পারেন একটি প্রজন্ম : এমপি এনামুল কওমি শিক্ষার্থীরা দেশের অনেক বড় সম্পদ: ড. আহমদ আবদুল কাদের হাসিনার আমলে একটি অমানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল: চিফ প্রসিকিউটর বোয়ালমারীতে ট্রেনের ধাক্কায় মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধার মৃত্যু রাত ১টার মধ্যে দেশের ৬ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা জুলাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেট বিভাগে ৩১ জনের মৃত্যু

জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণে কর্পোরেট দখলের আশঙ্কা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মুফতি আহমদ যাকারিয়া ||

বসুন্ধরা গ্রুপকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিতে তড়িঘড়ি শুরু করেছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। এজন্য মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে নতুন নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের অনুমতি চেয়ে চারটি ব্যবসায়িক গ্রুপ সরকারের কাছে আবেদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ। এর মধ্যে বসুন্ধরা বাদে বাকি তিনটি কোম্পানি দেশে রিফাইনারি বসিয়ে ক্রুড অয়েল আমদানি করে তা পরিশোধনের মাধ্যমে বিক্রির অনুমতি চেয়েছে। শুধু বসুন্ধরা গ্রুপ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে আবেদন করেছে।

বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ করে দিলে দেশের মানুষ মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়ার কারণে ইতঃপূর্বে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা তো সবার সামনেই রয়েছে। তাই পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করা যাবে না।

বর্তমানে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি বেসরকারি খাতে চলে গেলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ভোক্তারা। এলপিজি ও বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞতা তো দেশের মানুষের সামনে এখনও বর্তমান। কোনো খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়ে গেলে তারা ধীরে ধীরে বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন করে। পরে ভোক্তাদের স্বার্থে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটি যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে চলে যায়, তখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে সরকারকে চাপের মুখে ফেলে।

সুতরাং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ সেই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ভোক্তারাই নয়, সরকারও একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তার পরিবর্তে যদি রাষ্ট্র নিজের দায়িত্ব বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে বাধ্য।

মোটকথা, সরকার যখন জ্বালানি তেল বিক্রি করে, তখন আমরা ধরে নিতে পারি, সরকার সেটা লাভ করার জন্য করে না। সুতরাং জনগণ যে দামে স্বস্তি পাবে, সেই দামেই তাদের দেওয়ার কথা। কিন্তু যখন সেটা প্রাইভেট সেক্টরে যাবে, তখন তাদের উদ্দেশ্যই থাকবে ব্যবসা করা বা লাভ করা। সেক্ষেত্রে দামের ওপর তারা একটা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। সাধারণ মানুষের সুবিধা তাদের মূল উদ্দেশ্য হবে না। তারা হয়তো নানাভাবে দাম বাড়াতে চাইবে। সেটা সবার জন্য অসুবিধা তৈরি করবে।

জ্বালানি আমদানির মতো সংবেদনশীল খাত পুরোপুরি বসুন্ধরা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে গেলে ৪০ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজার তাদের একক হাতের মুঠোয় চলে যাবে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যত টাকা পাচার হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই হয়ে থাকে বাণিজ্যের আড়ালে ওভার-ইনভয়েসিং বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের (আমদানি মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে) মাধ্যমে। গত ১০ বছরে মূলত এলসি কারসাজির মাধ্যমেই দেশ থেকে প্রায় ৭-৮ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। তেল আমদানির নামে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা অতীতেও রয়েছে।

যাদের হাতে ৪০ হাজার কোটি টাকার তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সেই বসুন্ধরা গ্রুপ দেশের টাকা অবৈধভাবে পাচারের রেকর্ডে শীর্ষে রয়েছে। ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও হুন্ডির মাধ্যমে সাইপ্রাস, স্লোভাকিয়া, যুক্তরাজ্য, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও অফশোর এলাকাগুলোতে সরিয়েছে।

যেমন আরেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এস আলম গোষ্ঠী বাণিজ্যের আড়ালে অবৈধ উপায়ে দেশের ব্যাংকের লক্ষ কোটি টাকা লুটে নিয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সাইপ্রাসের মতো দেশগুলোতে ভুয়া অফশোর কোম্পানি বানিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছে, যার একাংশ ইতোমধ্যে বিদেশি আদালত ফ্রিজ করেছে। এসব অবৈধ পথের নাবিকদের মধ্যে আরও রয়েছে সামিট, ওরিয়ন ও ইউনাইটেডের মতো শীর্ষস্থানীয় গ্রুপগুলো। যারা কর ফাঁকি ও কালো টাকা লুকানোর স্বর্গরাজ্যখ্যাত অফশোর এলাকা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড বা বাহামাসে কোম্পানি খুলে দেশের সম্পদ পাচার করেছে।

বসুন্ধরা সরাসরি বাজারে তেল বিক্রি শুরু করলে তাদের প্রতিযোগিতা হবে বিপিসির সঙ্গে। বসুন্ধরা তেলের বাজারে সরাসরি বিক্রির অনুমতি পেলে শুরুতে বেসরকারি খাত কম দামে বিক্রি করে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সংকটে ফেলবে। একসময় তেলের বাজার দখলে নিয়ে তারা দাম বাড়িয়ে দেবে। এখন জাতীয় কোম্পানি জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে দাম নির্ধারণ করে। আর বেসরকারি খাত সবসময় দেখে তার মুনাফা। সুতরাং পরবর্তীতে তার মুনাফা দেখে দাম বৃদ্ধি করে দেবে।

বর্তমানে এলপিজি খাত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ করা হলেও মাঠ পর্যায়ে তা কেউ মানে না। আর এর মাশুল দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের। বিদ্যুৎ খাতে এখন বিপুল পরিমাণে কেন্দ্রভাড়া দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ব্যাপকভাবে। মূলত বেসরকারি কোম্পানি শুরুতে কম দামে সরবরাহ করে সরকারি কোম্পানির বাজার নষ্ট করে। আবার বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে মজুত করে দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি করে। জ্বালানি তেল সরকারি খাতে থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। কিন্তু বেসরকারিভাবে গেলে কোনোভাবেই তা আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা খুব খারাপ। একচেটিয়া মুনাফার প্রবণতায় মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে না। জ্বালানি খাতের বাজার ব্যবসায়ীদের হাতে ছাড়া যাবে না, এটা সরকারের কাছেই রাখতে হবে।

দেশের বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট হয়ে আসছে। চিনি, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ কিংবা লবণের বাজারে বিভিন্ন সময়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হয়। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রয় কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হয়েছে। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টো। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ওঠানামা করলেও দেশে কখনো বড় ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি। সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে কখনো দাম বাড়িয়েছে, কখনো দাম কমিয়েছে। কিন্তু সরবরাহ ভেঙে পড়া বা বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক সংকটে সাধারণ ভোক্তাকে পড়তে হয়নি। এর বিপরীতে এলপিজি খাতের অভিজ্ঞতা দেখুন, সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সময় সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হয়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সীমিত থাকায় এখনো দেশের অনেক এলাকায় ভোক্তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে এলপিজিকে বেসরকারিকরণ। ঠিক তেমনিভাবে যদি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাজারে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ জ্বালানি তেল দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রভাব পড়বে প্রায় সব পণ্য ও সেবার দামে।

দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহ করে একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আর বিপণন করে বিপিসির মালিকানাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েল কোম্পানি। সরকারের এই তিন কোম্পানি সারা দেশের পাম্প স্টেশন ও ডিলারের কাছে তেল সরবরাহ করে। জ্বালানি তেলের ব্যবসা বেসরকারি খাতে দেওয়া হলে মানুষকে তা বেশি দাম দিয়ে কিনতে হবে। যেটা হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। জ্বালানি তেল একটি ‘কৌশলগত’ পণ্য। এর ব্যবসা পুরোটাই সরকারি খাতে থাকা উচিত। বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা খুব খারাপ। একচেটিয়া মুনাফার প্রবণতায় মূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে না। জ্বালানি খাতের বাজার ব্যবসায়ীদের হাতে ছাড়া যাবে না, এটা সরকারের কাছেই রাখতে হবে।

চীন, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্র সরাসরি রিফাইনারি ও পাম্পের মান নিয়ন্ত্রণ করে। ভারতে রিলায়েন্স, নায়ারা, শেল, ট্রুঅল্ট বায়োএনার্জির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের বাজার হিস্যা অত্যন্ত সীমিত এবং কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকে। ভারতে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ভারতের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড। এরা একসঙ্গে দেশের ৯০ ভাগের বেশি খুচরা জ্বালানি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বে তেলের মান ঠিক রাখতে 'অথেনটিক্স'-এর মতো স্বাধীন ফুয়েল মার্কিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।

জ্বালানির মতো স্পর্শকাতর খাত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হলে তা সরকারের জন্য আত্মঘাতী এবং দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সরকারের ভেতরের একটি সুবিধাবাদী মহল বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ তৈরি করতে চাইছে। এতে দেশের মানুষ মুষ্টিমেয় কিছু ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কার্যকর ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে অতীতের মতো ভোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়বে।

এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ এই খাত ধীরে ধীরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাবাধীন হয়ে পড়বে। জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে চলে গেলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ ভোক্তারা। পরিশোধিত জ্বালানির বড় অংশ বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে ভবিষ্যতে বাজারে প্রভাব বিস্তার, কৃত্রিম সংকট কিংবা মূল্য নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি হবে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন রয়েছে। সেসব দেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেশ কার্যকর। তবে বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেশ দুর্বল। তাদের নির্দেশনা কোনো বেসরকারি কোম্পানি মানে না। এলপিজির ক্ষেত্রে এটি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। তাই বসুন্ধরাকে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হলে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হবে—এটা বলাই যায়।

বসুন্ধরার হাতে জ্বালানির আমদানি ও খুচরা পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো বাজার যাবে এই ব্যবসায়ী গ্রুপটির হাতে। তেল আমদানির এলসিতে আন্ডার ইনভয়েস বা ওভার ইনভয়েস করে বিদেশে অর্থ পাচারের সম্ভাবনা যেমন বাড়বে, তেমনই আমদানি, পরিশোধন ও খুচরা বিক্রি একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলে তেলে ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। তেলের বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, এমনকি ব্যাংকের তারল্য সংকট বাড়বে একটি কোম্পানির হাতে ৪০ হাজার কোটি টাকার নিয়ন্ত্রণ থাকলে।

বিওজিসিএলের আবেদন অনুমোদনের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠনই তো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাতকে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি করার অর্থই হচ্ছে যে, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি করে দেওয়ার নামান্তর।

বর্তমানে সরকার যে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় এই খাতটি পরিচালনা করছে, তাতে অর্জিত মুনাফা ও রাজস্ব রাষ্ট্রের কোষাগারেই জমা হয়। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হলেও তা শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণের কল্যাণেই নিয়োজিত থাকে। কিন্তু এই খাতটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হলে অর্জিত মুনাফা সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি মালিকানায় চলে যাবে এবং এর ফলে পরিচালনা ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে। আমদানি থেকে শুরু করে রিফাইনারি, গুদাম, পরিবহন এবং ভোক্তার গাড়ির ট্যাংক পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়ার এমন নজির দেশের জ্বালানি খাতে নেই। এতে বাজারে নতুন কোম্পানির প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে।

জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকলে এই সেবা খাতের ব্যয় আরও কমানো সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকায় প্রত্যেকেরই পরিচালনা ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি খাতের মতো স্পর্শকাতর খাতের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে সরকার একটি শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। যেসব দেশে বেসরকারীকরণকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং সরকার নিজের দায়িত্ব এড়াতে চেয়েছে, সেখানে নিয়ন্ত্রণকারী বা রেগুলেটরি সংস্থাগুলো অত্যন্ত অকার্যকর ও অক্ষম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেল আমদানির একক এখতিয়ার বিপিসির। আর তেল বিতরণ করে বিপিসির অধীন তিনটি কোম্পানি পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম। তবে বিপিসির এই একক এখতিয়ার খর্ব হতে যাচ্ছে। কারণ জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের দ্বার খুলতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। সারা দেশে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের হাজার হাজার পেট্রল পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প থেকে জ্বালানি বিক্রির টাকা প্রতিদিন সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে জমা হয়। বিদেশ থেকে কেনা তেলের দাম মেটানোর আগ পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের এই অর্থ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর হিসাবে থাকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের দৈনন্দিন নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে বিপিসির এই ফান্ডের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বছরে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকার এই নগদ প্রবাহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে সরে বেসরকারি ব্যাংকে চলে গেলে সরকারি ব্যাংকগুলো তারল্য বা নগদ টাকার সংকটে পড়বে। শুধু তাই নয়, এতে করে বসুন্ধরা অঘোষিতভাবে বেসরকারি ব্যাংক বা যেসব ব্যাংকে এই টাকা লেনদেন করা হবে সেসব ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। দৈনন্দিন নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে তখন ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে (কলমানি মার্কেট) গিয়ে চড়া সুদে ধার করতে হবে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমবে। বেসরকারি খাতের ঋণের সুদহার বেড়ে গেলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। বছরে গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে বিপিসি। এর মধ্যে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টন পরিশোধিত তেল এবং ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল। সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার ও ভারত থেকে এসব জ্বালানি আমদানি করা হয়। বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির দায়িত্ব পুরোপুরি বিপিসির হাতেই রয়েছে। তবে বিদ্যমান ব্যবস্থায় ব্যতিক্রম হিসেবে বেসরকারি খাতের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বিপিসির অনুমোদন নিয়ে নিজেদের ব্যবহারের জন্য ফার্নেস অয়েল আমদানি করে থাকে। অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি সব তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল বিপিসিই আমদানি করে।

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ