আন্তর্জাতিক ডেস্ক
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছে বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল (বিআরএন)। সংগঠনটির দাবি, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে এএফপিকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে বিআরএনের শান্তি আলোচনাবিষয়ক প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ সেরি এ অবস্থান জানান। তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলবে; প্রয়োজনে তা ‘শেষ সময় পর্যন্ত’ অব্যাহত থাকবে।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি বিআরএনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। বর্তমান সংঘাত তীব্র আকার নেয় ২০০৪ সালে। গত দুই দশকে এ সংঘাতে ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ডিপ সাউথ ওয়াচের তথ্য উল্লেখ করেছে এএফপি।
ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের এ অঞ্চল মালয়-মুসলিম অধ্যুষিত পাতানি সালতানাতের অংশ ছিল। পরে ১৯০০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন সিয়াম, বর্তমান থাইল্যান্ডের সঙ্গে অঞ্চলটির অন্তর্ভুক্তি ঘটে। এরপর স্থানীয় মালয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাংশ ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
নিকমাতুল্লাহ সেরি জানান, বিআরএন শুধু শান্তি আলোচনা নয়, দক্ষিণাঞ্চলে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চান। সংগঠনটি থাই সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বিআরএন নিজেই অঞ্চলটি পরিচালনা করতে চায় বলে তিনি জানান।
তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ থেকে ১০ বছরের একটি অন্তর্বর্তী সময়ে বিআরএন অঞ্চলটি পরিচালনা করবে। এ সময়ে মুসলিমদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক আদালত ও শরিয়াহ পুলিশ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। এরপর জনগণ গণতান্ত্রিকভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা বেছে নেবে বলে জানান তিনি।
তবে থাইল্যান্ডের প্রধান শান্তি আলোচনাকারী থানাত সুবানানন্দা আগস্টে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আলোচনার টেবিলে বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। থাই সরকারের আলোচনায় বরং যুদ্ধবিরতি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলা চেকপোস্ট ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা কমানোর বিষয় রয়েছে।
থাইল্যান্ড সরকার ও বিআরএনের মধ্যে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় ২০১৩ সাল থেকে শান্তি আলোচনা চলে আসছে। সর্বশেষ উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় গত ডিসেম্বরে। তবে সংঘাত ও হামলার কারণে আলোচনার প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
গত জুলাইয়ে দক্ষিণাঞ্চলে একটি হামলায় পাঁচ থাই সেনা নিহত হওয়ার পর ব্যাংকক সাময়িকভাবে শান্তি আলোচনা স্থগিত করে। থাই সরকার অবশ্য জানিয়েছে, তারা শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেনি। নিরাপত্তা, আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সংলাপ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলীয় সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে সরকার।
সাম্প্রতিক সময়েও দক্ষিণাঞ্চলে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর নারাথিওয়াত প্রদেশে একটি বোমা হামলা ও বন্দুকযুদ্ধে দুই স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তাকর্মী নিহত এবং ১৬ জন আহত হন। এর আগে জুলাইয়ে একটি চেকপোস্টে হামলায় পাঁচ সেনা নিহত ও ছয় বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের সংঘাত নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে প্রতিবেশী মালয়েশিয়া। দুই দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গেও এ সংঘাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতার পর মালয়েশিয়া থাইল্যান্ড সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে। একই সঙ্গে থাই সরকার ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শান্তি আলোচনার জন্য নতুন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ খালেদ নুরদিন বলেছেন, কুয়ালালামপুর শান্তিপূর্ণ সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয় এবং কোনো পক্ষকে মালয়েশিয়ার ভূখণ্ড সহিংসতা বা শান্তি প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যানের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে বিআরএনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতিও শান্তি আলোচনার অগ্রগতিতে বাধা তৈরি করেছে। তবে অক্টোবর নাগাদ থাই সরকারের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বা ‘ব্যাক-চ্যানেল’ আলোচনার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন নিকমাতুল্লাহ।
দীর্ঘদিনের এই সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে বিআরএন। ফলে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও থাইল্যান্ড-বিআরএন শান্তি আলোচনা—দুই দিকেই নতুন করে নজর পড়েছে।
সূত্র: মালয় মেইল
আইও/