মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮


মিরাজ—আকাশের বিস্ময়কর সফর

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

এসো দাদু ভাইয়েরা, একটু এগিয়ে আস। দাদার কথায় নাতি-নাতনিরা এগিয়ে বসল। দাদা বললেন, আজ আমি তোমাদের এমন এক রাতের গল্প শোনাব, যে রাতের মতো আশ্চর্য রাত পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনো আসেনি।

তোমরা তো জানো, তায়েফ থেকে ফিরে আসার পর আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মন কতটা কষ্টে ভরে ছিল। তার আগে তিনি হারিয়েছেন তাঁর সবচেয়ে বড় ভরসা—প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) আর প্রিয় চাচা আবু তালিবকে। মানুষ তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, অপমান করেছে, তবুও তিনি কাউকে বদদোয়া করেননি। শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছিলেন।

আল্লাহ তআলা পুরস্কার হিসেবে এক গভীর রাতে তাঁকে নিজের সাক্ষাতে নিয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন, হঠাৎ ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাঁর ঘরে এলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল এক অপূর্ব বাহন— বুরাক। এত দ্রুত সে ছুটতে পারত যে, চোখ যত দূর দেখতে পায়, এক লাফে তত দূর পৌঁছে যেত।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বুরাকে চড়ে মুহূর্তের মধ্যেই মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে পৌঁছে গেলেন বায়তুল মাকাদ্দাসে, অর্থাৎ মসজিদুল আকসায়।

সেখানে কী হলো জানো? আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে একত্রিত করলেন। হযরত আদম (আ.), নূহ (আ.), ইবরাহিম (আ.), মুসা (আ.), ঈসা (আ.)— আরও কত নবী! সবাই এক কাতারে দাঁড়ালেন। আর তাদের ইমাম হলেন আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। যেন মহান আল্লাহ জানিয়ে দিলেন— সব নবীর দাওয়াত ছিল একই, আর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই ধারাবাহিকতার শেষ নবী।

তারপর শুরু হলো আরও বিস্ময়কর সফর। এক আকাশ, দুই আকাশ, তিন আকাশ... এভাবে তিনি সাত আসমান পেরিয়ে যেতে লাগলেন।

প্রথম আসমানে দেখা হলো আদম (আ.)-এর সঙ্গে। তিনি হাসিমুখে বললেন, —'স্বাগতম, হে নেক সন্তান, হে নেক নবী।'

দ্বিতীয় আসমানে ইয়াহইয়া (আ.) ও ঈসা (আ.), তৃতীয় আসমানে ইউসুফ (আ.), চতুর্থ আসমানে ইদরিস (আ.), পঞ্চম আসমানে হারুন (আ.), ষষ্ঠ আসমানে মুসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলো। প্রত্যেকেই তাঁকে আন্তরিক ভালোবাসায় বরণ করে নিলেন এবং দোয়া করলেন।

এরপর তাঁরা পৌঁছালেন সিদরাতুল মুনতাহায়। সেখানে এসে জিবরাইল (আ.) থেমে গেলেন। তিনি বললেন, —'হে আল্লাহর রাসুল, এর পরে যাওয়ার অনুমতি শুধু আপনার। আমি আর এক কদমও এগোতে পারব না।'

অতঃপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ ইচ্ছায় রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন এক সম্মানিত স্থানে পৌঁছালেন, যেখানে আর কোনো সৃষ্টি পৌঁছায়নি। সেখানেই আল্লাহ মুসলিম উম্মতের জন্য 'সালাত' উপহার দিলেন।

প্রথমে ছিল পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। নবীজি ফেরার পথে মুসা (আ.) বিষয়টি জেনে বললেন, —'আপনার উম্মতের জন্য এটা অনেক কঠিন হবে। আবার আল্লাহর কাছে যান, এটিকে সহজ করার আবেদন করুন।' বারবার আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে অবশেষে সালাত হলো পাঁচ ওয়াক্ত। কিন্তু আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় সওয়াব রেখে দিলেন পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান।

এই সফরে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জান্নাতের অপরূপ নিয়ামত দেখলেন, আবার জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তিও দেখলেন। তিনি বুঝলেন, মানুষের প্রতিটি কাজের হিসাব একদিন অবশ্যই হবে। এরপর রাত শেষ হওয়ার আগেই তিনি আবার মক্কায় ফিরে এলেন।

পরদিন যখন তিনি এই আশ্চর্য ঘটনার কথা মানুষকে বললেন, অনেকেই হাসাহাসি করল। কেউ বিশ্বাসই করতে পারল না। কিন্তু একজন মানুষ একটুও দ্বিধা করলেন না। তিনি ছিলেন আবু বকর (রা.)।

লোকেরা তাঁকে বলল, —'তোমার বন্ধু নাকি এক রাতেই আকাশ ঘুরে এসেছে!' আবু বকর (রা.) শান্তভাবে বললেন, 'যদি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলে থাকেন, তবে তা অবশ্যই সত্য।' এই অটল বিশ্বাসের কারণেই তিনি পেলেন 'আস-সিদ্দীক' অর্থাৎ 'সত্যের অকুণ্ঠ সমর্থক'— এই মহান উপাধি।

দাদা একটু থামলেন। নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, দাদু ভাইয়েরা, এই গল্প আমাদের শেখায়— কষ্টের পরই আল্লাহ স্বস্তি দেন। তাই কোনো বিপদে কখনো আশা হারাবে না। আর পাঁচ ওয়াক্ত সালাতকে কখনো বোঝা মনে করবে না। মনে রাখবে, এটা কোনো সাধারণ ইবাদত নয়; এটি সেই মহামূল্যবান উপহার, যা আমাদের নবী আকাশের সেই বিস্ময়কর সফর থেকে আমাদের জন্য নিয়ে এসেছিলেন।

তাহলে এখন সবাই ওঠে পড়। সবাই ঠিকঠাক মতো পড়ালেখা করবে কিন্তু। ইনশাআল্লাহ আগামীকাল তোমাদের শোনাব নবী জীবনের ভিন্ন কোন গল্প।

গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ১৫)

লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী

চলবে....

 

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ