দাদা গল্পের আসরে এসে চেয়ারে বসতে না বসতেই ছোট্ট নাতিটা জিজ্ঞেস করল, নিজের জন্মভূমি ছেড়ে কেউ কি শুধুমাত্র নিজের বিশ্বাসের জন্য অন্য দেশে চলে যেতে পারে?
দাদু মৃদু হেসে বললেন, পারে দাদুভাই। আর সেই ত্যাগের এক অসাধারণ গল্পই আজ তোমাদের শোনাব।
মক্কার সেই দিনগুলো ছিল খুবই কঠিন। যারা আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করেছিল, তাদের জীবন যেন প্রতিদিন নতুন কষ্টে ভরে উঠছিল। অনেককে নিজের পরিবার থেকেও আলাদা করে দেওয়া হতো- শুধু এই অপরাধে যে, তারা বলত, 'আল্লাহ একজন, আর মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর রাসুল।'
নবীজি তাঁর প্রিয় সাহাবিদের এই কষ্ট দেখে খুবই ব্যথিত হতেন। তিনি চাইতেন না, তাঁর সঙ্গীরা এভাবে নির্যাতিত হোক। একদিন তিনি তাঁদের ডেকে খুব স্নেহভরে বললেন, "তোমরা হাবশায় চলে যাও। সেখানে এমন একজন ন্যায়পরায়ণ রাজা আছেন, যার রাজ্যে কারও ওপর অন্যায় করা হয় না। আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বস্তির পথ খুলে না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে নিরাপদে থাকো।"
নাতনি অবাক হয়ে বলল, দাদু, তখন কি সবাই চলে গেল?
দাদা মাথা নেড়ে বললেন, না। প্রথমে অল্প কয়েকজন গোপনে রওনা হয়েছিলেন। ভাবো তো, নিজের জন্মভূমি, শৈশবের স্মৃতি, আপনজন— সবকিছু ছেড়ে অজানা এক দেশে যাওয়া কত কঠিন! কিন্তু তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি আর ঈমান রক্ষার জন্য সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এরপর আরও অনেক মুসলিম হাবশার পথে যাত্রা করলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নবীজির প্রিয় কন্যা রুকাইয়্যা (রা.) ও তাঁর স্বামী উসমান ইবনে আফফান (রা.)। ছিলেন জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.)-সহ আরও অনেক সাহসী সাহাবি।
একজন নাতি বলল, কুরাইশ নেতারা কি চুপ করে বসে ছিল?
দাদা বললেন, না। তারা খুব রেগে গেল। তারা ভাবল, যদি মুসলিমরা নিরাপদে থেকে যায়, তাহলে ইসলাম আরও ছড়িয়ে পড়বে। তাই তারা দুজন চতুর প্রতিনিধি পাঠাল হাবশার রাজা নাজাশীর দরবারে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল— যেভাবেই হোক মুসলিমদের আবার মক্কায় ফিরিয়ে আনা হবে। কিন্তু নাজাশী ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তিনি এক পক্ষের কথা শুনে বিচার করলেন না। তিনি মুসলিমদেরও নিজের কথা বলার সুযোগ দিলেন।
সবার পক্ষ থেকে দাঁড়ালেন জাফর ইবন আবি তালিব (রা.)। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, "হে মহামান্য রাজা, আমরা আগে অজ্ঞতার মধ্যে ছিলাম। মূর্তিপূজা করতাম, দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করতাম। তারপর আল্লাহ আমাদের মাঝে একজন সত্যবাদী রাসুল পাঠিয়েছেন। তিনি আমাদের সত্য কথা বলতে, আমানত রক্ষা করতে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে, অসহায়দের সাহায্য করতে এবং একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে শিখিয়েছেন।" এরপর তিনি সূরা মারইয়ামের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করলেন, যেখানে মরিয়ম (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর পবিত্র ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।
দাদু একটু থেমে বললেন, জানো, সেই আয়াত শুনে কি হলো?
নাতিরা একসঙ্গে বলল, "কি হলো?"
দাদু হাসলেন। অতঃপর বললেন, রাজা নাজাশীর চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। তাঁর দরবারের অনেক ধর্মীয় নেতার চোখেও পানি চলে এলো। নাজাশী বললেন, 'এই বাণী এবং ঈসা (আ.)-এর শিক্ষা একই আলোর উৎস থেকে এসেছে।' তারপর তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করলেন, 'আমি কখনোই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না। এরা আমার দেশে নিরাপদে থাকবে।'
সেদিন কুরাইশ নেতাদের প্রতিনিধিরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। আর মুসলিমরা হাবশায় শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন। সেখানে তারা নির্ভয়ে নামাজ পড়তেন, কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং আল্লাহর ইবাদত করতেন।
দাদু নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখো দাদু ভাইয়েরা, হাবশায় হিজরত শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার গল্প নয়। এটি ঈমানকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প। কখনো কখনো সত্যের পথে থাকতে হলে অনেক প্রিয় জিনিসও ছেড়ে দিতে হয়। তবে যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য এমন দরজা খুলে দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। এটাই আজকের গল্পের শিক্ষা।
নাতিরা চুপচাপ গল্প শুনছিল। তাদের চোখেও যেন সাহাবিদের সেই দীর্ঘ সফরের দৃশ্য ভেসে উঠছিল।
দাদু মৃদু হেসে বললেন, আচ্ছা, আজ এখানেই শেষ করি। আগামী রাতে তোমাদের শোনাব আরও এক হৃদয়ছোঁয়া ঘটনা— যে বছর নবীজি একের পর এক প্রিয় মানুষকে হারিয়েছিলেন, আর তায়েফের পথে রক্তাক্ত হয়েও আল্লাহর ওপর ভরসা হারাননি।
গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ১৩)
লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী
চলবে....
আইও/