শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬ ।। ১২ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১১ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :
শাহজালালের (রহ.) মাজারের দানবাক্স ব্যবস্থাপনায় উচ্চপর্যায়ের কমিটি বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ইসলামী আন্দোলন নেতার মৃত্যু, জানাজায় সহকর্মীদের ঢল মাছ-মুরগি থেকে সবজি, সবখানেই চড়া দাম কওমি শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গাইডলাইন ও শিক্ষা বিষয়ক মতবিনিময় অনুষ্ঠিত মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা পাবেন আধুনিক অস্ত্র: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ও মুসলিম রাজনীতি মক্কা-মদিনায় জায়গা কিনতে চান? তথ্যগুলো আপনার জন্য ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে হতাহতের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর শোক মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ঝড় তুললেন মুসলিম বিধায়ক চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক

আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ও মুসলিম রাজনীতি

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুহাম্মদ নাফিস খান নদভী ||

ভারতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতারা তাদের নির্দিষ্ট আদর্শ, স্লোগান এবং সমস্যাগুলোকে ভিত্তি করে জনসমর্থন অর্জন করেন। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একটি মূল বিষয়বস্তু থাকে, যার চারপাশে তাদের রাজনৈতিক কৌশল ও গণসংযোগ কার্যক্রম আবর্তিত হয়। তবে এটি বোঝা জরুরি যে, কোনো দল বা নেতা কোনো নির্দিষ্ট সমস্যাকে তাদের রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু করলেই এর অর্থ এই নয় যে, তাদের সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল সেই লক্ষ্যের জন্যই নিবেদিত।

উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো 'হিন্দুত্ব', কিন্তু কেবল এই ভিত্তির ওপর ভিত্তি করে এটি সিদ্ধান্তে আসা সঠিক হবে না যে, তারা সব পরিস্থিতিতে হিন্দুদের স্বার্থের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আদর্শিক স্লোগানের পাশাপাশি ক্ষমতা, রাজনৈতিক শক্তি এবং দলীয় স্বার্থকেও সামনে রাখে, আর বিজেপিও এই রাজনৈতিক নীতি থেকে ব্যতিক্রম নয়।

একইভাবে মায়াবতীর রাজনীতি দলিতদের অধিকার ও সমস্যার শিরোনামে বিকশিত হয়েছে। তিনি দলিতদের একটি কার্যকর রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে সামনে এসেছেন এবং কয়েকবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীও থেকেছেন। কিন্তু এটি জরুরি নয় যে, তার প্রতিটি রাজনৈতিক কৌশলের উদ্দেশ্য কেবল দলিতদের কল্যাণই ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো তার রাজনীতিতেও ক্ষমতা অর্জন ও ব্যক্তিগত স্বার্থ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কংগ্রেস নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক দল হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে, কিন্তু তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা ও ব্যবহারিক নীতি সবসময় পরস্পরবিরোধী ছিল। বরং কিছু ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক নীতি দেশে ধর্মীয় বিদ্বেষকে বেশ উসকে দিয়েছে।

ঠিক একইভাবে ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াইসির রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো মুসলিম জাতি এবং মুসলমানদের সমস্যা। তিনি সংসদে মুসলমানদের সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে তুলে ধরেন, সাংবিধানিক ও আইনি ভাষায় কথা বলেন এবং জনসভায় মুসলমানদের রাজনৈতিক সচেতনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের ময়দানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার বাগ্মিতা, আইনি অন্তর্দৃষ্টি এবং বিতর্ক করার দক্ষতা তার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে গণ্য হয়।

তবে এই সত্যটিও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয় যে, তিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং একজন রাজনৈতিক নেতা। তাই মুসলিম সমস্যা নিয়ে তার আলোচনাকে মুসলমানদের জন্য নিঃস্বার্থ আন্তরিকতার প্রমাণ মনে করা সমীচীন নয়। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা ও দলের কর্মকাণ্ডকে যেমন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, ঠিক একইভাবে ওয়াইসির রাজনীতিকেও একই মানদণ্ডে বিচার করা উচিত।

যদিও তিনি সংসদে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের একটি কার্যকর ধরন উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু তার বাগ্মিতা ও সংসদীয় কার্যক্রমের তুলনায় মাঠপর্যায়ে তার রাজনৈতিক সাফল্যের গ্রাফ অনেক নিচে দেখা যায়। একইভাবে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে তার ক্রমবর্ধমান কার্যক্রম জাতীয় স্বার্থের তুলনায় দলীয় স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সাথে বেশি সম্পর্কিত।

একইভাবে 'অপারেশন সিন্দুর'-এর পর মুসলিম দেশগুলোতে ভারতীয় অবস্থানের ব্যাখ্যা ও প্রতিরক্ষার জন্য গঠিত সরকারি প্রতিনিধি দলে তার অন্তর্ভুক্তিও নানাবিধ প্রশ্নের জন্ম দেয়।

সত্যি বলতে, দেশের রাজনীতি জাতীয় সেবার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতা অর্জন এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতারও ময়দান। তাই কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার ব্যাপারে অস্বাভাবিক ভক্তি বা অন্ধ আনুগত্য বুদ্ধিমত্তাসুলভ আচরণ হবে না।

মূল ভুলটি তখন হয় যখন আমরা কোনো রাজনৈতিক নেতাকে আমাদের জাতির একমাত্র ত্রাণকর্তা মনে করি এবং আমাদের সব আশা তার ব্যক্তিত্বের সাথে যুক্ত করে ফেলি। এই প্রবণতা কেবল আসাদউদ্দিন ওয়াইসির ক্ষেত্রেই নয়, বরং প্রতিটি সেই রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যিনি কোনো এক সময়ে মুসলমানদের পক্ষে কার্যকর কোনো কথা বলেন বা স্লোগান দেন। এর ফলে রাজনৈতিক সচেতনতা ও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণের পরিবর্তে আবেগপ্রবণ আনুগত্য বাড়তে থাকে।

তাই অধিক উপযুক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো, রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন বা বিরোধিতা ব্যক্তিত্বপূজার ভিত্তিতে নয়, বরং সামাজিক স্বার্থ, বাস্তব কর্মদক্ষতা, রাজনৈতিক কৌশল এবং মাঠপর্যায়ের ফলাফলের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কোনো নেতাকে আমাদের সম্মিলিত মুক্তি, ভবিষ্যৎ বা আবেগপূর্ণ সম্পর্কের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে ফেলা রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় নয় এবং এটি জাতীয় স্বার্থের জন্যও উপকারী নয়!!

[ভারতের নদওয়ার লেখক মুহাম্মদ নাফিস খান নদভীর লেখাটি উর্দু থেকে অনূদিত]

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ