বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬ ।। ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ১০ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :
‘খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশ’ নেত্রকোণা জেলা কমিটি গঠন সম্পন্ন সিঙ্গাপুর থেকে ১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকায় ২ কার্গো এলএনজি কিনছে সরকার দাবি না মানলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে সংসদে উত্তাপ খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফনে মোদিকে আমন্ত্রণ জানাল ইরান ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগে মনোনয়ন চূড়ান্ত: অর্থমন্ত্রী দেশ চলে ভালোবাসা ও সম্প্রীতিতে, ঘৃণায় নয়: মাওলানা আরশাদ মাদানী বিশ্ববাজারে আরও কমলো স্বর্ণের দাম, ২ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্নে আরজাবাদে ছাত্র জমিয়তের নির্বাচিত দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত শায়খে চরমোনাইর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার না হলে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক

‘আল বারাকাতু মাআল আকাবির’


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া ||

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

اَلْبَرَكَةُ مَعَ أَكَابِرِكُمْ

‘বরকত তোমাদের মুরব্বিদের সঙ্গে রয়েছে।’ অর্থাৎ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞায় অগ্রগণ্য মুরব্বীদের অনুসরণ ও সান্নিধ্যে কল্যাণ ও বরকত নিহিত থাকে।

ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বয়োজ্যেষ্ঠ, জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা। এ বৈশিষ্ট্য আজও দ্ব্যার্থহীনভাবে প্রযোজ্য। বিশেষত আমাদের দেওবন্দি ধারার মাদরাসাগুলোতে শিক্ষক, মুরব্বি, প্রতিষ্ঠান এবং ইলমি সিলসিলার প্রতি যে শ্রদ্ধা, সম্মান ও আদবের সংস্কৃতি যুগের পর যুগ লালিত হয়ে আসছে, তা ঐ বৈশিষ্ট্যেরই ধারাবাহিকতা এবং এই শিক্ষাব্যবস্থার অনন্য সংস্কৃতি হিসেবে সর্ব মহলে সমাদৃত।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সম্প্রতি প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের সুবিধায় কেউ কেউ তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে এমন কুধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত যে, জ্যেষ্ঠদের পরামর্শ নিষ্প্রয়োজন, মুরব্বিদের প্রতি আস্থা রাখার দরকার নেই, যুগচাহিদার প্রতিযোগিতায় তারা অগ্রসরমান নন, সময়ের ভাষা বুঝে তারা কথা বলেন না, চলেন না, তাই কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে মুরব্বিদের দিকনির্দেশনার প্রয়োজন নেই; তরুণরাই যথেষ্ট।

এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা তরুণদের অপেক্ষমান সোনালী ভবিষ্যতের উপর কালো ছায়া ফেলে। এটি একজন তরুণকে আলোকিত পথ থেকে বিচ্যুত করে অন্ধকার জগতে ঠেলে দেয়। ফলে উচ্ছৃঙ্খলতা, অবাধ্যতা ও মূল্যবোধহীনতা তার নিত্য সঙ্গী হয়ে ওঠে। অপরিণামদর্শিতাকে দূরদর্শিতা ভাবতে থাকে। কারণ অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা কেবল তারুণ্য দিয়ে লাভ করা যায় না। এর জন্য অভিজ্ঞ, দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞদের সংস্রব, সান্নিধ্য অপরিহার্য। অভিজ্ঞতা সহজেই লাভ করা যায় না। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়। দ্বীনি পরিমণ্ডলে তা আরো কণ্টকাকীর্ণ। যারা ইলম ও দাওয়াতের মহান খেদমতে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, উম্মাহর সুখ-দুঃখকে নিজের করে নিয়েছেন এবং সমাজের উত্থান-পতনের নানা অধ্যায় প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতাকে কী করে অস্বীকার করা যায়!

অনেক সময় অস্থিরচিত্ত কিছু তরুণের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মুরব্বিদের অভিজ্ঞতালব্ধ বিচক্ষণতার মিল হয় না। তরুণ মনের ভাবনা, মুরব্বিদের বুঝের ঘাটতি রয়েছে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ এর বিপরীত। একজন বাবা যেমন সন্তানকে আগুনে হাত দিতে নিষেধ করেন, কারণ তিনি তার ক্ষতির ভয়াবহতা জানেন; কিন্তু সে মনে করে তাকে খেলতে দেওয়া হচ্ছে না। ঠিক তেমনি অনেক ক্ষেত্রেই মুরব্বিদের সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞার পেছনে থাকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা এবং কল্যাণকামিতা।

জ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান ও তাদের পরামর্শ গ্রহণ একটি সুস্থ ও আদর্শ সমাজের মৌলিক ভিত্তি। একজন সন্তানের জন্য পিতার আদেশ-নিষেধ, ছাত্রের জন্য শিক্ষকের দিকনির্দেশনা, মুরিদের জন্য পীরের নসিহত, কর্মীর জন্য নেতার পরামর্শ এবং সাধারণ মানুষের জন্য ধীমান জ্ঞানী ও অভিজ্ঞদের নির্দেশনা সর্বদাই অপরিহার্য এবং এতেই রয়েছে কল্যাণ। এ সবই হয়ে থাকে অভিজ্ঞতার আলোকে। পৃথিবীর সকল সভ্য সমাজেই এই ধারা বিদ্যমান ছিল এবং আজও রয়েছে। সমাজ থেকে যদি মুরব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা, আস্থা ও পরামর্শ গ্রহণের সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়বে এবং অরাজকতা, উশৃঙ্খলার পথ প্রশস্ত হবে।

মাদরাসায় মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধের বিষয়টিকেও একশ্রেণীর লোক সমালোচনার চোখে দেখে। কেউবা একে নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী বলতে চায়। কিন্তু যেই কথিত নাগরিক অধিকারের ফলে ছাত্রদের মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা ব্যাহত হয়, সেই অধিকারে প্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলা বেধে দিতে বাধ্য। নাগরিক অধিকার মানে বাধাহীন জীবন নয়। স্বাধীনতার সীমানা অতিক্রম নয়; বরং নিয়ম-নীতির ভিতর থেকে  শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন করা। নাগরিক অধিকার থাকার অর্থ এই নয় যে, কেউ ইচ্ছামতো অন্যের অধিকার ক্ষুণ্য করবে, গালি-গালাজ করবে বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভঙ্গ করবে।

ছাত্রদের জন্য মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়টি মূলত শৃঙ্খলা সম্পর্কিত। প্রযুক্তির উপকারিতা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও কম নয়। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহার শিক্ষাজীবন, মনোযোগ, চরিত্র গঠন এবং নৈতিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকে। শোনা যায়, মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস তার সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অনুসরণ করতেন। তিনি নিজ সন্তানদের ১৪ বছর বয়সের আগে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেননি।

বর্তমান দুনিয়ায় বহু স্কুল, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে মোবাইল ফোন ব্যবহারে বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব বিধিনিষেধকে স্বাধীনতা বা অধিকার হরণ বলা পাগলের প্রলাপ বৈ কিছু নয়; বরং শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাই হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব। সুতরাং মাদরাসাগুলো যদি শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, মনোযোগ বৃদ্ধি, চরিত্র গঠন এবং শিক্ষার পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে মোবাইল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে তাকে পশ্চাৎপদতা বা নাগরিক অধিকার হরণ বলা বুদ্ধিমানের পরিচয় বহন করে না।

প্রকৃতপক্ষে একজন আদর্শ ছাত্রের প্রধান দায়িত্ব হলো ইলম অর্জনে মনোনিবেশ, আত্মগঠন এবং চরিত্রিক উৎকর্ষতা সাধনে আত্মনিয়োগ করা। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলাবোধ, শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, মুরব্বিদের প্রতি আস্থা। শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নিয়ম-নীতি আরোপ করা হয়। যাতে তারা নিজেদের উত্তম মানুষ রূপে গড়ে তুলে দেশ-জাতি ও দ্বীনের ব্যাপক কল্যাণের নিমিত্তে নিবেদিত হতে পারে।

তাই একজন সচেতন শিক্ষার্থীর কর্তব্য হলো, ব্যক্তিগত আবেগ বা ক্ষণিকের কাল্পনিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য না দিয়ে ইলম, আদব, শৃঙ্খলা এবং মুরব্বিদের সার্বিক  দিকনির্দেশনা মেনে জীবন গঠন করা।

লেখক: সহসভাপতি, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া; মুহতামিম, জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ, ঢাকা


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ