সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ ।। ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ ।। ৭ মহর্‌রম ১৪৪৮

শিরোনাম :

স্মৃতিতে অমলিন আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রহ.

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

|| মাওলানা বুরহানুদ্দীন বিন সাদ ||

বাংলার যে ক’জন মনীষীর অবদান-প্রাচুর্যে ধন্য হয়েছে এদেশের মানুষ। ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে যাদের অবদান ও কৃতিত্ব, আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রহ. তাঁদের অন্যতম। এ পবিত্র নাম যখনই স্মরণ করি, অন্তরে আশ্চর্য এক আলো এবং অপূর্ব এক সুবাস অনুভূত হয়। হযরত রহ. ছিলেন বাংলার প্রতিভা-প্রসবিনী নগরী খ্যাত কুমিল্লার অধিবাসী। তবে তাঁর অবদান ও অকৃপণ দানপ্রাচুর্যে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলার প্রতিটি তাওহীদী জনতা। তিনি ছিলেন নমুনায়ে সালাফ। ইমামুল মুহাদ্দিসীন ওয়াল মুজাহিদীন হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের যোগ্য উত্তরসূরী। তিনি একাধারে ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও জ্ঞানবিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, যোগ্য উসতাদ ও দরদী শিক্ষক এবং মানুষ গড়ার কারিগর। সফল সংগঠক, প্রাজ্ঞ রাজনীতিক, চৌকষ সমাজ সংস্কারক ও সমাজসেবক। আধ্যাত্ম-জগতের অবিসংবাদিত মহান রাহবার, রাজপথের বিপ্লবী সিপাহসালার ও লাখো মানুষের দিকপাল এবং এদেশের গণ-মানুষের জাতীয় রাহবার।

মোটকথা আল্লামা কাসেমী রহ. ছিলেন খিদমাতে দ্বীনের অত্যুজ্জ্বল এক আলোকমিনার, বিস্তৃত খিদমাতের বিপুল এক মিলনমোহনা। যেন বহুমুখী দ্বীনী খিদামাতের তিনি একাই একটি লাজনা, একাই একটি সংগঠন। বর্তমান সময়ে তাঁর মত এমন জামি’উল কামালাত ব্যক্তি পাওয়া বড়ই দুষ্কর। আল্লামা কাসেমী রহ. শুধু জ্ঞানের সাগর ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন চিন্তার সাগর এবং রূহানিয়াত ও আধ্যাত্মিকতার মহাসাগর। তিনি জলেছেন আমরণ মুসলিম-উম্মাহর কল্যাণ-চিন্তায় ও ভবিষ্যত-উৎকণ্ঠায়। দীপ্ত বদনে তিনি  ছড়িয়েছেন আলো, আলোকিত করেছেন চারপাশ। তাঁর সোনালী আলোয় আমরা খুঁজে পেতাম পথের দিশা। তিনি আমাদের প্রাণ, প্রাণ ভ্রমরা। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে তিনি ছিলেন চির সজাগ অতন্দ্র প্রহরী। বাংলার উলামায়ে কিরাম তাঁর থেকে গ্রহণ করেছেন চেতনার আলো, দেওবন্দিয়তের বিশুদ্ধ চেতনা এবং চরিত্রের শুভ্রতা ও পবিত্রতার অনিঃশেষ জ্যোতি। তিনি ছিলেন স্বর্ণপ্রসবিনী দারুল উলূম দেওবন্দের কৃতি সন্তান। ছিলেন ফিকরে দেওবন্দিয়্যাতের পতাকাবাহী, আকাবির-আসলাফের যোগ্য উত্তরসূরী। তাঁর ধমনীতে বহমান ছিলো ইশকে নবী। আমরণ ভেবেছেন এ জাতিকে নিয়ে। ভেবেছেন তলাবায়ে উলূমে নবুওয়াতকে নিয়ে। তালাবায়ে উলূমে নবুওয়াত যেহেতু আগামী পৃথিবীর সভ্যতার রাহবার, জাতির কর্ণধার, আসন্ন দিনের আদর্শের পথিকৃৎ, ইলমে নববীর জিম্মাদার। তাই এই জিম্মাদারদের চিন্তাগত আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করে আলোর অভীপ্সিত পথ দেখানো ছিল তাঁর একান্ত অভিলাষ, আর সে লক্ষ্যে তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছিল এদেশের দিক্ভ্রান্ত তালিবুল ইলমদের চেতনার বাতিঘর “লাজনাতুত তালাবাহ” নামক শিক্ষা ও সংস্কারমূলক তারবিয়াতি সংগঠন। যখনই মুসলিম উম্মাহ জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে, আল্লামা কাসেমী রহ. পূর্ণ উদ্যম ও শক্তি, মেধা ও বুদ্ধি, পাহাড়সম মনোবল ও সাহসিকতা এবং ত্যাগ ও কুরবানীর জাযবা নিয়ে ব্যাঘ্র হুংকারে রাজপথে নেমে পড়েছেন। ছুটে বেড়িয়েছেন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাতুলিয়া বাংলার আনাচে-কানাচে দ্বীনের মিশন নিয়ে। মুসলিম উম্মাহ খুঁজে পেত তাঁর বয়ান ও বক্তৃতায় আত্মার সজীবতা ও হৃদয়ের প্রশান্তি। বাংলার মানুষ তাঁর কাছে ঋণী। এ ঋণ শোধ করবার নয়। হৃদয়ের সুরভি মিশিয়ে সকল ভক্তি-ভালবাসা আর শ্রদ্ধার সাথে বলি কেবল- “জাযাহুল্লাহু খায়রান ও আজযালা মাছুবাতাহু ফিল আখিরাহ”।

ঈমান ও বিশ্বাসের অবিচল শক্তি, দ্বীনী গায়রত ও আত্মমর্যাদাবোধ, সত্যের পথে আপোসহীনতা, জীবন ও জগত সম্পর্কে সুগভীর অধ্যয়ন, সূক্ষ নির্ভুল বিচার-বিচক্ষণতা এবং সময়োপযোগী পথনির্দেশনা, চরিত্রের পবিত্রতা, দ্বীনের প্রতি দরদ-ব্যথা, আল্লাহর কালিমাকে জাগতিক সকল মতবাদের উপর বুলন্দ করার জন্য নিরন্তর জিহাদ ও মুজাহাদা, আদর্শ মানবগঠন, প্রতিটি উচ্চারণে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যাকুলতা সর্বোপরি উম্মাহর ভবিষ্যত-কল্যাণের পথে সীমাহীন আত্মত্যাগ ও কুরবানী এগুলো ছিলো তাঁর শুভ্র-সুন্দর জীবনের কিছু উজ্জ্বল শিরোনাম। বড় সুন্দর জীবন ছিল তাঁর, যেন এক- শুভ্র বস্ত্র, দাগহীন, নিষ্কলঙ্ক। মুখের কথায় ছিল দিলের তড়প। ছোট্টবেলা থেকে আমার মুহতারাম উসতাদগণের মুখে শুনে আসছি আল্লামা কাসেমী রহ. এর বিশালকায় ব্যক্তিত্বের কথা। মাঝে মাঝে ভাবতাম, যদি আমার ললাটে জুটতো তাঁর শিষ্যত্বের তিলক!! আল্লামা কাসেমী রহ. এর দরসী হতে পারিনি ঠিক, তবে তিনি আমার দাদা উস্তাদ। গর্বে বুক ভরে যেতো যখন ভাবতাম তিনি আমাদের কুমিল্লারই কৃতি সন্তান। কৈশোর থেকে হৃদয়ের গভীরে লালন করেছি তাঁর প্রতি ভালবাসার সবুজচারা। আমরা শাইখুল হিন্দ-কাশমীরী, মাদানী-থানবী রহ.-দেরকে দেখিনি ঠিক, তবে তাঁদেরই প্রতিচ্ছবি হযরত আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমীকে তো নয়নভরে দেখেছি, গ্রহণ করেছি বিভিন্ন সময়-সুযোগে তাঁর সোহবত ও সান্নিধ্যের মনমাতানো সৌরভ। ২০০৭ সালে আমার শ্রদ্ধেয় নানাজান হযরত আল্লামা মুফতী আবদুল আজিজ রহ, (সাবেক শায়খুল হাদীস, দারুল উলূম শর্শদী মাদরাসা ফেনী) এর জীবন ও কর্মের উপর ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে সামাজিক সংগঠন হেমায়েতে ইসলাম পরিষদের পক্ষ থেকে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সে সেমিনারের পোস্টারে বিশেষ অতিথি হিসেবে তাঁর নাম দেখেছি, সে থেকে এ আলোকিত ও সুরভিত নামের সাথে আমার পরিচয়। নানাজানের স্মারকগ্রন্থে তিনি নানাজান সম্পর্কে সুন্দর একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় উলামায়ে কেরামের মুখে তাঁর প্রশংসা ও আলোচনা শোনে তাঁর প্রতি আমার ভক্তি ও ভালবাসা বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ ২০১৩ সালে হেফাজত ইসলামের ব্যানারে নাস্তিক বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান ও সাহসিকতামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ ও রাজপথের নেতৃত্বের কারণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁকে দেখতে অন্তর সবসময় ব্যাকুল থাকতো। কিন্তু তিনি তো থাকেন ঢাকায়। আর আমি পড়ি তখন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ফেনীর জামি’আ মাদানিয়ায়। এরই মধ্য দিয়ে এক অজানা সৌভাগ্য আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। হাতছানি দিয়ে ডাকছিল আমায়। ২০১৫ সাল, তখন হেদায়েতুননাহু জামাতে পড়ি। একদিন হঠাৎ আমাদের এক উসতাদ দরসের শেষের দিকে বললেন, আজ তোমাদের জন্য একটি সুসংবাদ আছে। আজ আমাদের জামি’আয় আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী দা.বা. তাশরীফ আনবেন। তোমরা মাদরাসার সবকিছু পরিপাটি করে রাখো। ঘোষণা শোনা মাত্রই সবার মাঝে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। এবং অন্তর খুশিতে টইটম্বুর হয়ে পড়ল। সবার দৃষ্টি আজ সেই মুবারক পথে নিবদ্ধ হল যে পথে তাশরীফ আনবেন এশিয়া মহাদেশের শীর্ষ আলেম বাংলার মাদানী আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী। আহ! কি মিষ্টি-মিষ্টি অপেক্ষা! এমন মধুর মুহুর্ত জীবনে ক’বার আসে? ঠিক আসরের পূর্বে হঠাৎ হযরত জামি’আয় তাশরীফ নিলেন। দেখে মনে হল ধবধবে সাদা সুতির কাপড় পরা শুচিশুদ্ধ ও পুত-পবিত্র এক নূরানী ফিরিশতা সবেমাত্র আকাশ থেকে অবতরণ করেছেন। গায়ে মাদানী পাঞ্জাবী ও পায়জামা, মাথায় সাদা-সফেদ কিশতী টুপি। দেখতে ভারত-পাকিস্তানের আকাবিরদের মতো।  যেন তাঁকে ঘিরে বিরাজ করছে চারদিকে এক জ্যোতির্বলয়। চেহারায় নূরের ঝলক! চোখের তারায় আত্মিক প্রশান্তির ঝিলিমিলি! নূরের দ্যুতিতে চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠছে! এ দৃশ্য তো পার্থিব নয়, স্বর্গীয়! তাঁকে দেখে ভক্তি-ভালবাসার অপূর্ব এক আবেশ যেন আচ্ছন্ন করল আমার সমগ্র অস্তিত্বকে। জান্নাতি এক মানুষ! মুখে স্নিগ্ধতার হাসির উদ্ভাস! আহা! কেমন ছিল সে হাসির সৌন্দর্য! সেই হাসির স্নিগ্ধাতা! হাসি তো নয় যেন নূরের আভাস! দৃষ্টি তো নয় যেন মমতার শিশির! দেহ তাতে সিক্ত হয় এবং হৃদয় তাতে আপ্লুত হয়। আসরের পর হযরত রহ. জামি’আর মসজিদে বয়ান করলেন। বয়ানের পূর্বে জামি’আর মুহতামিম হযরত মাও. সাইফুদ্দীন কাসেমী দা.বা. হযরতের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরলেন এভাবে- “যাদের নিয়ে বাংলার মাটি গর্ব করে এমন এক ব্যক্তি আমাদের মাঝে আজ উপস্থিত। আমরা হযরতের বয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে শোনব এবং নোট করব।”

এরপর হযরত তালিবুল ইলমদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু নসীহত করেছেন, যার আলোয়ে আমি এখনো খুঁজে পাই নিজের গন্তব্য ও আসল মানযিল। আমি সে বয়ানটি ডায়রীতে নোট করেছিলাম। হযরত বলেছিলেন:

“আজ তালিবুল ইলমদের ভিতর ইলম তলবের মাদ্দা দিন দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ইলমের জন্য কুরবানীর মেজায বিদায় নিচ্ছে। উসতাদদের সাথে সম্পর্ক দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ উসতাদের সাথে গভীর সম্পর্ক ইলম হাসিলের অন্যতম শর্ত।”

“তালিবুল ইলম কখনো ইলম অর্জনে বিরক্ত হতে পারে না। ইলম হাসিলের পূর্বশর্ত হল তাহকীকের মেজায থাকা। আপনি কথার কথা, কিতাবুত তাহারাত বিষয়ে মুতালা’আ করছেন, তো আপনার জন্য কর্তব্য হল তা’লীমুল ইসলাম থেকে নিয়ে হেদায়া, বাদায়েউস সানায়ে’, ফাতাওয়ায়ে শামী এভাবে মুতাআখখিরীন থেকে নিয়ে মুতাকাদ্দিমীনের সকল কিতাব থেকে কিতাবুত তাহারাতটি মুতালা’আ করা। এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও ফাওয়ায়েদগুলো নোট করা, এরপর দেখা কোন কিতাবে কী এসেছে? আর কোন কিতাবে কী আসে নাই? এভাবে যদি মুতালা’আ করেন, তাহলে ইলমে গভীরতা ও প্রশস্ততা আসবে এবং পোখতেগি হাসিল হবে। যে ছাত্র নাহবেমীর পড়ছে, তার জন্য উচিত হল নাহবেমীরের মুসান্নিফ কিতাবের শুরুতে কিতাবটি পাঠ করার পর যে যোগ্যতা অর্জন হওয়ার কথা বলেছেন, সে যোগ্যতা তার অর্জন হচ্ছে কি না উসতাদের মাধ্যমে তা যাচাই করা।”

এরপর হযরত মুখস্ত নাহবেমীরের মুকাদ্দামাটি পড়েন।

“আজ তালিবুল ইলমদের মাঝে একটি মারাত্মক ব্যাধি বিস্তার করছে, তা হল, কুরআন কারীম তিলাওয়াতে অবহেলা ও অলসতা। অথচ কুরআন কারীম হল, সকল ইলমের ঝর্ণাধারা। তাই প্রত্যেক হাফেজ তালিবুল ইলমের উচিত দৈনিক তিন পারা তিলাওয়াত করা। আর গায়রে হাফিজদের উচিত কমপক্ষে এক পারা তিলাওয়াত করা। ইনশাআল্লাহ এতে ইলমে বরকত হবে। আর উপরের জামাতের তালিবুল ইলমগণ তাদাব্বুরের সাথে তেলাওয়াত করবেন। তেলাওয়াতের সময় একটি নোটখাতা রাখবেন, সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের আয়াত জমা করবেন। বিভিন্ন আহকাম, আকায়েদ, বাতিল ফিরকার খন্ডন, আল্লাহ তা’আলার সিফাত ইত্যাদি বিষয়ে দলীলগুলো জমা’ করবেন। আর দৈনিক অল্প কিছু সময় হলেও শুধুমাত্র হাদীসের মতন পাঠের জন্য রাখবেন। এরজন্য ইমাম নববী রহ. এর রিয়াযুস সালেহীন, ইমাম বুখারী রহ. এর আল আদাবুল মুফরাদ বা মিশকাত শরীফ অথবা হাদীসের যে কোন কিতাব হতে পারে। এরদ্বারা হাদীসে নববী থেকে জীবন চলার আদাব ও দিকনির্দেশনা লাভ করতে পারবেন।

হজরত আরো বলেন, প্রত্যেক আলিম, তালিবুল ইলমের জন্য আকাবির ও আসলাফদের কিছু নির্বাচিত মালফুযাত ও জীবনীগ্রন্থ মুতালা’আ করা জরুরী। তাহলে জীবনের বহু সমস্যার সমাধান তাঁদের জীবনীতেই পেয়ে যাবেন।”

“আপনারা হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ” কিতাবটি মুতালা’আ করবেন। এর মাধ্যমে আসরারে শরীয়তের ইলম আপনাদের অর্জন হবে।”

সর্বশেষ যে কথাটি তিনি বলেছেন, তা হল “তা’আললুক মা’আল্লাহর গুরুত্ব।”

হযরতের সেদিনের বয়ানটি আমার হৃদয় বীণার তারে ঝঙ্কার তুলেছিল। জামি’আর সকল আসাতিযাসহ তালিবুল ইলমদের চিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

এরপর ২০১৮ সালে ফেনীর ঐতিহাসিক মিজান ময়দানে “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ফেনী জেলা শাখা” কর্তৃক আয়োজিত শানে রিসালাত সম্মেলনে আল্লামা কাসেমী রহ. ছিলেন বিশেষ অতিথি। সেদিনও হযরতের বয়ান শোনতে ছুটে গিয়েছি ফেনীর মিজান ময়দানে। সেদিন লাখো মানুষের এ জনসমুদ্রে আল্লামা কাসেমী রহ. “ফিতনায়ে কাদিয়ানিয়্যাত” বিষয়ে জালাময়ী ভাষণ দেন। সুরা মায়েদার তৃতীয় আয়াতটি নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। সেদিনের বয়ানে উদ্বেলিত হয়েছে লাখো তাওহীদী জনতা। সর্বশেষ হযরতকে দেখেছি ইনতিকালের একমাস আগে ফ্রান্সে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কার্টুন প্রদর্শনের প্রতিবাদে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ আহুত ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে, বায়তুল মোকাররমে। সেদিন আশিকে রাসুল আল্লামা কাসেমী রহ. অসুস্থতা সত্ত্বেও হুইল চেয়ারে বসে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। 

১৩ ডিসেম্বর ২০২০ ইং রবিবার:

আজ সূর্য উঠেছে কিন্তু সূর্যের নেই কোন জ্যোতির্ময়তা। নেই কোন সকালের মিষ্টি রোদ। আজকের পূর্বদিগন্তে উদিত সূর্যকে মনে হল বড় বিষণ্ণ, বেদনাবিধুর। আজই তো ইসলামী দুনিয়াকে এতীম করে বিদায় নিবেন নমুনায়ে আসলাফ আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী। যেন এরই আগাম বার্তা দিয়ে যাচ্ছে আজকের বেদনাবিধুর সূর্য।

অবশেষে দুপুরে শুনতে পেলাম জাতীয় রাহবার আল্লামা কাসেমী রহ. আর নেই, তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। খসে পড়ল একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। খবরটি শোনা মাত্রই ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে শুধু একটা দীর্ঘ নিঃশ^াস বের হয়ে এল। সাথে সাথে তাঁর রুহের মাগফিরাতের জন্য দু’আ-দুরুদ ও কুরআন কারীম তিলাওয়াত করে ঈসালে সাওয়াব করলাম। আল্লামা কাসেমীর ইনতিকালের মধ্য দিয়ে ইতি ঘটল তা’লীম, দাওয়াত, সিয়াসাত ও ইসলাহী জগতের একটি সোনালী অধ্যায়ের। তাঁর ইনতিকালে এদেশের দ্বীনী, ইসলাহী, ইলমী ও সিয়াসী অঙ্গনে বিরাট শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

آسماں ان  کی لحد پر شبنم آفشانی کرے +   سبزہ نورستہ اس گھر کی نگہبانی کرے

তাঁর সমাধিতে আকাশ যেন শিশির বর্ষণ করে / সবুজের আবরণ যেন সেই ঘরকে ¯িœগ্ধ রাখে।

আল্লামা কাসেমীর জানাযায় লাখো মানুষের ঢল, তিল ধারণের ঠাঁই নেই

১৪ ডিসেম্বর শীতের সকালে আমরা বাদ ফজর জান্নাতী মেহমান আল্লামা কাসেমীকে বিদায় জানাতে বেরিয়ে পড়লাম, বাইতুল মুকাররমের দিকে। চারদিকে শুধু সাদা টুপি আর পাঞ্জাবী। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রাজকীয় মেহমান আল্লামা কাসেমীকে শেষবারের মত বিদায় জানাতে রাজধানী ঢাকার দিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভক্তবৃন্দ ফজরের আগেই এসে পড়েছে। আল্লামা কাসেমীর জানাযা দেখে আমার বুঝে এসেছে যে, আল্লামা কাসেমীরাই হাকীকী অর্থে মুকুটহীন স¤্রাট, মানুষের দিলে রয়েছে তাঁদের জন্য বিশেষ জায়গা। বাইতুল মুকাররম ও গুলিস্তান এলাকার আশপাশে লাখো মানুষের ঢল নামে। এদিকে মাইক থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে কেউ যেন ইমামের সামনে না দাঁড়ায়। জানাযা-পূর্ব আল্লামা কাসেমী রহ. এর জীবনের কিছু দিক নিয়ে আলোকপাত করেছেন তাঁরই রাজপথের সহযোদ্ধা কায়দে মিল্লাত আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী রহ.। তিনি আপন সহযোগী আল্লামা কাসেমী রহ.কে হারিয়ে নিজেও কেঁদেছেন, আমাদেরকেও কাঁদিয়েছেন। তাঁর আবেগময়ী ভাষায় সেদিন লাখো মানুষ কেঁদেছে, মনে হয় সেদিন দয়ালু রব্বে কারীমের রহমতের দরিয়াও জোয়ার চলে এসেছে। তিনি বলেন, “ওয়া আল্লাহ! নূর হুসাইন কাসেমী তো চলে গেছেন, এতগুলো খাম কে খরিবো? আল্লাহ গো এতগুলো খাম কে খরিবো?” আরো বক্তব্য দিয়েছেন আল্লামা মাহমুদুল হাসান দা.বা., মাও. নাজমুল হাসান দা.বা. সহ দেওবন্দের শুরা সদস্য মুফতী শফীকুল ইসলাম দা.বা. বক্তব্যে সবার অভিব্যক্তি ছিলো, “আল্লামা কাসেমী রহ. আমাদের ছেড়ে এমন মুহুর্তে চলে গেছেন, যখন তাঁর বেশি প্রয়োজন ছিল।” কারণ আল্লামা আহমদ শফী রহ.এর ইনতিকালের পর বাংলাদেশের ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের ভার অঘোষিতভাবে তাঁর কাঁধে এসে পড়েছে। তিনিই ছিলেন সবার আশার আলো। আজ আমাদের সবার প্রিয় ব্যক্তি আল্লামা নূর হুসাইন কাসেমী রহ. ইহধামে নেই, মৃত্যুর সেতু পার হয়ে আছেন তিনি রাব্বে কারীমের মেহমানখানায় রাজকীয় মেহমান হিসেবে। দু’আ করি! আল্লাহ যেন তাঁর কবরকে শীতল রাখেন, সবুজ গালিচা যেন তাঁর কবরকে ঢেকে রাখে। আমীন!

লেখক: খিররীজ, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা।

আইও


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ