সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ ।। ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। ৬ সফর ১৪৪৮

শিরোনাম :
কেন প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজ বর্জন, কী বলছে জমিয়ত নিউজিল্যান্ডের বৃহত্তম মসজিদ পরিদর্শনে রাবেতা মহাসচিব জাকাত বোর্ডকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নতুন রাজনৈতিক প্রধান বেছে নিলো হামাস ‘চলো সংসদ’ ঘিরে উত্তাল দিল্লি, বন্ধ ইন্টারনেট ইরানে বন্দুকধারীর হামলায় নিহত ধর্মীয় নেতা   নেত্রকোনার সীমান্তে পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত অন্তত ৪০ গ্রাম মিয়ানমার সীমান্তে ১০৯ কিমি বেড়া নির্মাণের চিন্তা করছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বন্যা: ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অনুদান স্পেনের জয়ে সেজদা দেওয়ায় প্রতিবন্ধী যুবককে পেটাল আর্জেন্টিনা সমর্থকরা

ইসলামি স্বর্ণযুগের অর্থনৈতিক উদ্ভাবন ও আধুনিক ব্যাংকিং

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

|| মিনহাজ উদ্দীন আত্তার ||

মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও স্থাপত্যকলার বিস্ময়কর সাফল্যের চিত্র। কিন্তু এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার এক নীরব অথচ যুগান্তকারী বিপ্লব।

এটি কেবল সোনা-রুপার লেনদেন বা বাণিজ্যের ইতিহাস নয়; বরং বিশ্বাস, লিখিত দলিল, নৈতিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক অনন্য অর্থনৈতিক সভ্যতার ইতিহাস। খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর প্রতিষ্ঠিত বায়তুল মাল থেকে শুরু করে আব্বাসীয় যুগের সাররাফদের উদ্ভাবিত সাক (Sakk) ও সুফতাজা (Suftaja)—এসব ব্যবস্থাই পরবর্তী সময়ে আধুনিক চেক, ব্যাংকিং, অর্থ স্থানান্তর এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আজ আমরা মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং কিংবা ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে অর্থ লেনদেন করছি। হাতে নগদ অর্থ ছাড়াই কেবল তথ্য, হিসাব ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই ধারণার কার্যকর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল শত শত বছর আগে বাগদাদ, দামেস্ক ও কায়রার প্রাণচঞ্চল বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোতে।

ইসলামি ব্যাংকিং গবেষক আবদুল কাদের শাচি তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ইউরোপে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিকশিত হওয়ার বহু আগেই মুসলিম বিশ্বে ব্যাংকিংয়ের অধিকাংশ মৌলিক উপাদান চালু ছিল। ইতিহাসের এই অধ্যায় আজও আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

বায়তুল মাল: প্রাতিষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার সূচনা

ইসলামি অর্থব্যবস্থার সুসংগঠিত ভিত্তি স্থাপিত হয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে। ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতির ফলে জাকাত, উশর, খারাজ, জিজিয়া ও গণিমাহসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল রাজস্ব রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতে থাকে।

এই সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বায়তুল মাল। একে আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মদিনার কেন্দ্রীয় কোষাগারের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় আবদুল্লাহ ইবন আরকাম (রা.)-এর ওপর।

হযরত উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, জনগণের আমানত হিসেবে দেখতেন। তিনি নিজেকে সেই সম্পদের মালিক নয়, বরং একজন বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধায়ক মনে করতেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সতর্কতা আজও সুশাসনের অনন্য দৃষ্টান্ত।

গবেষক মো. হাবিবুর রহমানের মতে, বায়তুল মাল কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল না; এটি সম্পদের পুনর্বণ্টন, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল।

আব্বাসীয় যুগে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকাশ

আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে বাগদাদ বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত হয়। এ সময় সাররাফ ও জাহবাধ নামে পরিচিত পেশাদার অর্থব্যবস্থাপক ও ব্যাংকারদের উত্থান ঘটে।

আবদুল কাদের শাচির গবেষণা অনুযায়ী, তারা আধুনিক ব্যাংকের মতো আমানত গ্রহণ, মুদ্রা বিনিময়, অর্থায়ন, দূরবর্তী অর্থ স্থানান্তর এবং ডকুমেন্টারি ক্রেডিট পরিচালনা করতেন। তাদের কার্যক্রম ছিল শরিয়াহভিত্তিক ও সুদমুক্ত অর্থনৈতিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

একই সময়ে মুদারাবা ও মুশারাকাভিত্তিক অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসায়িক মডেল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। এতে ঝুঁকি ভাগাভাগির পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অর্থের সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করা হতো।

ঐতিহাসিক ওয়াল্টার জে. ফিশেলও উল্লেখ করেছেন, মুসলিম সভ্যতায় ব্যাংকিংয়ের বিকাশ ছিল সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সময়ের তুলনায় অত্যন্ত অগ্রসর।

সাক ও সুফতাজা: আধুনিক ব্যাংকিংয়ের অগ্রদূত

মুসলিম অর্থব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন ছিল সাক এবং সুফতাজা।

সাক (Sakk) ছিল লিখিত অর্থপ্রদানের একটি দলিল, যা আধুনিক চেকের প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন বণিক এক শহরে অর্থ জমা দিয়ে অন্য শহরে সেই অর্থ উত্তোলন করতে পারতেন। ফলে দীর্ঘ ভ্রমণে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি অনেক কমে যেত।

অনেক ভাষাবিদের মতে, ইংরেজি Cheque শব্দটির শিকড় আরবি সাক শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে সুফতাজা (Suftaja) ছিল আধুনিক Bill of Exchange বা Letter of Credit-এর প্রাথমিক রূপ। এর মাধ্যমে বণিকরা নিরাপদে দূরবর্তী অঞ্চলে অর্থ স্থানান্তর করতে পারতেন।

অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ আব্রাহাম এল. উদোভিচ দেখিয়েছেন, সাক ও সুফতাজা মধ্যযুগীয় ইসলামি অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আরও নিরাপদ, গতিশীল এবং কার্যকর করে তুলেছিল।

ইউরোপীয় ব্যাংকিংয়ে মুসলিম বিশ্বের প্রভাব

একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় বণিক ও অর্থব্যবস্থাপকরা মুসলিম বিশ্বের উন্নত আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তীতে ভেনিস, জেনোয়া ও ফ্লোরেন্সের ব্যবসায়ীরা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন আর্থিক পদ্ধতি অনুসরণ করে নিজেদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।

আবদুল কাদের শাচির গবেষণা অনুযায়ী, ইউরোপে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের বিকাশে মুসলিম বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী ধারণা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

ক্যাশলেস সোসাইটির পথে

বর্তমান বিশ্বের ডিজিটাল ব্যাংকিং, অনলাইন ট্রান্সফার, ফিনটেক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কিংবা ব্লকচেইন—সবকিছুর মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, নির্ভুল রেকর্ড এবং নিরাপদ লেনদেন। অর্থাৎ, হাতে নগদ অর্থ ছাড়াই অর্থের মূল্য স্থানান্তর সম্ভব।

এই ধারণার কার্যকর প্রয়োগ মুসলিম স্বর্ণযুগে সাক ও সুফতাজার মাধ্যমে বহু শতাব্দী আগেই দেখা গিয়েছিল। আজকের ক্যাশলেস সোসাইটি মূলত সেই দীর্ঘ অর্থনৈতিক বিবর্তনেরই আধুনিক রূপ।

বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকিং বিশ্বব্যাপী দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ এম. উমর চাপরা, মুনাওয়ার ইকবাল এবং ফিলিপ মলিনিউক্সের গবেষণায় দেখা যায়, ইসলামি অর্থব্যবস্থা কেবল মুনাফাকেন্দ্রিক নয়; বরং নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে অর্থের সংযোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেবল প্রযুক্তির ওপর নয়; বরং বিশ্বাস, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ এই সত্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

আজ আমরা যদি বায়তুল মালের সুশাসন, সাররাফদের পেশাদারিত্ব এবং সাকের উদ্ভাবনী চেতনাকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বিত করতে পারি, তবে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

ইতিহাস কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও পথনকশা। আর সেই পথনকশা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি ঘটে তখনই, যখন প্রযুক্তির সঙ্গে নৈতিকতা, উদ্ভাবনের সঙ্গে দায়িত্ববোধ এবং অর্থনীতির সঙ্গে মানবিকতার সমন্বয় ঘটে।

লেখক: আলেম ও কৃষি উদ্যোক্তা

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ