|| ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন ||
ইসলামাবাদের আকাশে সেদিন ছিল নরম আলো—না পুরো রোদ, না পুরো মেঘলা। শহরের অভিজাত কূটনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশনের নিরিবিলি প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হলো এক স্মরণীয় দিনের যাত্রা। বহু প্রত্যাশিত সেই সাক্ষাৎ—পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে—অবশেষে দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে আমরা পৌঁছে গেলাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। বিশাল প্রাঙ্গণ, সুশৃঙ্খল নিরাপত্তা, আর চারপাশে এক ধরনের নীরব মর্যাদার আবহ—সব মিলিয়ে পরিবেশটি যেন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের ভার বহন করছিল। আমার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ হাই কমিশনার জনাব মুহাম্মদ ইকবাল খান, আমার একান্ত সচিব জনাব সাদেক আহমদ এবং আমার ছোট ভাই মাওলানা হাফেয জাহিদ হোসেন—প্রত্যেকেই এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎটি ছিল উষ্ণতা আর আন্তরিকতায় ভরা। তিনি আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন—একটি মুহূর্ত, যা কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে মানবিক বন্ধনের স্পর্শ এনে দিল। সালাম ও কুশল বিনিময়ের পর আমি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের প্রেরিত পত্রটি তাঁর হাতে তুলে দিই। তিনি তা গভীর মনোযোগে গ্রহণ করেন এবং আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে পাকিস্তান সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে ভোলেননি।
আলোচনার টেবিলে বসে কথোপকথন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হলো দুই দেশের অতীত, বর্তমান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে ঘিরে। তিনি স্মরণ করলেন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের নানা দিক, এবং জোর দিলেন আগামী দিনে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, কারিগরি সহযোগিতা ও ধর্মীয় বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার ওপর। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রীসহ বাণিজ্য, ধর্ম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রিগণ—যা এই বৈঠকের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
আমি সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকহারে বৃত্তির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাই। আমার কথার জবাবে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দেন—ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচশো বৃত্তি প্রদান করা হবে। এই ঘোষণা শুধু একটি সংখ্যার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দুই দেশের শিক্ষাগত সেতুবন্ধনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইঙ্গিত।
এরপর হাই কমিশনার ঢাকা-করাচী ও ঢাকা-লাহোর সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়টি উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাবেও ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ ও গতিশীল করে তুলতে পারে।
বৈঠকের শেষে বিদায়ের মুহূর্তটিও ছিল স্মরণীয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আমাদের সঙ্গে লনে হেঁটে এলেন। প্রাঙ্গণের সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যেন আনুষ্ঠানিকতার দেয়ালগুলো আরও নরম হয়ে এল। কার্যালয়ের সামনে এসে তিনি আমাকে গাড়িতে তুলে দিলেন। বিদায়ের আগে আবারও আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন—একটি উষ্ণ আলিঙ্গন, যা কেবল একজন রাষ্ট্রনায়কের সৌজন্য নয়, বরং এক আন্তরিক মানুষের মনের প্রকাশ।
সেদিনের সেই সাক্ষাৎ, সেই আন্তরিকতা, সেই সৌজন্য—সবকিছু মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে রইল আমার ভ্রমণ কাহিনির পাতায়; যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হবে না, বরং আরও গভীরভাবে স্মৃতির ভাঁজে অমলিন হয়ে থাকবে।
লেখক: সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
জেডএম/