নিজস্ব প্রতিবেদক
কিশোরগঞ্জ সদরের নোহার নান্দলা ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস সালাম আকন্দের বিরুদ্ধে অহেতুক বিভিন্ন অভিযোগ করে মানহানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী ও বর্তমান-সাবেক শিক্ষার্থীদের মাঝে এ ব্যাপারে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, মাওলানা আব্দুস সালাম আকন্দ আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ হলেও কওমি-আলিয়া উভয়ধারার আলেমদের মাঝে আলেম হিসেবে গ্রহণযোগ। পুরো এলাকায় তিনি সৎ ও আমানতদার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু হঠাৎ তার ব্যাপারে সুদি লেনদেন, টাকা গ্রহণ করে রসিদ না দেওয়া, বই থেকে কমিশন আদায়সহ বেশ কিছু অভিযোগ এনে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে কতিপয় ব্যক্তি অভিযোগ করে এবং পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যেগাযোগ মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে মানহানিকর লেখালেখি ও পোস্ট করে। এতে বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা ও এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে এর প্রতিবাদে রোববার (১২ জুলাই) দুপুরে মানবন্ধন আহ্বান করে। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই হাজারো মানুষ সে মানবন্ধনে যোগদান করে। এতে ময়মনসিংহ ভৈরব আঞ্চলিক সড়কে জানজটের সৃষ্টি হয়।
মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী ও গণঅধিকার পরিষদ কিশোরগঞ্জ জেলার সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন এ প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছি। প্রিন্সিপাল হুজুরের মতো সৎ ও আমানতদার মানুষ প্রতিষ্ঠানে তো দূরের কথা, বাইরেও পাওয়া দুষ্কর। তার বিরুদ্ধে এহেন অভিযোগ খুবই দুঃখজনক। স্বার্থন্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে আঘাত আসছে বলে এসব করছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
সাবেক ছাত্র ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘১৯৬৬ সালে এ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। আগে আলিম ছিল। বর্তমান অধ্যক্ষের হাত ধরে প্রতিষ্ঠানটি ফাজিল হয়। তিনি খুবই আমানতদারিতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তি তাদের স্বার্থ আদায় না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন এবং ভুয়া ও ভিত্তিহীন নিউজ করিয়েছেন। সব মিথ্যা অপবাদ। আমি হাজার হাজার সাবেক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি যারা এমন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এহেন মানহানিকর অভিযোগ ও সংবাদ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবার দাবি করছি।’
সাবেক শিক্ষার্থী ও এলাকার বাসিন্দা ইমরুল হোসেন বলেন, ‘অভিযোগ করা হয়েছে, টাকা গ্রহণ করে রসিদ দেওয়া হয় না, অভিযোগকারীদের বাচ্চারা তো বিশেষ আবেদন করে ফ্রি লেখাপড়া করে; তাদের কীভাবে তাকে রসিদ দেওয়া হবে?’
অভিভাবক শাহীন আলম বলেন, ‘আমি একজন অভিভাবক। আমার বাড়ির আশপাশের অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী এখানে লেখাপড়া করেছে ও করছে। আজ পর্যন্ত শুনলাম না, তিনি একটি টাকা কারো কাছ থেকে বেশি নিয়েছেন। বরং এমন শত শত নজির আছে, তিনি নিজ পকেটের টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করেছেন। আমি একজন অভিভাবক হিসেবে সরকারের কাছে দাবি করছি, এমন একজন সম্মানিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যারা এহেন অভিযোগ করেছে, তাদের যেন শাস্তির আওতায় আনা হয়।’
সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান অভিভাবক হারুন মিয়া বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে এ মাদরাসায় লেখাপড়া করেছি, আব্দুর হামিদ নোহারি সাহেবের অবসরের পর বর্তমান প্রিন্সিপাল হুজুর আসেন; আমরা তার চুল পরিমাণ দোষ কখনো পাইনি। যদি অভিযোগের প্রমাণ দিতে না পারে তাহলে হাজার হাজার মানুষ এর জবাব দেব। আমরা বৃষ্টিতে ভিজে সবাই সমাবেত হয়েছি, এর বিচার চাই!’

মানবন্ধনে সাবেক শিক্ষার্থী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ৩ ভাই ১ বোন এখনে পড়েছি। আমি ২০০১ সালে আলিম পাস করেছি। আমরা জানি, কতটাকা দিয়েছি। একটাকা বেশি নেওয়া হয়েছে এমন কোনো নজির নেই। বরং আমরা সবসময় হুজুর নিজের টাকায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। হুজুরের কোনো সুনাম নষ্ট হোক, তা আমরা কখনোই মেনে নেব না। আমরা জানতে চাই, সবসময় ভালো মানুষদের কেন ভালো থাকতে দেয় না?’
বর্তমান শিক্ষার্থী মরিয়ম বলেন, ‘আমি বর্তমানে ফাজিলে অধ্যয়ন করছি। আমাদের মাদরাসার যে বদনাম করেছে তা আমরা মানতে পারব না। হুজুর কখনো আমাদের কাছ থেকে কোনো বাড়তি টাকা নেননি। ১০০০ টাকা ভর্তি ফি, কিন্তু আমার কাছ থেকে ছাড় দিয়ে মাত্র ৫০০ টাকা নিয়েছেন।’

এদিকে স্যোশাল মিডিয়াতে সাবেক শিক্ষার্থী ও কিশোরগঞ্জে সাধারণ আলেমসমাজ এর তীব্র প্রতিবাদ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সাবেক শিক্ষার্থী ও ইসলামি বক্তা মাওলানা জাহাঙ্গীর হুসাইন আব্বাদী বলেন, ‘হুজুরের মতো এমন সৎ মানুষ পাওয়াই দুষ্কর। হাজারও দরিদ্র শিক্ষার্থী তার সহযোগিতার কারণে লেখাপড়া করতে পেরেছে। মাত্র ১২০ টাকায় আমি দাখিলের রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম। তার বিরুদ্ধে সুদি লেনদেন ও দুর্নীতির অভিযোগ শয়তানেও বিশ্বাস করবে না। আমি দুস্কৃতিকারীদের শাস্তি দাবি করছি।’
সাবেক শিক্ষার্থী ও লেখক আশিক আশরাফ এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ’কিশোরগঞ্জে কওমি মাদরাসার পাশাপাশি যারা আলিয়া মাদরাসায় পরীক্ষা দিয়েছেন, তারা মাওলানা আব্দুস সালাম আকন্দ সাহেবকে ভালোভাবেই চেনেন। আমরা ১৭০-১৮ জন বন্ধু একসাথে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। দেখেছি তিনি কতটা পিতৃসুলভ ও নিবেদিতপ্রাণ। ফরম ফিলাপের টাকা না থাকলে তিনি নিজের পকেটের টাকায় ফরম ফিলাপ করে দিতেন। স্থানীয় কিছু বখাটে, স্বার্থান্বেষী ইতর শ্রেণির লোক অসৎ সুবিধা হাসিল করতে না পেরে হুজুরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বানোয়াট অভিযোগ করেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই…।’
আইও/