বুধবার, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ।। ২৩ পৌষ ১৪৩২ ।। ১৮ রজব ১৪৪৭


উস্তাদে মুহতারাম ছিলেন সুন্নতের পথে এক আলোকবর্তিকা

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী

তাঁর (উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা আব্দুর রহিম রহ.) রাগটাও ছিল আশ্চর্য রকম মধুর। রাগলেও মুখমণ্ডল থেকে হাস্যোজ্জ্বলতার আলো মুছে যেত না। আর তিনি যখন হাসতেন, সে হাসির উষ্ণতা যেন নিঃশব্দে হৃদয়ের গভীরে অনুভব হতো।

তিনি ছাত্রদের বকা দিতেন, শাসন করতেন; কিন্তু সে বকায় কোনোদিন কাউকে কষ্ট পেতে দেখিনি। বরং ছাত্ররা সে শাসন গ্রহণ করত এমন আগ্রহে, যেন তারা জানত—এই শাসনের মাঝেই আছে স্নেহ, দায়িত্ব আর ভবিষ্যতের দিশা।

টানা ত্রিশ বছর তাঁকে দেখেছি। সুন্নতের খেলাফ কোনো কাজ তিনি করেছেন, এমন কোনো স্মৃতি মন খুঁজে পায় না। তিনি ছিলেন সুন্নতের পথে এক নীরব আলোকবর্তিকা। আড়ম্বরহীন অথচ দিকনির্দেশনায় অটল। কারো সঙ্গে ঝগড়া তো দূরের কথা, উচ্চ বাক্যে কাউকে আঘাত করতে দেখিনি কোনোদিন। অথচ সাহসে তিনি ছিলেন পাহাড়সম; নীতি ও উসূলের প্রশ্নে এক চুল পরিমাণও পিছু হটেননি।

ফ্যাসিবাদের দোসরেরা যখন লালবাগ কুক্ষিগত করার অশুভ ষড়যন্ত্রে নেমেছিল, আমাদের বহিষ্কারের রেজুলেশনে জোর করেও তাঁর দস্তখত আদায় করতে পারেনি। সে দিন তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন— কেননা, নীতির সঙ্গে আপোষ করা তার জন্য সম্ভব ছিল না।

জেল থেকে বের হয়ে হযরতের সঙ্গে সাক্ষাতের গভীর তামান্না ছিল আমার; কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতি সে সৌভাগ্য দেয়নি। পরে লালবাগ জামিয়ার মুহাদ্দিস মাওলানা ফখরুদ্দীন সাহেবের জানাযায়, শাহী মসজিদে হঠাৎ তাঁর সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে দেখেই কেঁদে ফেললেন। আমি তখন লালবাগ জামিয়ায় নেই—চোখের ভাষায় তিনি যেন আমাকে সান্ত্বনা দিতে চাইলেন, ভরসা দিতে চাইলেন।

সাধারণত তিনি কোনো প্রোগ্রামে যেতেন না। সবক থেকে কামরা, এই ছিল তাঁর নিয়মিত চলাচলের পরিসর। প্রতিদিন কমপক্ষে তিন থেকে চার পারা তিলাওয়াত করতেন। সকাল সন্ধ্যা রাত কিতাব মুতালাআ করাই ছিল তার ব্যস্ততা। পুরোটা সময় আমলের ক্ষেত্রে সুন্নতের কঠোর পাবন্দি বজায় রাখতেন। তবু ইন্তেকালের ঠিক আগের দিন এক ছাত্রের অনুরোধে তিনি গাজীপুরের এক মাহফিলে গিয়েছিলেন। সেখানে মনভরে দেখা হয়েছিল। কিন্তু কে জানত—সেই দেখাই যে শেষ দেখা! অবশ্য ইন্তেকালের দিন দুপুরে মাদ্রাসা অফিসে দূর থেকে এক ঝলক তাঁকে দেখার সুযোগ হয়েছিল; কিন্তু চোখ জমাতে পারিনি। আর শেষ দেখাটা—কাফনের কাপড় পরানো খাটিয়ায়, নীরব, স্থির, চিরবিদায়ের ভাষায়।

খাদেম জানালেন, দুপুরের দিকে অফিস থেকে ছাত্রাবাসের নিজ কামরায় যাওয়ার পথে তিনি কোমরে ব্যথা অনুভব করেছিলেন। কামরায় ডাক্তার এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। শারীরিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও যোহর, আসর ও মাগরিব তিন ওয়াক্ত নামাজই তিনি পূর্ণ মনোযোগে আদায় করেন। মাগরিবের পর তাসবিহ আদায় করছিলেন। হঠাৎ শরীর বেশ খারাপ লাগলে তাঁর সুযোগ্য সন্তান মাওলানা ফরিদ আহমদ ও ছাত্ররা তাঁকে নিজ খাটে শুইয়ে দেন। সেখানেই তিনি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করেন, আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে নিঃশব্দে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন।

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আল্লাহ তায়ালা হযরতের কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন, তাঁর মর্যাদা বুলন্দ করুন, আমীন!

লেখক: মহাসচিব, ইসলামী ঐক্যজোট ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া কোরআনিয়া লালবাগ

আরএইচ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ