শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৬ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২২ শাওয়াল ১৪৪৭


ফেনীর চরাঞ্চলের তরমুজ চাষীদের স্বপ্ন পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

বছর খানেক আগেও সোনাগাজীর চরাঞ্চলে তরমুজ আবাদ ঘিরে যে আশার আলো দেখেছিলেন চাষিরা, এবার যেন সে স্বপ্ন পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে। তরমুজ উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতিতে এবার হারাতে বসেছেন মূলধন। তরমুজ চাষীরা বলছেন, এবার আবাদ বাড়লেও কমে গেছে ফলন।

তাছাড়া, বাজারে নিম্নদর আর ভাইরাস আক্রমণ ও পরিবহন সংকটে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। গত বছরের তুলনায় ৫২৫ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ বাড়লে পরিস্থিতি এখন কৃষকদের প্রত্যাশার বিপরীতে। এতে চরম হতাশায় ভুগছেন, তরমুজ চাষে বিনিয়োগকারীরা।

সরেজমিনে উপজেলার চরাঞ্চলের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেতে তরমুজের আকার ছোট, অনেক ফলের রং নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও আবার বৃষ্টির কারণে নিচের অংশে ধরেছে পচন। তেলের দাম বাড়ায়, পরিবহনে বেড়েছে ৩ হাজার টাকা বাড়তি খরচ। শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে প্রতিদিন ১শ' টাকা করে।

তরমুজ চাষিদের ভাষ্যানুযায়ী, প্রতি একশ বিশ শতক জমিতে (এক কানি) তরমুজ চাষে এবার গড়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার। অথচ বাজারে সেই খরচের তিন ভাগের এক ভাগও উঠছে না।

তরমুজ চাষী কায়েস মাহমুদ বলেন, আগে একটি বড় ট্রাক ভর্তি তরমুজ আড়তে পাঠালে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পাওয়া যেত। এবার দুই দিন নিজে দাঁড়িয়ে পাইকারদের কাছে খুচরা বিক্রি করেও ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি উঠছে না। এর মধ্যে বাড়তি পরিবহন খরচ, বিক্রির ওপর ৬ থেকে ৯ শতাংশ আড়ত কমিশন, অতিরিক্ত শ্রমিক ব্যয়, ভাইরাসের কারণে বারবার সেচ, সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের খরচ বাদ দিলে গাড়িপ্রতি হাতে থাকছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। ফলে উঠছে না মূলধনও।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তরমুজের সাইজ ছোট হওয়ায় দুই-তিন কানি জমির ফলন এক গাড়িতে তুলতে হচ্ছে। গত বছর যেখানে দ্বিগুণ লাভ হয়েছিল, এবার সেখানে পুরো মৌসুমে লোকসান নিশ্চিত। এবার ভিন্ন জেলার চাষিরা রমজানে ভালো দাম পেলেও সোনাগাজীর চাষিরা তখন ফলন তুলতে পারেনি।

চাষী ও আড়তদারদের তথ্য অনুযায়ী, একশত বড় বোল্টার সাইজের তরমুজ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ২২ হাজার টাকায়, যা গত কয়েক বছর ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার টাকা ছিল। মাঝারি বড় সাইজের তরমুজ পূর্বে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এবার সর্বোচ্চ ১৭ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে। মাঝারি ছোট সাইজের তরমুজের দাম ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা থেকে নেমে এসেছে ৮ হাজার টাকায়। ছোট ক্যাট সাইজের তরমুজ ৬ হাজার থেকে নেমে এসেছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়।

কৃষি উদ্যোক্তা রুবেল জানান, দীর্ঘদিন কৃষি নিয়ে কাজ করায় এবার অনেক চাষি তাঁর ওপর আস্থা রেখে সমন্বিতভাবে প্রায় ৯০ একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। কিন্তু বর্তমান বাজারদর ও পরিবহন সংকটে মাঠেই তরমুজ নষ্ট হচ্ছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, অতীতের লাভ দেখে অনেকে আত্মীয়স্বজন ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তরমুজ চাষে করছেন। এখন তাদের অনেকেই মূলধনের অর্ধেকও তুলতে পারবেন না। কেউ কেউ পুরোপুরি নিঃস্ব হওয়ার পথে। সরকারের কাছে মাঠের তরমুজ পরিবহনে সহায়তা ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাই।

চাষীদের তথ্যমতে, সোনাগাজী উপজেলার প্রায় ১৪টি মাঠে তরমুজ চাষে ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ বিনিয়োগকারী রয়েছেন। প্রতি শেয়ার ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকায় স্থানীয় এবং সুবর্ণচরের চাষীদের সাথে সম্মিলিতভাবে তরমুজ চাষ করছেন তারা।

চাষি আবু ইউসুফ বলেন, গাছ লাগানো থেকে তরমুজ কর্তন প্রায় চার মাস সময়ের মধ্যে হয়। শেষ ৪০ দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এবার ফুল এলেও গাছে পর্যাপ্ত ফল আসেনি। বিভিন্ন বালাইনাশক ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন মেলেনি। শেষ দিকে যেসব ফলে আকার এসেছে, সেগুলোরও অনেকগুলো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে খোসায় দাগ পড়ে গেছে।

মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের অভিযোগ, তরমুজ উৎপাদনে কৃষি বিভাগের কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। পুরো মৌসুমে ভাইরাস, ফলন কমে যাওয়া, ফুলে ফল না আসা এসব বিষয়ে সময়মতো পরামর্শ বা মাঠভিত্তিক সহায়তা কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পান নি তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে ফেনীতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হয়েছিল এবং আবাদ ৫২৫ হেক্টর বাড়ায় এবার তরমুজের বাজার ২৫০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

অভিযোগ প্রসঙ্গে সোনাগাজী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার স্থানীয় কৃষকরা প্রতি মৌসুমে সুবর্ণচর এলাকার চাষিদের অংশীদারত্বে রেখে তরমুজ চাষ করে থাকেন। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শের চেয়ে তারা সুবর্ণচরের চাষিদের অভিজ্ঞ মনে করে আবাদ করে থাকেন। এতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।

কৃষি বিভাগ জানায়, অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগে স্বাভাবিক পরাগায়ন ব্যাহত হয়ে ফলন কম হয়। যদিও কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে গিয়ে চাষিদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এবারের ফলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে প্রাকৃতিক আবহাওয়ার পরিবর্তন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় তরমুজের আবাদ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে দামও তুলনামূলক কমে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, ফেনীর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্লাহ জানান, অতীতের তুলনায় এবার তরমুজের আবাদ কয়েকগুণ বেড়েছে, ফলনও ভাল হয়েছে। তরমুজ চাষিরা বৃষ্টি এবং জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন সমস্যার কারণে লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করছে। আশা করি তেমন লোকসান হবে না। তরমুজ চাষিরা লাভবান হবে।

জেডএম/

 


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ