বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এবং প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ, লেখক ও মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের সম্পর্ক ছিল শুধু একজন লেখক ও পাঠকের নয়; বরং তা ছিল গভীর শ্রদ্ধা, পারিবারিক স্মৃতি, সাহিত্যিক অনুরাগ এবং আত্মিক বন্ধনের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
হুমায়ূন আহমেদ নিজেই একাধিকবার বলেছেন, তিনি মাওলানা মুহিউদ্দীন খানকে তাঁর ‘পিতার প্রতিচ্ছবি’ মনে করতেন। তাঁর বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান ছিলেন মাসিক মদীনা পত্রিকার একনিষ্ঠ পাঠক এবং মুহিউদ্দীন খানের ঘনিষ্ঠজন। শৈশব থেকেই হুমায়ূনের পরিবারে মদীনা পত্রিকা নিয়মিত আসত, ফলে মুহিউদ্দীন খানের লেখা ও চিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও খুব অল্প বয়সেই গড়ে ওঠে।
এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ বলেন, তিনি মাওলানা মুহিউদ্দীন খানকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করতেন। একদিন তিনি মোহনলালের মিষ্টি নিয়ে তাঁর অফিসে যান। কদমবুসি করলে মুহিউদ্দীন খান তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। সেই মুহূর্তের অনুভূতি বর্ণনা করতে গিয়ে হুমায়ূন বলেন, ‘আমি যেন আমার বাবাকেই ফিরে পেয়েছিলাম।’
শুধু তাই নয়, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়েও তিনি একবার মুহিউদ্দীন খানের কাছে যান এবং তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ইনি তোমাদের দাদুভাই, আমার পিতা।’ এই সম্বোধনই তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিনের দাদা ছিলেন ইসলামি চিন্তাবিদ প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ। তিনি ছিলেন মুহিউদ্দীন খানের সাহিত্যজীবনের অন্যতম পথপ্রদর্শক। মুহিউদ্দীন খানের আত্মজীবনী ‘জীবনের খেলাঘরে’ গ্রন্থে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁসহ হুমায়ূন আহমেদের পারিবারিক সদস্যদের নানা স্মৃতিচারণ স্থান পেয়েছে। এ কারণেও হুমায়ূন আহমেদের কাছে বইটি ছিল বিশেষ প্রিয়।
মুহিউদ্দীন খান ও হুমায়ূনের পরিচয় শুধু প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে নয়, শৈশবেও হয়েছিল। হুমায়ূনের বাবা যখন নয়া যামানা পত্রিকায় মুহিউদ্দীন খানের সঙ্গে কাজ করতেন, তখন ছোট্ট হুমায়ূন একদিন বাবার সঙ্গে অফিসে যান। মুহিউদ্দীন খানের কোলে বসে তাঁর পকেট থেকে কলম বের করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে দাগ কেটে ফেলেন। সবাই বিব্রত হলেও মুহিউদ্দীন খান শিশুটির দুষ্টুমি দেখে শুধু হাসছিলেন। পরবর্তীতে এই ঘটনাটি হুমায়ূন আহমেদ নিজেই স্মরণ করতেন।
হুমায়ূন আহমেদের জীবনের শেষ সাহিত্য প্রকল্প ‘নবীজি’ রচনার পেছনেও মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাবাজারে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এক মাওলানার হৃদয়স্পর্শী দোয়া শুনে হুমায়ূন মুগ্ধ হন। পরে সেই মাওলানা তাঁকে অনুরোধ করেন, ‘আপনি যদি আমাদের নবী করিম (সা.)-এর জীবনী লিখতেন, তাহলে বহু মানুষ আগ্রহ নিয়ে তা পড়ত।’ এই অনুরোধই তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। এরপর তিনি নবীজির জীবনী লেখার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি পরামর্শ নেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের কাছ থেকে। তাঁর সীরাতবিষয়ক গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করে গভীর অধ্যয়নও শুরু করেন।
‘নবীজি’ লেখার সময় হুমায়ূন আহমেদের মনে একটি আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়—তিনি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখতে চান। এ বিষয়ে পরামর্শ নিতে তিনি আবারও মুহিউদ্দীন খানের কাছে যান। তখন খান সাহেব তাঁকে নিজের লেখা ‘স্বপ্নযোগে রাসূল (সা.)’ গ্রন্থটি পড়তে দেন। বইটি হুমায়ূন গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে এটি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় গ্রন্থে পরিণত হয়।
ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তিনি নিজের সঙ্গে মাত্র কয়েকটি ব্যক্তিগত জিনিস নিয়েছিলেন—একটি জায়নামাজ, একটি তাসবিহ এবং মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের ‘স্বপ্নযোগে রাসূল (সা.)’ বইটি। চিকিৎসাকালেও বইটি ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
হুমায়ূন আহমেদের অসমাপ্ত গ্রন্থ ‘নবীজি’ তাঁর জীবনের শেষ সাহিত্যকর্ম। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে স্বপ্নে দেখার পরই তিনি বইটি পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা শুরু করবেন। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে এক রাতে ঘুম থেকে উঠে অজু ও গোসল করে তিনি আবার ‘নবীজি’ লেখা শুরু করেছিলেন। তবে তিনি গ্রন্থটি শেষ করে যেতে পারেননি। সেটার আক্ষেপ বাংলাভাষী পাঠকদের রয়ে যাবে চিরকাল।
আইও/