সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪ ।। ৯ আষাঢ় ১৪৩১ ।। ১৮ জিলহজ ১৪৪৫


তথ্য প্রযুক্তিতে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশের ফতোয়া বিভাগগুলো!


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: আওয়ার ইসলাম

এদেশে দ্বীনের আলো বিলাতে এবং মানুষের মাঝে ইসলামের চর্চাকে সমৃদ্ধ করতে যুগ যুগ ধরে কাজ করছে কওমি মাদরাসাগুলো। মুসলিম জীবনের নানা বিষয়ের সমাধানের জন্য এসব মাদরাসায় রয়েছে স্বতন্ত্র গবেষণা বিভাগ। যেগুলো পরিচিত ‘ফতোয়া বিভাগ’ নামে। যুগ ও সময়ের চাহিদা পূরণে এ বিভাগে সমাধান হওয়া মাসয়ালা-মাসায়েল অফলাইনের পাশাপাশি এখন অনলাইনে মানুষ পেতে চায়। কিন্তু কী কারণে ঐতিহ্যবাহী এসব প্রতিষ্ঠান এদিক দিয়ে বহির্বিশ্বের তুলনায় এখনো পিছিয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন আওয়ার ইসলামের চিফ রিপোর্টার হাসান আল মাহমুদ। তার ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব-


তথ্য প্রযুক্তিতে বিশ্বের খ্যাতনামা ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফতোয়া বিভাগ এগিয়ে থাকলেও এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশের ফতোয়া বিভাগগুলো। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ, ওয়াকফ দেওবন্দ, দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর, জামিয়া রহিমিয়্যা এবং পাকিস্তানের দারুল উলুম করাচী, জামিয়া বিন্নুরি টাউনসহ উল্লেখযোগ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সাইট ছাড়াও ফতোয়া বিভাগের জন্য রয়েছে স্বতন্ত্র গতিশীল ওয়েবসাইট। এছাড়া, সৌদি, মিশর এমনকি যুদ্ধ কবলিত ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের প্রায় সকল দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ফতোয়া বিভাগের ওয়েবসাইট পাওয়া যায় অনুসন্ধানে। এসমস্ত সাইটগুলোর চলমান গতিশীল কার্যক্রমও চোখে পড়ে ব্যাপকভাবে।  

অপরদিকে বাংলাদেশের কোনো ফতোয়া বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র ও গতিশীল ওয়েবসাইট পাওয়া যায়নি আওয়ার ইসলামের অনুসন্ধান টিমের কাছে।

অনুসন্ধানে কেবল ফতোয়া সংশ্লিষ্ট ‘মাসিক মুঈনুল ইসলাম’ নামে হাটহাজারী মাদরাসার একটি পত্রিকা, মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়ার মুখপত্র ‘মাসিক আল-কাউসার’ আর আহলে হক মিডিয়া’ নামে ওয়েবসাইটের দেখা মেললেও এগুলো স্বতন্ত্র কোনো ফতোয়া বিভাগের নয় বলে জানা যায়।

এছাড়া, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার প্রাতিষ্ঠানিক নিজস্ব ওয়েসাইট থাকলেও তাতে ফতোয়া বিভাগের কোনো অপশনই দেখা মেলেনি।

এদিকে গুগলে বাংলায় ‘ফতোয়া বিভাগ’ লিখে সার্চ করলে ঢাকার বছিলা মোহাম্মপুরে অবস্থিত জামিয়া রাহমানিয়া আজিজিয়ার ফতোয়া বিভাগটি সবার প্রথমে আসে। এটি মূলত রাহমানিয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ওয়েবেসাইটের একটি বিভাগ। ফতোয়ার জন্য স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট নয়। তেমনই জানালেন এই ওয়েবসাইটের পরিচালক মাওলানা ইউনুস আনোয়ার।

আওয়ার ইসলামকে তিনি জানান, ‘ওয়েবসাইটে আমাদের প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট নোটিশ, শিক্ষা ‌কার্যক্রম ইত্যাদি পাবলিশ করা হয়। আর এ সাইটের ফতোয়া বিভাগে অনেক প্রশ্ন আসে। আমাদের ফতোয়া বিভাগের ছাত্ররা যেসব ‘তামরীন’ করেন, তার অধিকাংশগুলোই এই ওয়েবসাইটে আসা প্রশ্নের উত্তর। এই উত্তরগুলো যে মেইল থেকে আসে সে মেইলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সাইটে প্রকাশ করা হয় না।’

এছাড়া, টঙ্গী দারুল ইফতা কর্তৃক সম্পাদিত আল মাসউদ অনলাইন নামে একটি ফতোয়ার সাইট অনুসন্ধানে দেখা মেললেও তার সক্রিয়তা শুধু প্রশ্নোত্তরেই সীমাবদ্ধ। এখানে কোনো প্রশ্ন-উত্তর পাবলিশ করা হয় না বলে জানা যায়।

সিলেটের জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মোহাম্মদপুর মাদরাসার নামে ওয়েবসাইট, চট্রগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া মাদরাসার নামে ওয়েবসাইটের ফতোয়া বিভাগ অংশে সর্বশেষ আপডেট ১৩ জানুয়ারি ২০২০।

ঢাকার বসুন্ধরার ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত ‘মারকাযুল ফিকরিল ইসলামি বাংলাদেশ’ নামে একটি সাইটের দেখা মেলে। প্রতিষ্ঠান থেকে ১২ খন্ডে প্রকাশিত ফতোয়া সংকলন ‘ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত’-এর ফতোয়া ও মাসিক আল-আবরার পত্রিকার পিডিএফ এ সাইটে পাবলিশ করা আছে। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ছাড়া সাইটে আর কোনো চলমান গতিশীল কার্যক্রম দেখা মেলেনি। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল মুফতি ও উস্তায মুফতি এনামুল হক কাসেমী এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ’আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রথম ২০ বছরের জমা করা ফতোয়াগুলো অফলাইনে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো থেকে বাছাই করা ফতোয়াগুলো আমাদের ওয়েবসাইটে পাবলিশ করা আছে। আর ২০ বছরের পরে চলমান ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরের ফতোয়াগুলো জমা করা আছে, অফলাইনে বই আকারে প্রকাশিত হবার পরে ওয়েবসাইটে পাবলিশ করা হবে।’

‘উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণা পরিষদ’ নামে একটি সাইট পাওয়া যায়, সেখানে ৭ দিন আগে আপ করা হয়েছে সর্বশেষ মাসয়ালা। কিন্তু এ সাইটটি কোন্ প্রতিষ্ঠানের বা কাদের তা নিয়ে অনুসন্ধানে মেলেনি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিচয়।

এছাড়া, ঢাকার শাহাজাদপুর গুলশানের ঠিকানায় দেয়া ‘আইডিসি ফতোয়া বিভাগ’ নামেও একটি সাইটের অনুসন্ধান মেলে। সাইটে দান করার অনুরোধ ও তাদের কাছে প্রশ্ন করার আহ্বান জানানো ছাড়া কোনো মাসয়ালা পাবলিশ দেখা যায়নি।’   

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফতোয়া বিভাগগুলোর তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও আওয়ার ইসলামের কাছে অনেক আলেম দুঃখপ্রকাশ করেন। তারা জানান, অনেক সময় একটা বিষয় কিতাব ঘেঁটে সমাধান পেতে সময় লাগে, কিন্তু সে বিষয়টা আরবি-উর্দু ভাষায় গুগল সার্চ করলেই পাওয়া যায় খুব সহজে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক ফতোয়া বিভাগে দায়িত্বরত প্রধান মুফতি জানান, ‘আমরা হাতে লিখে ফতোয়া দিই, এমনকি ইফতা ফারেগীনদের সার্টিফিকেটও দেয়া হয় হাতে লিখে। এ নিয়ে মুহতামিম সাহেবকে কম্পিউটার ব্যবহারের কথা বললে অনীহা প্রকাশ করেন।’ এ সময় তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘যেখানে ভেতরগত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারই নেই, সেখানে আবার ওয়েবসাইট!’

ঢাকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাদরাসা ব্যতীত প্রায় মাদরাসার ফতোয়া বিভাগগুলোতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সরেজমিনে দেখা না মেললেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও ছাত্রদের সচেতনতা লক্ষ করা গেছে সমীক্ষায়। তারা তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারসহ যুগ-চাহিদার প্রেক্ষিতে দাওয়াতি কার্যক্রমে তথ্য প্রযুক্তির ভূমিকা ও ফতোয়া বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র গতিশীল ওয়েবসাইটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন আওয়ার ইসলামের কাছে।

চলবে...

কেএল/


সম্পর্কিত খবর


সর্বশেষ সংবাদ