শিরোনাম :
স্যাইটানিজম: অভিশপ্ত শয়তানের ধর্ম!
আগস্ট ০৫, ২০২১ ৬:৩৫ অপরাহ্ণ

আবু মুকাম্মিল সাইফ।। শয়তান হলো একটি চরিত্র। যাকে বিভিন্ন ধর্ম দুষ্ট বা খারাপ প্রকৃতির ক্ষমতাশালী এবং স্রষ্টা ও মানবজাতির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

সাধারণত ধরে নেওয়া হয়, শয়তান উৎপথগামী, অবিশ্বাসী, পাশাপাশি সে অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেও সক্ষম। শয়তান বলতে আমরা সাধারণত ইবলিসকেই বুঝি। ইসলাম ধর্মে ইবলিসকে দুষ্ট জিন বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআন এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ আদম আ. কে সৃষ্টি করলেন এবং তিনি সকল ফেরেশতাদের বললেন আদমকে সিজদাহ্ করতে, তখন সকল ফেরেশতা সিজদাহ্ করলো। অথচ ইবলিস সিজদাহ্ করলো না। ফলে সে অবিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হলো এবং আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করলেন।

কারো কারো মতে শয়তান শব্দটি গ্রিক ভাষার দিয়াবলস থেকে এসেছে। যার শাব্দিক অর্থ অপবাদদানকারী ব্যক্তি বা অভিশপ্ত। আরবি ভাষায় শয়তান মানে বিপথগামী এবং হিব্রু ভাষায় সতন, লাতিনে সাতান মানে শত্রু বা দুশমন।

শয়তান হলো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। আল্লাহ্‌ বলেন হে আদম সন্তান, আমি কি তোমাদের বলে রাখিনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদত করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (ইয়াসীন: ৬০)

শয়তানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ্‌ বলেন শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ কর। সে তার অনুসারীদের আহ্বান করে যেন তারা জাহান্নামী হয়। (ফাতির: ৬)

স্যাইটানিজম কী: শয়তান উপাসনার ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও কালের বিবর্তনে স্যাইটানিজম নামে একটি বিশেষ মতাদর্শ গড়ে উঠেছে। এই মতাবলম্বীরা শয়তানকে দেবতা হিসেবে উপাসনা করে। তবে এই Satanism বা প্রেতচর্চার বেশিরভাগ ধারণা কিন্তু আসল শয়তান থেকে উদ্ভব হয়নি। ডাইনী আর অপদেবতার রিচুয়াল থেকে শয়তান উপাসনার বিভিন্ন ধারণা তৈরি হয়েছে।

ধর্ম বিশ্বাস হিসেবে স্যাইটানিজমের প্রচলন হয় ১৯৬৬ সালের দিকে। এই সময় গড়ে ওঠে চার্চ অব শয়তান নামক একটা সংস্থা। এরা বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচয় পায় শয়তানের উপাসক হিসেবে। The Satanic Church প্রধানত একটি নাস্তিক সংগঠন এবং তাদের ধর্মগ্রন্থ The Satanic Bible এ রয়েছে ‘There is no God, there is no Devil. A person is insane if he believes in any of them. Satan is more of a mode of behaviour”
(কোনো ঈশ্বর‌ নেই, শয়তান‌ও নেই। যদি কেউ তাদের কাউকে বিশ্বাস করে তাহলে সে উন্মাদ। শয়তান শুধু একটি আচরণের পদ্ধতি।)

তারা বিশ্বাস করে ধর্ম মানুষকে তার নিজস্ব মানববৃত্তি পালন করতে বাঁধা দিচ্ছে এবং তারা এর বিরোধী আর তাই তারা হলো Satanist.

স্যাইটানিসমের মূলমন্ত্র:

“Do what thou wilt shall be the whole of the law” (যা ইচ্ছে তাই করো, এই হলো পূর্ণাঙ্গ বিধান)

কথাটা অ্যালেস্টার ক্রোলির ‘দ্যা বুক অফ দ্যা ল’ থেকে নেয়া। এ ব‌ইকে আধুনিক শয়তান উপাসনার প্রধানতম রচনাগুলোর অন্যতম ধরা হয় আর অ্যালেস্টার ক্রোলিকে মনে করা হয় আধুনিক স্যাইটানিসমের গডফাদার।

অ্যালিস্টার ক্রোলি: কিংবদন্তি ছদ্মবেশী অ্যনলেস্টার ক্রোলি শয়তানকে প্রতীকীভাবে দেখেছিলেন। তার ১৯১৩ এর কবিতা ‘অ্যা হাইমেন টু লুসিফার’ শয়তানকে মহাবিশ্বের আত্মা এবং বিদ্রোহের সরবরাহকারী হিসাবে উদযাপন করেছিল। ক্রোলির ধারণাগুলি শয়তানবাদে প্রভাবশালী ছিল।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে আধুনিক ‘পপ কালচার’ এর উপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডাবল এজেন্টের ভূমিকা পালন করা এই লোকটির প্রচারিত আদর্শের প্রভাব সবচাইতে বেশী। তার প্রচারিত আদর্শের নাম থেলিমা [Thelema]।

মজার ব্যাপার হল, তার মতবাদে শয়তানের উপাসনা করার জন্য আপনার প্রথমে বিশ্বাস করতে হবে যে আপনি নিজে একজন ঈশ্বর। থেলিমার বিশ্বাসে অবাধ ও বিকৃত যৌনাচার, মাদকের ব্যাবহার এবং স্বেচ্ছাচারিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

এর পেছনের কারণ হল, যেহেতু আপনি নিজে ঈশ্বর তাই এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনার নিজের প্রবৃত্তিকে নিজে খুশি করতে হবে। এসবের মাধ্যমে নিজের ভেতরের ঈশ্বরের উপাসনা করতে হবে। আর এভাবেই আপনি আপনার নিজের ভেতরের ঈশ্বরকে জাগ্রত করতে পারবেন। প্রকৃতপক্ষে নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব এবং ক্রমাগত বিকৃত জীবনাচারের মাধ্যমে শয়তানের সান্নিধ্য পাওয়া।

স্যাইটানিজমের শাখা-প্রশাখা: শয়তানিজমের অনেক গুলো শাখা প্রশাখা আছে। যেমন: Theistic Satanism, LaVeyan Satanism, Rebel Satanism এবং সর্বশেষে Modern Satanism। আধুনিক শয়তানবাদি দলগুলো নানা ভাগে বিভক্ত হলেও প্রধান দু’টি ধারা হচ্ছে আস্তিক ও নাস্তিক।

আস্তিক শয়তানবাদি দলগুলো শয়তানকে একজন যাদুবাদী আল্লাহ হিসেবে উপাসনা করে। অন্যদিকে নাস্তিক শয়তানবাদিরা নিজেদের নাস্তিক মনে করে এবং শয়তানকে মনে করে মানুষের খারাপ বৈশিষ্ট্যের একটি হিসেবে।

শয়তানী মন্দির: স্যাইটানিজমের সবচেয়ে সফল কাজগুলোর একটি হল শয়তানি মন্দির। এটি ২০১৩ সালে ফ্লোরিডার গভর্নর রিক স্কটের বিরুদ্ধে একটি ব্যঙ্গাত্মক সমাবেশের মাধ্যমে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। এবং তা দ্রুত আরও সংঘটিত গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

মন্দিরটি আমেরিকায় শুল্কমুক্ত মর্যাদা পেয়ে ২০১৯ সালে মার্কিন সরকার কর্তৃক একটি ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। পর্যায়ক্রমে উত্তর আমেরিকা জুড়ে আরো ২০ টি মন্দির তৈরি করা হয়।

সূত্র: ১–[শয়তানবাদের উদ্ভাবন অস্বজর্ন ডায়রেন্ডাল, জেমস আর লুইস এবং জেস্পার আ পিটারসেন, প্রকাশ করেছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস , ২০১৬]
২–[শয়তানবাদ: একটি সামাজিক ইতিহাস ম্যাসিমো ইন্ট্রোভিগন, প্রকাশ করেছেন ব্রিল ২০১৬]
৩–[জোস সানবার্ন রচিত ‘দ্য নিউ স্যাটানিজম: কম লুসিফার, আরও রাজনীতি’ সময় পত্রিকা ১০ ডিসেম্বর, ২০১৩]
৪–[একটি শয়তানী প্রতিমা আরকানসাস ক্যাপিটল ভবনে যায়’ আভি সেল্ক লিখেছেন, ওয়াশিংটন পোস্ট , আগস্ট ১৭, ২০১৮]

লেখক:— শিক্ষার্থী, মা’হাদুল ফিকরি ওয়াদ্দিরাসাতিল ইসলামিয়া, ঢাকা।

-এটি

সর্বশেষ সব সংবাদ