fbpx
           
       
           
       
১১২ আগে এক রাতেই তৈরি হয়েছিলো ‘বালিয়া জিনের মসজিদ’
জানুয়ারি ০৬, ২০২১ ৭:৫৭ অপরাহ্ণ

মোস্তফা ওয়াদুদ
নিউজরুম এডিটর

বালিয়া জিনের মসজিদ। মসজিদটি এক আমাবশ্যার রাতে জিনেরা তৈরী করে। তাই মসজিদটির নাম করস ‘বালিয়া জিনের মসজিদ’ নামে সুপরিচিত। দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত একটি মসজিদ এটি। কারুকার্য্যময় অলংকরণ, মনোমুগ্ধকর নন্দিত পরিবেশবান্ধব এ মসজিদটি। জিনেরা সারারাত ধরে মসজিদের পুরু দেয়াল গড়তে থাকে। কর্মরত অবস্থায় রাত শেষ হয়। থেমে যায় তাদের কার্যক্রম। প্রভাতের আলো উদ্ভাসিত। চারদিকে ভোরের পাখির গুঞ্জন। তারপর জিনেরা ফিরে আসে আপন ঠিকানায়। সময়ের অভাবে তারা মসজিদের গম্বুজের কাজ তৈরী করতে পারেননি। অসম্পূর্ণ থাকে মসজিদের কাজ।

নির্মাণের ইতিহাস বলে ১৯১০ সালে এই মসজিদটির কাজ শুরু হয়। মসজিদের গায়ে খোদাই করা সন অনুসারে জানা যায় মসজিদটি ১৯১০ সালে তৈরী করা হয়েছে। তাছাড়া মসজিদের নির্মাতা মেহের বকস চৌধুরীর কবরে তার মৃত্যু ১৯১০ খোদাই করে লেখা রয়েছে। জমিদার মেহের বকস চৌধুরীর মৃত্যুর সময় মসজিদ তৈরীর কাজ প্রায় শেষ প্রান্তে।

ঠাকুরগাও-পঞ্চগড় জেলায় যত সব প্রাচীন মসজিদ রয়েছে তার মধ্যে ‘বালিয়া জঈনের মসজিদ’ অন্যতম একটি। ঠাকুরগাও জেলা শহর থেকে উত্তরে ১০ কিলোমিটার দূরে ভুল্লি বাজার। সেখান থেকে তিন-চার কিলোমিটার পূর্বে বালিয়া নামক গ্রামে ‘বালিয়া জিনের মসজিদ’ নামে এই ঐতিহাসিক মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের অপরূপ দৃষ্টিনন্দন করুকার্য, নয়নাভিরাম দৃশ্য, বার বার দু’নয়নে ভেসে উঠে। থমকে যায় পথিকের চলার গতি। কেটে যায় কয়েক মুহূর্ত। প্রতি মুহূর্তে মসজিদের আর্কষণ সুন্দর থেকে আরো সুন্দর হয়ে উঠছে।

নাম করনের গল্প বলতে গিয়ে স্থানীয়রা বলেন, কোন এক আমাবশ্যার রাতে জিনেরা বালিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে এ এলাকাটি তাদের পছন্দ হয়। তারপর, তারা মাটিতে অবতরণ করেন। শুরু করেন মসজিদ নির্মাণের কাজ। মসজিদ তৈরীর পবিত্র কাজে গভীর মনোযোগ দেন। মসজিদের দেয়াল তৈরি করতে পারলেও গম্বুজ তৈরী করতে পারেননি। তার আগেই ভোরের ঝলমল আলো সশরীরে উপস্থিত হয়। তারা মসজিদের কাজ অসমাপ্ত রাখে। গম্বুজহীন অসাধারণ কারুকার্যময় মসজিদটি দাঁড়িয়ে থাকে। জিন সদস্য মসজিদের কিছু অংশের কাজ করেছে বলে এটি জিনের মসজিদ নামে চারিদিকে সু-পরিচিত।

তারা বলেন, এ মসজিদের বয়স প্রায় ১১০ থেকে ১১২ বছর। এ জায়গাটি উঁচু ও পিরামিড বিশিষ্ট আকৃতির ছিল। ছিল বন জঙ্গলে ভরা। এলাকার মানুষের নামাজ আদায়ের নিমিত্তে ছোট একটি মসজিদ তৈরী করা হয়। সে সময় মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় লোকজনের আর্থিকও অর্থনৈতিক সার্বিক সহযোগিতায় মসজিদের অবশিষ্ট কাজ সম্পূর্ণ করেন।

মসজিদ নির্মানের ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, সেই সময়ের জমিদার মেহের বকস চৌধুরী উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বালিয়ায় একটি মসজিদ তৈরির চিন্তা ভাবনা শুরু করেন। তিনি মসজিদ তৈরির নকশা ও সার্বিক বিষয়ে বুদ্ধি পরামর্শ ও কাজ করার জন্য দিল্লি, আগ্রা, মুর্শিদাবাদ থেকে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন স্থপতি আনার ব্যবস্থা গ্রহন করেন। স্থপতি, মোগল স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী ডিজাইনকৃত মসজিদের নকশা প্রণয়ন করেন। মসজিদ তৈরীর বিষয়টি অনেকটা জটিল ও সময় সাপেক্ষের ব্যাপার ছিল।

প্রধান স্থপতির মৃত্যুর পর মসজিদ নির্মানের কাজ থমকে দাঁড়ায়। মসজিদ নির্মাতা মেহের বকস কারিগরের সাহায্য সহযোগিতায় পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু করেন। কিন্তু স্থানীয় কারিগররা মসজিদের গম্বুজ নির্মাণ করতে চরম ভাবে ব্যর্থতার পরিচয় বহন করেন। মসজিদের কাজ নির্মাণাধীন অবস্থায় জমিদার মেহের বকস চৌধুরী পরলোক গমন করেন। সময় আর নদীর স্রোত কারো জন্য থেমে থাকে না। বড় ভাই মেহের বকসের মৃত্যুর পর কয়েক বছর পর ছোট ভাই আবার মসজিদ নির্মানের কাজ শুরু করেন। তবে মসজিদ নির্মানের কাজ অসমাপ্ত রেখে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন।

তারপর মেহের বকসের ছেলে মরহুম বসরত আলী চৌধুরীর কন্যা বিশিষ্ট শিল্পপতি তসরিফা খাতুন ২০১০ সালে ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় বালিয়া মসজিদটির সংস্কার শুরু করেন। সাথে সাথে আর্কিটেক্ট সৈয়দ আবু সুফিয়ান কুসলের নকশায় নতুনভাবে গম্বুজ নির্মাণ করেন।

মসজিদটির আকার ও আয়তন

মসজিদটি সমতল ভুমি থেকে ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচু। প্লট ফরমের ওপর পুর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি, উত্তর-দক্সিনে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি আয়তাকার একটি কমপ্লেক্স রয়েছে। সিড়িসহ মসজিদে প্রবেশ, খোলা চত্বর, মূল ভবন এবং নামাজ ঘর হিসাবে তিন অংশে বিভক্ত।

মুল ভবটি পুর্ব-পশ্চিমে ২৫ ফুট ১১ ইঞ্চি প্রশস্থ। প্লট ফরম হতে মসজিদটির ছাদ ১৭ ফুট উচু। নান্দনিক মসজিদের ছাদে একই সাইজের তিন নকশা খচিত গম্বুজ ও আটটি মিনার মসজিদের অপরুপ শোভা বৃদ্ধি করেছে। আটটি মিনারের মধ্যে চারকোণ বিশিষ্ট চারটি মিনার আকারে বড়। বাকি চারটি মিনার আকারে একটু ছোট।

ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন চুন-সুরকির মটর এবং হাতে পুরানো ইট দিয়ে মসজিদটি নির্মিত। ইটের কোন কাজ না থাকলেও মসজিদের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ইট কেটে কলস, ঘন্টা, ডিশ, বাটি, আমলকি, পদ্ম ইত্যাদি নকশা তৈরী করা হয়েছে।

প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন পেশার মানুষ ঐতিহাসিক ‘বালিয়া জিনের মসজিদ’ দেখার জন্য ছুটে আসে।মসজিদের মনোমুগ্ধকর দৃষ্টি নন্দন পরিবেশ, মাধুর্য্য, অপরুপ সৌন্দর্য্য দেখে চলন্ত পথিক থমকে দাড়ায়। এক নজর দৃষ্টি ফেরায়। মসজিদ মানে আল্লাহর ঘর। আল্লাহর ঘরের সৌন্দর্য্যই আলাদা। আসলে মসজিদ দেখতে অত্যাধুনিক সুন্দর। বিশেষ করে মসজিদের দেয়ালগুলোতে যে আর্কষনীয় নকশা আকাঁ হয়েছে তা চমৎকার ও দৃষ্টি নন্দন।

এমডব্লিউ/

সর্বশেষ সব সংবাদ