196481

হিজরি নববর্ষ হয়ে ওঠুক কল্যাণ ও মুক্তির বছর

মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী।।

বাংলাদেশের আকাশে বৃহস্পতিবার পবিত্র মহররম মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় ২১ আগস্ট শুক্রবার শুরু হলো ১৪৪২ হিজরি নববর্ষ। আগামী ৩০ আগস্ট রোববার পালিত হবে পবিত্র আশুরা। আজ ১৪৪২ হিজরি বর্ষের প্রথম দিন। হিজরি বর্ষের সঙ্গে মুসলমানদের বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির বিষয় জড়িয়ে আছে।

রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হিজরি সনের শুভ সূচনা হয়। আমরা জানি, হজরত ঈসা (আ.)-এর আসমানে গমনের পর থেকে খ্রিস্টাব্দ সাল গণনা করা হয়ে থাকে। আর শেষ নবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দিন অর্থাৎ ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে হিজরি সাল গণনা করা হয়। হিজরি সালের ক্যালেন্ডার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে প্রচলিত ছিল না। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের সাত বছর পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে ১৭ হিজরি থেকে হিজরি সালের প্রচলন করা হয়।

হজরত ওমর (রা.) অর্ধ পৃথিবীর শাসনকর্তা ছিলেন। শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি, শাসনাধীন রাজ্যে চিঠিপত্র প্রেরণসহ নানাক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে তিনি সমসাময়িক সাহাবাদের পরামর্শক্রমে হিজরি সাল প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।

হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম অনেক ফজিলত ও মর্যাদার মাস। চার সম্মানিত মাসের প্রথম মাস মহররম। আবহমান কাল থেকেই মহররম মাস এক বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। শরিয়তের দৃষ্টিতে যেমন এ মাসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণও অনেক দীর্ঘ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, “নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করো না।” (সূরা আত-তাওবা, আয়াত নং-৩৬)।

মহররম মাসে রোযা রাখার প্রতি ইসলামে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “রমজানের পর আল্লাহর মাস মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।” (সহিহ মুসলিম ও জামে তিরমিজি)।

মহররম মাসের দশম তারিখ তথা আশুরার রোজার ফজিলত আরও বেশি। এ সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, “আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমজানন ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।” (সহিহ বুখারি)।

হজরত আলী (রা.) কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমজানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোজা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জনৈক সাহাবি করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “রমজানের পর যদি তুমি রোজা রাখতে চাও, তবে মহররম মাসে রাখো। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।” (জামে তিরমিজি)। অন্য হাদিসে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোজার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।” (সহিহ মুসলিম ও জামে তিরমিজি)

আশুরার রোজা সম্পর্কে এক হাদিসে আছে যে, “তোমরা আশুরার রোজা রাখো এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোজা রাখো।” (মুসনাদে আহমদ)।

মনে রাখা জরুরি যে, হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এ মাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। মুহাররম মাস শুধুমাত্র কারবালার ঘটনা স্মরণ করার মাস নয়। কারবালাকে কেন্দ্র করে এ মাস মর্যাদা নয়, বরং এ মাস গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাস, ত্যাগের মাস, ভালো কাজ করার মাস, খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে গড়ার তোলার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাস।

নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনার পথে হাঁটা। হিজরি নববর্ষ হয়ে ওঠুক মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণ ও মুক্তির বছর। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে হিজরি বর্ষের মর্যাদা ও কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রেখে আমলি জিন্দেগি যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলেজ শিক্ষক

-এএ

ads