বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ।। ১ মাঘ ১৪৩২ ।। ২৬ রজব ১৪৪৭


রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের হুমকি: ক্ষোভে ফুঁসছে ইসলামী দলগুলো

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার

আন্দামান নওশাদ: একটি দেশে অনেক ধর্মের বসবাস থাকতে পারে। দেশের জনগণ একাধিক ধর্মবিশ্বাসী হতে পারে। কিন্তু প্রতি দেশের নির্দিষ্ট একটি ধর্ম থাকে। যে ধর্মবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে টিকে থাকে দেশ। নির্ধারিত হয় সে দেশের জনগণের পরিচয়। আর এটা নির্ধারণ করা হয় দেশের অধিকাংশ জনগণের উপর ভিত্তি করে। যে দেশে যে ধর্মের জনগণ বেশি হয়, সে দেশে সেটাই হয় রাষ্ট্রধর্ম বা রাষ্ট্রের প্রধানধর্ম। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। যা দেশের সংবিধানেও লিপিবদ্ধ করা আছে।

কিন্তু গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশ মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ অশোক কুমার সাহার পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা চালু করার দাবিতে ১০জন রাজনীতিবিদ ও আমলাকে লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছেন।

মূলত এরপর থেকেই দেশের ইসলামী দলগুলো ক্ষোভে ফুঁসে উঠছে। ইসলামী স্কলারগণ সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখার দাবী জানাচ্ছেন। নিচে দেশের ইসলামী স্কলারগণ প্রদত্ত বক্তব্যগুলো পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল হলে কঠোর আন্দোলন: আল্লামা আহমদ শফী

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী বলেছেন, যারা আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল করতে চায় তারা স্বাধীনতা ও জনগণের শক্র। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা চালু করার দাবীতে বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ‘ইসলাম’ থাকবে কী থাকবে না; এই বিষয়ে শুনানির জন্যে হাইকোর্টের গ্রহণ করা রিট মামলা বাতিলের দাবি করেন তিনি।

হেফাজত আমির বলেন, বাংলাদেশের জনগণ নাস্তিক্যবাদি ষড়যন্ত্র কখনোই সফল হতে দিবে না। যারাই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে, তারাই এক সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল নিয়ে চক্রান্ত বন্ধ না হলে প্রয়োজনে জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলনের মাধ্যমে আরও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে: চরমোনাই পীর

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় সারা দেশে ঈমানদার জনতা গর্জে উঠলে সরকারের জন্য সুখকর হবে না।

গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে রেজাউল করীম বলেন, রিটের নামে ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তে মেতে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। সংগঠনটির ইচ্ছানুযায়ী রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে ঈমানদার জনতা রুখে দাঁড়াবে। এ ব্যাপারে পরামর্শ করে খুব তাড়াতাড়ি দেশব্যাপী ইসলামী আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ইস্যুতে ষড়যন্ত্র হলে জনগণ জবাব দেবে: বাবুনগরী

সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা চালু করার দাবিতে মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অশোক কুমার সাহার পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষের লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের মতো একটি মীমাংসিত ইস্যুতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে তথাকথিত ‘মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদ’ এর সভাপতি অশোক কুমার সাহা এই লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন বলে আমরা মনে করি। রাষ্ট্রধর্ম ইস্যুটি ২০১৬ সালে আদালত মীমাংসা করে দিয়েছেন। তাই এই বিষয়ে নতুন করে বিতর্ক তোলার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হেফাজতের এ নেতা বলেন, যারা এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি নিয়ে তামাশা করতে চায়, তাদের কঠোর হস্তে দমন করুন। মীমাংসিত ইস্যুতে নতুন করে বিতর্ক তুলে কারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়, তা খুঁজে বের করুন। অন্যথায় দেশের তৌহিদি জনতা পূর্বের ন্যায় মাঠে নেমে আসবে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিলের ষড়যন্ত্র মেনে নেয়া হবে না: আল্লামা নূর হোছাইন কাসেমী

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ-এর মহাসচিব আল্লামা নূর হোছাইন কাসেমী বলেছেন কেবল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নয়, বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র করতে হবে, তাতেই সংখ্যালঘুদেরও পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা থাকবে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়ার চক্রান্তে যারা লিপ্ত রয়েছে তারা এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী। তারা দেশের সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। সরকার যদি চক্রান্তকারীদের সমর্থন করে তাহলে তার পরিনাম শুভ হবেনা।

আল্লামা কাসেমী আরও বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে দেশ স্বাধীন করা হয়েছে অর্থনৈতিক শোষণ-বৈষম্য ও জুলম-নির্যাতন থেকে মুক্তিলাভের জন্য। ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। সুতরাং ইসলামবিরোধী যেকোন চক্রান্ত রুখে দাঁড়াতে জনগণ পিছপা হবে না।

কতিপয় উগ্রবাদী কুচক্রিমহল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে: মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীরে শরীয়ত মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী বলেন, সংবিধানকে পরিপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষকরণের নামে আবারও কতিপয় উগ্রবাদী ও নাস্তিক্যবাদী কুচক্রিমহল বাংলাদেশ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। এ উগ্রসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী দেশের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করতে চায়। একটি সাংবিধানিক ও মীমাংসিত বিষয় নিয়ে যারা বারবার উস্কানি দিচ্ছে তাদেরকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। গুটি কয়েক উগ্রহিন্দু ও নাস্তিক্যবাদীর প্রস্তাবে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাদ দেয়া হলে এদেশের ৯২ ভাগ মুসলিম জনতা গর্জে উঠবে এবং আন্দোলনের দাবানল সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ছিলো, আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে: মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক

খেলাফত মজলিসের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক এক বিবৃতিতে বলেছেন, এ দেশের তাওহিদী জনতা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে যেকোন ষড়যন্ত্র সহ্য করবে না। এ ধরণের যে কোন ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করা হবে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ছিলো, আছে এবং ভবিষ্যতে থাকবে ইনশাআল্লাহ।

কেবল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়াই যুক্তিযুক্ত: আল্লামা আব্দুর রব ইউসূফী

আল্লামা আব্দুর রব ইউসূফী বলেন, ৯২ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার কোনরূপ চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না। বৃটিশ ভারত থেকে এ অঞ্চল স্বাধীন হয়েছিল মুসলিম পরিচিতি ও ইসলামী চেতনাবোধকে সমুন্নত রাখার মহান লক্ষকে সামনে রেখে। সে হিসাবে এদেশে কেবল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

মুসলমান বুকের তাজা রক্ত দিবে তবু সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল হতে দেবে না: অধ্যক্ষ ইউনুছ আহমাদ

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বিবৃতিতে বলেন, মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশকে স্পেনের মত বিধর্মী রাষ্ট্রে পরিণত করতে একটি মহল দীর্ঘদিন যাবৎ ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। যারা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধান থেকে বাদ দিতে চায়, তারাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, বাংলাদেশের দুশমন, স্বাধীনতা বিরোধী, ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমন। এদেশের মুসলমানরা প্রয়োজনে বুকের তাজা রক্ত দিবে তবু সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল হতে দেবে না।

সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ছিলো, আছে ও থাকবে: আল্লামা নুরুল ইসলাম

খিলগাঁও মাখজানুল উলুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল আল্লামা নুরুল ইসলাম বলেন, ৯৫% মুসলমানের দেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে নতুন করে কোন ষড়যন্ত্র চলবে না। বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্র। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে পরিচিত। বাংলাদেশে মুসলমানদের মসজিদ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে যার যার ধর্মীয় উপসনাদি সকলে নির্বিঘ্নে পালন করে থাকে। এদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ছিলো। ইসলাম আছে। ইসলাম থাকবে। এই নিয়ে কেউ কোন ধরনের ষড়যন্ত্র করলে তৌহিদী জনতা রুখে দেবে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেছেন, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আছে ও থাকবে। যারা এর বিরুদ্ধে কথা বলে ও ষড়যন্ত্র করে দেশের মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থাকার বিষয়টি ২০১৬ সালে আদালত রায় দেয়ার পরে একটি মীমাংসিত বিষয় নিয়ে আবারো লিগ্যাল নোটিশ করাতেই ফুঁসে উঠছেন তারা।

অশোক কুমার ঘোষ যে ১০ জনকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে তারা হলেন-আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, বিএনপির মহাসচিব, জাতীয় পার্টির মহাসচিব, গণফোরামের ড. কামাল হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিব।

নোটিশ প্রেরণকারী আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ বলেন, ‘লিগ্যাল নোটিশে নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা শুরু করার আবেদন জানানো হয়। কিন্তু সেটা করা হয়নি। আগামী সপ্তাহে আমরা রিট আবেদন দায়ের করব।’

এমডব্লিউ/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ