fbpx
           
       
           
       
শিক্ষাদর্শনের কথা বলছি, রাষ্ট্র কি শুনবে?
জুন ১২, ২০১৬ ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ

sikkha copy

মুসা আল হাফিজ, অতিথি লেখক : আমরা এখন চতুর্দশ শতাব্দীতে। দৃষ্টি আমাদের ইউরোপে। জ্ঞানের ইতিহাসে এখানে একটি রেনেসাঁর শব্দ শোনা যাচ্ছে। মানুষ এখন জগত আবিষ্কারের লক্ষ্যে গা-ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠছে। অন্ধ কুসংস্কারের দ্বারা মানুষ আর শাসিত হতে চায় না। ফ্লোরার জোয়াকিম ঘোষণা করেছেন— গসপেল অব দ্য ফাদার অতীত হয়ে গেছে, গসপেল অব দ্য সান অতীত হতে চলেছে। গসপেল অব দ্য স্পিরিট রয়েছে সামনে। এই গসপেল অব দ্য স্পিরিট মানুষকে জাগিয়ে তুলল অসম্ভবকে সম্ভব করার নেশায়।

এত দিন যে সমুদ্র মৃত্যুর গর্জন নিয়ে মানুষের অন্তরাত্মায় হানা দিত, সেই সমুদ্রের বিশাল বক্ষ বিদীর্ণ করে জগতকে জানার নেশায় ১৪৯২ সালে কলম্বাস আবিষ্কার করলেন আমেরিকা। ১৪৯৭ সালে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে পর্তুগিজরা আবিষ্কার করল ভারতে আসার পথ। এ দুটো আবিষ্কারের পর নতুন বস্তুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার হিড়িক পড়ে গেল ইউরোপে। সে ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মানুষ পা রাখল চাঁদের বক্ষে। নীল আর্মস্ট্রং সেই গর্বিত মানবসন্তান, যিনি চাঁদের বুকে সর্ব প্রথম পা রেখেছিলেন। চাঁদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, এ ঘটনা একজন মানুষের জন্য ক্ষুদ্র এক পদক্ষেপ, কিন্তু মানবতার জন্য তা বিরাট এক লম্ফ। নীল আর্মস্ট্রং ও তার সহযাত্রী এডউইন অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স এই অভিযানে রকেট অ্যাপেলো ও চন্দ্রযান ইগলে চড়ে চাঁদে অবতরণ করেন। তাদের অভিযান পুরোটাই গসপেল অব দ্য স্পিরিটের প্রদর্শনী। তাদের বিজয় প্রকৃতির ওপর মানুষের এক মহাবিজয়, গসপেল অব দ্য স্পিরিটের বিজয়।

কিন্তু যে স্পিরিটের গুণে মানুষ চাঁদের ওপর পা রাখতে পারল, সেই স্পিরিট জিনিসটি কী? সেটা তার উদ্ভাবন শক্তি? আত্মার ক্ষমতা? মানুষের মৌলিক শক্তি তার দেহে, না আত্মায়? আত্মা আসলে কী? কী তার স্বরূপ ও পরিচয়?

এসব প্রশ্নের কোনো সমাধানমূলক জবাব এখন পর্যন্ত দার্শনিকদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তাহলে ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে? মানুষ গহীন অরণ্যকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। সমুদ্রের বিশালতাকে অতিক্রম করেছে, লাফ দিয়ে উঠে গেছে সোজা চাঁদের বুকে; সে জগত সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে, কিন্তু নিজেকে জানে না, নিজের আত্মাকে চিনে না। মানুষ বস্তুকে জানছে, কিন্তু আত্মাকে চিনতে পারছে না। এমনকি নিজের সত্তাকেও বুঝতে পারছে না। নিজের প্রকৃত স্পিরিটকে বুঝতে পারছেন না বলেই নিজের জীবনকে খাওয়া-দাওয়া আর কামনা-বাসনার দাসত্বে নিয়োজিত রাখছে। প্রকৃতির চাহিদাকে সে জানছে তার সত্য হিসেবে এবং যে কোনো মূল্যে সে একে পূরণ করতে চায়। ফলে পাশবিক আকাঙ্ক্ষাগুলো তার বোধে রাজত্ব করতে পারছে। সে শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছে কীভাবে দ্রুততমভাবে নিজের বাসনাসমূহ পূরণ করা যায়, কীভাবে অন্য সবাইকে অতিক্রম করে উর্ধ্বাসন অধিকার করা যায় এবং প্রয়োজনে অন্য সবাইকে বঞ্চিত করে কীভাবে জগতের সবচেয়ে সেরা জিনিসটি ভোগ করা যায়, এ লক্ষ্যে। এ ক্ষেত্রে সে জ্ঞান ও সাধনা প্রয়োগ করে এবং উন্নতি অর্জন করে। সে এই উন্নতিকে মনে করে সফলতা। অথচ এ পথে সে যতই অগ্রগতি অর্জন করুক, মনুষ্যত্বের দিক দিয়ে তা মোটেও অগ্রগতি বলে চিহ্নিত হতে পারে না।

রেনেসাঁর মাধ্যমে ইউরোপে যে গসপেল অব দ্য স্পিরিটের জয় হয়েছে, তাকে শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে নিয়েছিল পরবর্তী পৃথিবী। কিন্তু দেখা গেল একান্ত বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সেই স্পিরিট মানুষের মানবীয় গুণাবলী ও মহিমাকে বিকাশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেই স্পিরিট মানুষকে দিয়েছে কল্পনাতীত গতির বেগ, কিন্তু মানবিক আবেগ কেড়ে নিয়েছে হৃদয় থেকে। ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞান মানুষের কল্যাণের বাহন হওয়া সত্ত্বেও তার দ্বারা সরবরাহ করা হচ্ছে অকল্যাণের বিষ। আবিষ্কার করা হচ্ছে দুনিয়া ধ্বংসের মারণাস্ত্র। উচ্চতর শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও মানুষ বন্দি হয়ে থাকছে পাশবিকতার কারাগারে। মানুষের দুষ্কৃতি সমাজে শান্তিকে শুধু দুর্লভ করেনি, বরং জলবায়ুকে পর্যন্ত বিপন্ন করে তুলেছে। সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষটিও ধ্বংসাত্মক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দারিদ্র্য, শিল্প ইত্যাদি নিয়েও তারা খুলে বসেছে প্রতারণা ও পাপাচারের এজেন্সি, যা মানবতার জন্য হয়ে উঠেছে অসহনীয়।

অতএব, আজকের কাজ হলো গসপেল অব দ্য স্পিরিটকে নিরঙ্কুশভাবে ব্যক্তি মানুষের কল্যাণ ও বিশ্বসমষ্টির কল্যাণে নিয়োজিত করা। কিন্তু সেটা কখনও সম্ভব নয় বস্তুবাদী শিক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে। কেননা, মানুষ কেন মহান? কেন সে পৃথিবীতে আগমন করেছে? তার জীবনযাপনের উদ্দেশ্য কী? জীবনের কর্মকাণ্ডকে লক্ষ্যবিহীন না এগুলোরও কোনো পরিণতি আছে? তার জীবনের প্রকৃত গন্তব্য কোথায়? তার আত্মার তাৎপর্য কী? নিজের সঙ্গে সে কি আচরণ করবে? অপরাপর মানুষের সঙ্গে সে কী আচরণ করবে? বিশ্বজগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে? সেই সম্পর্কের স্বরূপ, প্রকৃতি ও দর্শন কী হবে? বিশ্বজগতের নিয়ন্তার সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে? সে কীভাবে তার প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর শান্তি ও শৃঙ্খলার পক্ষে দায়িত্ব পালন করবে? এসব প্রশ্নের সত্যিকার জবাব না জানা পর্যন্ত একজন মানুষের মনুষ্যত্ব মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতেই পারে না। যে শিক্ষা এই জবাব জানতে দেয় না, সেই শিক্ষায় স্পিরিট থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু সেই স্পিরিট মানবিকতার সৌধ নির্মাণের চেয়ে সমাধি রচনাতেই পারঙ্গম প্রমাণিত হয়।
আজকের প্রজন্মকে যদি মানবিক পৃথিবীর কারিগর রূপে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে তাকে মৌলিকভাবে নিজের সত্তার সঙ্গে পরিচিত করতে হবে, জীবন-জিজ্ঞাসার সদুত্তরগুলো তাকে দুয়ে দুয়ে চারের মতো বুঝিয়ে দিতে হবে। এরপর তার মনুষ্যত্বের মেরুদণ্ড সোজা হয়ে দাঁড়ালেই শিক্ষা তার জন্য হবে যথার্থ গসপেল অব দ্য স্পিরিট। যে স্পিরিট নিয়ে সে চন্দ্রজয় করেই ক্ষান্ত হবে না, বরং আত্মজয়ের সাধনায়ও জয়ী হবে। বিশ্বজগতকে যেভাবে জানবে, তেমনি জানবে, নিজের কর্তব্য ও গন্তব্যকে। সে জানবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি চাহনি ও উপলব্ধি রয়েছে বিশ্বনিয়ন্তার পর্যবেক্ষণে। সে তাঁরই পবিত্রতা, মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে পৃথিবীতে জন্মেছে, অতএব কর্মে কীভাবে নেমে যেতে পারে পশুর পর্যায়ে? শিক্ষার ইসলামী দর্শন মানুষকে তার জীবন-জিজ্ঞাসার সদুত্তর দেয়। মানবীয় ভিত্তির ওপর দাঁড় করায় শিক্ষা ও কর্মের বুনিয়াদ। এ ভিত্তি এতটাই মহিমান্বিত যে, তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের অনন্যতায় অভিষিক্ত করার জন্য। ইসলামী শিক্ষা দর্শন মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনাকে অফুরন্ত উচ্চতায় সমুন্নত করতে চায়, যে উচ্চতায় সমাসীন প্রত্যেকেই জীবন ও জগতের পক্ষে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে জীবন্ত রহমত।
শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নে দর্শনের এ পাঠকে যারা অবজ্ঞা করবে, তারা তৈরী করবে বিকলাঙ্গ এক ব্যবস্থা, যেখান থেকে উৎপাদিত হবে ডিগ্রিধারী রোবট, হৃদয়ধারী মানুষ নয়! জাতি কেবল পাবে অন্ধপথপ্রদর্শক, বিকারগ্রস্থ ব্যবস্থাপত্র এবং অব্যাহত দেওলিয়াত্ব । যারা ঝড়ের চাষ করে, তাদের ঘরে তুলার ফসল হচ্ছে বজ্রপাত । এ সেই ফসল, যা ঘর পুড়িয়ে দেবেই!

মুসা আল হাফিজ : কবি ও কলামিস্টি

আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম /আরআর

সর্বশেষ সব সংবাদ