fbpx
           
       
           
       
ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আদ্যোপান্ত
জুন ০৬, ২০১৬ ৪:৪৭ অপরাহ্ণ

islami bank_ourislam24

ফারুক ফেরদৌস : ব্যাংক এমন একটি ব্যবস্থা যার সাহায্যে মানুষ নিজের সঞ্চয় জমা করে ও পূঁজি গড়ে তোলে। ব্যাংক মূলত পূঁজির ভাণ্ডার। ব্যাংক এই পূঁজি জমা করে রাখে না। উদ্যোক্তাদের ধার দেয়। বিনিয়োগ করে বিদ্যমান পূঁজি বাড়িয়ে তুলতে থাকে।

আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অঙ্গ ব্যাংক। অন্তর্দেশীয় লেনদেন এখন ব্যাংকের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। মনে করা হয় সবচে’ প্রাচীনতম আধুনিক ব্যাংক ১৪৭২ সালে  ইতালির সিয়েনায় প্রতিষ্ঠিত মন্টে ডেই পাসচি ডি সিয়েনা । কিন্তু মানুষ ব্যাংকিং কার্যক্রমের সাথে পরিচিত হয়েছে আরও আগে। অনেকেই মনে করেন খৃস্টপূর্ব ৩৪ শতকের দিকে সুমেরীয় ও ব্যাবিলনিয়ানরাও ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে পরিচিত ছিলো। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, গ্রিস ও রোমেও এক ধরনের ব্যাংক চালু ছিল। মৌলিকভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। প্রতিষ্ঠান আকারে আধুনিক ব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠান প্রথম ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর অনেক আগে থেকে ব্যাংকিং এর কার্যক্রম অর্থাৎ ঋণ দেয়া, ধার নেয়া, ঋণ হস্তান্তর, নিশ্চয়তা প্রদান, নিরাপত্তা দান ইত্যাদি কর্মকাণ্ড মুসলিম বিশ্বেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিলো।

সুরা হাদিদের ১১ নং আয়াতে ইসলামি ব্যাংকিং এর অন্যতম কাজ করজে হাসানায় উৎসাহ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘কে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, এরপর তিনি তার জন্যে তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্যে রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।’

৯১৩ খৃস্টাব্দের দিকে মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো দিওয়ান আল-জাহবিদাহ। প্রধান প্রধান শহরগুলোতে এর শাখা ছিল। কোনো রকম সুদী লেনদেন ছাড়া আধুনিক ব্যাংকিং এর প্রায় সব কার্যক্রম এখানে চলতো। ৯৮০ এর দিকে আব্বাসীয় খলিফা আল-মুকতাদিরের সময় আল-জাবদাহ’র ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।  তিনি সাক বা চেক ও সাফতাজাহ বা বিল অব এক্সচেঞ্জ এর মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে তহবিল পাঠানোর কাজ করতেন। দিওয়ান আল জাবদাহ’র কার্যক্রমের সাথে আধুনিক ব্যাংকিং এর যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে। আধুনিক ব্যাংকের চেক শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ ‘দিওয়ান আল জাবদাহ’র আরবি পরিভাষা ‘সাক’ থেকে। খেলাফতের বিলুপ্তির সাথে সাথে মুসলিম বিশ্বের এই ব্যবস্থাগুলোও বিলুপ্ত হয়েছে।

আধুনিক ইসলামি ব্যাংকের কথা আলোচনা হওয়া শুরু হয় ষাটের দশকের গোঁড়ার দিকে। তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় মুসলমানদের হাতে তখন প্রচুর নগদ অর্থ। মুসলমানরা তাদের সম্পদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামের আলোকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবতে  শুরু করে।

আধুনিক ইসলামি ব্যাংকের কথা আলোচনা হওয়া শুরু হয় ষাটের দশকের গোঁড়ার দিকে। তেলের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় মুসলমানদের হাতে তখন প্রচুর নগদ অর্থ। মুসলমানরা তাদের সম্পদ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামের আলোকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের কথা ভাবতে  শুরু করে। এছাড়া উপনিবেশবাদ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর মুসলিম দেশগুলো ইসলামের আলোকে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের চিন্তা শুরু করে। ষাটের দশকে মিসরের মিটগামারে প্রথম সুদমুক্ত ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৩ সনের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের রাজধানী জেদ্দায় মুসলিম দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীদের একটি  সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেই সম্মেলনে মুসলিম দেশগুলোর অর্থনীতি ইসলামিকরণের কথা আলোচনা করা হয়। এই আলোচনার ফলশ্রুতিতে  বেশ কয়েকটি দেশে ইসলামি ব্যাংক গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চিন্তা ভাবনা শুরু হয়  মিসরের মিটগামারে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই। ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক বা আইডিবির চার্টার স্বাক্ষর করে। ১৯৭৬ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীমের নেতৃত্বে ঢাকায় ইসলামি অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ মহসিন দুবাই ইসলামি ব্যাংকের মত বাংলাদেশেও একটি ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য পররাষ্ট্র সচিবের কাছে লিখিত একটি চিঠিতে সুপারিশ করেন। এরপর ডিসেম্বর মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং উইং বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিমত জানতে চায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন গবেষণা পরিচালক এ এস এম ফখরুল আহসান ১৯৮০ সালে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য দুবাই ইসলামি ব্যাংক, মিসরের ফয়সাল ইসলামি ব্যাংক, নাসের সোশ্যাল ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি ব্যাংক সমিতির কায়রো অফিস পরিদর্শন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন। ১৯৮০ সালের ১৫-১৭ ডিসেম্বর ইসলামি অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরোর উদ্যোগে ঢাকায় ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালের মার্চে ওআইসিভূক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের সম্মেলন সুদানের খার্তুমে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে পেশকৃত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ১৯৮১ সালে এপ্রিল মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লেখা এক পত্রে পাকিস্তানের অনুরূপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাখাগুলোতেও পরীক্ষামূলকভাবে পৃথক ইসলামি ব্যাংকিং কাউন্টার চালু করে এ জন্য পৃথক লেজার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ওপর এক মাস স্থায়ী সার্বক্ষণিক আবাসিক প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এ কোর্সে বাংলাদেশ ব্যাংক, সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিআইবিএম ও প্রস্তাবিত ঢাকা আন্তর্জাতিক ইসলামি ব্যাংক লিমিটেড এর ৩৭ কর্মকর্তা অংশ নেন।

এ এস এম ফখরুল আহসান ১৯৮০ সালে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য দুবাই ইসলামি ব্যাংক, মিসরের ফয়সাল ইসলামি ব্যাংক, নাসের সোশ্যাল ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি ব্যাংক সমিতির কায়রো অফিস পরিদর্শন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন।

১৯৮২ সালে নভেম্বর মাসে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময় তারা বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে যৌথ উদ্যোগে একটি ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় আইডিবির অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার ব্যাপারে ‘ইসলামী অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরো’ (আইইআরবি) এবং বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক সমিতি (বিবা) অগ্রণী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের কাজ শুরু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম ‘ইসলামী ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩০ মার্চ ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ’ লিমিটেড করা হয়। বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম কোনো ইসলামি ব্যাংক যাত্রা শুরু করে।

আওয়ার ইসলাম ২৪ ডটকম / আরআর