194472

দায়িত্ব পালনে ইসলামের বিধান!

মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী।।

পৃথিবীতে চলতে গেলে মানুষের প্রয়োজন অনেক। তন্মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন সংঘবদ্ধতা। এতে আল্লাহ বরকত রেখেছেন। আল্লাহর সাহায্যও থাকে এর মধে। নবীজি সা. বলেছেন, ‘সংঘবদ্ধ লোকের ওপর আল্লাহর হাত রয়েছে।’ এজন্য সংঘবদ্ধ জীবন-যাপন না করে আলাদা হয়ে চলা পছন্দনীয় নয়।

এমন অবস্থায় শেষ বিদায়কে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বলে ব্যক্ত করা হয়। সংঘবদ্ধতা হবে তো এর মধ্যে একজন আমির বা দায়িত্বশীল অবশ্যই থাকবেন, যিনি এই সংঘবদ্ধ লোকদের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেবেন। সাধারণ মানুষ তার নির্দেশনা অনুযায়ী চলবে। আখেরাতের পুজি সঞ্চয় করে কামিয়াব হবে। নেতৃত্বদান ও দায়িত্বশীলতার অনুভূতি পেশ করে রাসূল সা. বলেন, ‘তিনজন লোক সফরে থাকলে, তাদের একজনকে আমির বানানো উচিত।’

জাতির সরদার তাদের জিম্মাদার হন। জাতির কল্যাণকামনা, সব রকমের প্রয়োজনের প্রতি সুদৃষ্টি রাখা এবং এর উৎকর্ষতার ফিকির করা শুধুমাত্র তার দায়িত্বই নয়; বরং ফরজে আইন বা অবশ্য কর্তব্য। এর অনুভূতি একান্ত জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।’ (সূরা মুমিনুন, আয়াত : ৮)

আমানত আল্লাহর হোক আর মানুষের হোক, অঙ্গীকারও আল্লাহর হোক বা মানুষের হোক এর খেয়াল রাখা মুমিনের গুণ। দায়িত্ব গ্রহণ করাও আল্লাহ ও মানুষের সাথে অঙ্গীকার করার মতো। নবীজি সা. বলেন, ‘যে আমানত রক্ষা করে না তার ঈমানের দাবি যথাযথ নয় এবং যে অঙ্গীকার পূরণ করে না তার দ্বীন যথাযথ নয়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৩১৯৯) হজরত আলী রা. বলেন, কোনো ব্যক্তির কদর ও মূল্যায়ন অনুমিত হয় তার দায়িত্বশীলতার অনুভূতির মধ্য দিয়ে। প্রজ্ঞাপূর্ণ এই উক্তিটি নিয়ে যতই চিন্তা-ফিকির করা হবে সেটা কম হবে।

দায়িত্বশীলদের ব্যাপারে হুশিয়ারি : আমরা কালেমা পড়ে এই অঙ্গীকার করে নিয়েছি যে, আমরা নবীওয়ালা কাজ করব। আমাদের মধ্যে যদি এর অনুভূতিই না থাকে তাহলে এটা অনেক বড় ক্ষতির কারণ। নবীজি সা. বলেন, ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, শুনো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস : ২৫৫৪)

হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহ জাতির দায়িত্ব অর্পণ করেন; কিন্তু সে তাদের কল্যাণকর নিরাপত্তা বিধান করল না, সে বেহেশতের গন্ধও পাবে না।’ (মিশকাত : ৩৫১৮)। রাসূল সা.)বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি মুসলিম জনগনের শাসক নিযুক্ত হয়, অতঃপর সে প্রতারক বা আত্মসাৎকারীরূপে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস : ৭২৩৯)

দায়িত্ব চেয়ে নেওয়া যাবে না: আব্দুর রহমান ইবনে সামুরা রা. বলেন, মহানবী সা. আমাকে বললেন, হে আব্দুর রহমান! দায়িত্ব চেয়ো না। কেননা যদি তোমাকে তোমার চাওয়ার কারণে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তোমাকে নিঃসঙ্গ ছেড়ে দেওয়া হবে। (দায়িত্ব পালনে তুমি আল্লাহর সাহায্য হতে বঞ্চিত হবে।) পক্ষান্তরে যদি তা না চাইতেই তোমাকে দেওয়া হয় তুমি সে বিষয়ে (আল্লাহর পক্ষ হতে) সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।

আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, দু’ ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর কাছে দায়িত্ব চাইলে তিনি তাদেরকে বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা এমন কাউকে কর্মকর্তা নিযুক্ত করব না, যে দায়িত্ব চায় এবং এমন ব্যক্তিকেও নয়, যে দায়িত্ব লাভের আকাঙ্খা করে।’

পদ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কর্তব্য : যে কমিশন বা পরিষদ যাদের হাতে নিয়োগ-বরখাস্তের অধিকার রয়েছে, সে সমস্ত কর্মকর্তা পরিষদ হলেন সে পদের আমানতদার। উপযুক্ত লোকদের কাছে এই আমানত পৌঁছাতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্র আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও।’ (সূরা নিসা, আয়াত : ৫৮) পদ-দায়িত্ব একটি আমানত। যার দায়িত্বে এই আমানত থাকবে, সে আমানত প্রাপককে পৌঁছে দেওয়া তার একান্ত কর্তব্য। তেমনিভাবে যার কাছে আমানত পৌঁছানো হবে এমন ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও বিশ্বস্ততার বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী, বিশ্বস্ত।’ (সূরা কাসাস, আয়াত : ২৬) আয়াতটিতে শক্তিশালী বলে কর্মদক্ষতার বিষয়টি বুঝানো হয়েছে।

বিচার করতে যেয়ে যেন সুবিচার করা হয়, অন্যায়ের পক্ষপাত না নেওয়া হয় এ মর্মে আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। সুবিচার করবে, এটা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সূরা মায়িদা, আয়াত : ৮)

অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগদাতাদের জন্য রয়েছে কঠিন হুশিয়ারি। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমকে সম্প্রদায়ের কোনো কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত করল এ অবস্থায় যে, সে জানে, মুসলিমদের মধ্যে এ ব্যক্তির চেয়ে অধিক ভালো কেউ আছে, যে কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাহ সম্পর্কে আরো বেশি জানে, তাহলে এই নির্বাচক ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূল এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে খেয়ানত করল।’ হাদিস শরিফে রয়েছে, যখন কাজের দায়িত্ব অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে সোপর্দ করা হয় তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করো।’

নীতিবান বিচারকের ফজিলত : রাসূল (সা.) বলেন, ‘ন্যায়-নীতিবান বিচারক কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তার ডান পাশে দ্যূতিময় মিম্বারের ওপর অবস্থান করবে। অবশ্য আল্লাহতায়ালার উভয় পাশই ডান। তারাই সেসব বিচারক বা শাসক, যারা নিজেদের বিচার-বিধানে, নিজেদের পরিবার-পরিজনে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৮২৫)

পদ-ক্ষমতা ক্ষনস্থায়ী : পদ ক্ষমতা দায়িত্ব আজ আছে তো কাল নাও থাকতে পারে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই এবং কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট। হে মানুষ! তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের অপসারিত করতে এবং অপরকে আনতে পারেন, আল্লাহ এটা করতে পুরোপুরি সক্ষম।’ (সূরা নিসা, আয়াত :১৩২-১৩৩)

একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির দায়িত্বের অনুভূতি যখন খতম হয়ে যায় তখন এর প্রতিক্রিয়া বহুদূর পর্যন্ত গড়ায়। অধীনস্ত লোকগণ এতে মারাত্মক প্রভাবিত হয়। কর্মক্ষমতা কমে যায়। এদিক লক্ষ্য করে আমাদের হিসেব করতে হবে যে, আমাদের ত্যাগ-কোরবানি আল্লাহর জন্য না অন্য কিছুর জন্য।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ

ad