ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নবনিযুক্ত মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমে তাঁর নেতৃত্বের ভাবনা, সাংগঠনিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংগঠনের কৌশল, গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আওয়ার ইসলাম-এর সম্পাদক মুফতি হুমায়ুন আইয়ুব।
আওয়ার ইসলাম: আপনি ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিবিদ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে সম্প্রতি পদায়ন হয়েছেন। দলটির মহাসচিব হয়েছেন। প্রথমেই আপনার কাছে আমরা জানতে চাইব, দলের মহাসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পর আপনার অনুভূতি কী?
গাজী আতাউর রহমান: আসলে আমি এই আন্দোলনের বিভিন্ন দায়িত্বে অতীতে ছিলাম। বিশেষ করে জাতীয় রাজনীতিতে আমার প্রায় পঁচিশ বছর। ২০০১ সালে আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম। এর আগে ছাত্র সংগঠনে ছিলাম প্রায় চৌদ্দ-পনেরো বছর। তো এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার পরে আমার কাছে মনে হলো, আগে যেমন মুক্ত ও স্বাধীনভাবে আমি কাজ করতে পারতাম, কথা বলতে পারতাম, এখন আমার মধ্যে যেন কিছুটা সীমাবদ্ধতা চলে এসেছে। আমার সেই স্বাধীনতার মধ্যে মনে হয় কিছুটা ছেদ পড়েছে। আমি এটাই দুই দিনের মধ্যেই উপলব্ধি করতে পেরেছি।
আওয়ার ইসলাম: কেন মনে হলো এটা?
গাজী আতাউর রহমান: আমার কাজ, আমার কথা—আগে যেমন আমি মুক্ত ও স্বাধীনভাবে এসব করতে পারতাম, এখন আমার কাছে বা নিজে থেকেই আমি অনেকটা সেল্ফ কন্ট্রোল অবস্থায় চলে গেছি বলা চলে। এটা আমার অনুভূতি। এটা কেন? বিষয় হলো, এমনিতেই তো আমাদের সর্বোচ্চ নেতা আছেন। তারপরও আমাদের নির্বাহী দায়িত্বে এখানে আমার ওপর একজন ছিলেন। যেকোনো সময় মনে করতাম, ফিল্টারিংয়ের জন্য একজন আছেন। আমাদের ভুল-ত্রুটি হলেও সেখানে একজন তো আমার ওপর জিম্মাদার আছেন। কিন্তু এখন সেটা আমাকে ভাবতে হচ্ছে। এখন তো সেই ফিল্টারিংয়ের জায়গাটা সংকুচিত। এটা আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, আমার জন্য কিছুটা চাপ।
আওয়ার ইসলাম: দীর্ঘ আঠারো বছর পর এই পদে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনটা কি দীর্ঘ আঠারো বছর একটি জায়গায় আটকে ছিল? এই পরিবর্তনটা কি আরও আগে হওয়ার দরকার ছিল? নাকি শক্তির সঙ্গেই সংগঠন চলছিল? এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
গাজী আতাউর রহমান: না, এটা তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে। এটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। তবে আমরা যদি ইসলামী সংগঠনের চরিত্র বিবেচনা করি, তাহলে ইসলামি সংগঠনের চেতনা হলো—যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষের দায়িত্ব পালনের জন্য মৌলিক কোনো সমস্যা না হয়, ততক্ষণ তিনি দায়িত্ব পালন করে যেতে পারেন। অতএব, এই আঠারো বছর অনেকের কাছে দীর্ঘ সময়। আমার তো মনে হয়, তিনি আরও দশ বছর দায়িত্ব পালন করলেও এখানে কোনো সমস্যা হতো না।
তবে এখানে আমাদের বিভিন্ন ফোরাম আছে, আমাদের প্রেসিডিয়াম আছে, শূরা আছে এবং মুহতারাম আমির আছেন। তবে আমিরও একটি আলাদা পরিষদ। আমাদের সংগঠনের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো, আমাদের কেন্দ্রীয় কাঠামোতে আমির একজন স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকেন। তাঁর আলাদা ক্ষমতা রয়েছে। আমিরই একটি আলাদা পরিষদ। এজন্যই দেখেছেন যে, আমাদের কমিটি ভেঙে গেছে, কিন্তু কমিটির মেয়াদ দুই বছর, আর আমিরের মেয়াদ পাঁচ বছর। যাই হোক, আমির আছেন। সব বিবেচনা করে মনে হয়েছে যে, সংগঠনের একটু পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তাই হয়েছে।
আওয়ার ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি প্রশ্ন এসেছে যে, গুরুত্বপূর্ণ মহাসচিব পদেই পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আমির পদে কেন পরিবর্তন হয়নি?—এ ব্যাপারে আপনার ব্যাখ্যা কী?
গাজী আতাউর রহমান: আমি কিন্তু প্রথমেই ইসলামের চরিত্রটা কী তা বলেছি, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষের মৌলিক কোনো সমস্যা না হবে, মানে শরয়ি কোনো ব্যত্যয় না ঘটবে, বা তার বিচার-বুদ্ধির কোনো ব্যত্যয় না ঘটবে, শারীরিক সক্ষমতা যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের নেতৃত্বের পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
তবে হ্যাঁ, এখানে আরেকটা বিষয় তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যাদের নেতৃত্ব দেবেন, তারা চান কি না। এখন আমাদের সংগঠনের আমরা আমিরের পরিবর্তন চাই কি না, এটা হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যরা কী বলল বা না বলল, এতে সংগঠন চলবে না। আমাদের জনশক্তি, আমাদের কর্মী-সমর্থক, আমাদের পুরাতন দায়িত্বশীল, আমাদের ফোরাম, আমাদের শূরা, আমাদের প্রেসিডিয়াম—তারাই যদি মনে করেন যে যিনি আমীর আছেন, তিনিই সবচেয়ে ভালো এবং তিনি ঐক্য-সংহতি ধরে রাখতে পারছেন, তাহলে তিনিই আমাদের প্রয়োজন। তাঁর বিকল্প যদি আমরা না ভাবি, তাহলে এটা নিয়ে এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই।
আওয়ার ইসলাম: আমাদের বিদায়ী মহাসচিব এবং আপনার কর্মপদ্ধতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী হবে? এবং আপনি দলের কোন দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে সংস্কার করবেন?
গাজী আতাউর রহমান: আমরা যেহেতু ইসলামি সংগঠন করি, আমাদের নীতি, আদর্শ, লক্ষ্য ও মূল উদ্দেশ্য থেকে তো বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের গঠনতন্ত্র ও নীতিমালা আছে। এর ভেতরে থেকেই আমাদের কাজ করতে হয়। আমার আগে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা মহান ব্যক্তি ছিলেন। সেই তুলনায় আমি ছোট মানুষ। এই ছোট মানুষের কাঁধে বড় দায়িত্ব চলে এসেছে। আমার জন্য প্রত্যেকটা দিনই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। আমি প্রতিদিনই চেষ্টা করব সংগঠনকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
আওয়ার ইসলাম: আপনার মূল ফোকাস কোন কাজগুলোতে থাকবে বা কোন জায়গাগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন?
গাজী আতাউর রহমান: আমাদের সারাদেশে যথেষ্ট নেতাকর্মী ও কর্মী-সমর্থক আছেন। এদেরকে জনশক্তিতে রূপদানের চেষ্টা করব। মান উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। এদেরকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা করব।
আওয়ার ইসলাম: আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ—এই জায়গাগুলোতে আপনার আলাদা কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
গাজী আতাউর রহমান: আপনি জানেন, আমি মিডিয়ার মানুষ। যেহেতু আমি মিডিয়াবান্ধব এবং কর্মজীবন শুরু হয়েছে মিডিয়ার মাধ্যমে, তাই এই জায়গাটাতে আমার দুর্বলতা আছে। তো অবশ্যই মিডিয়ায় আমি ফোকাস রাখার চেষ্টা করব। যেন মিডিয়ায় আমাদের অবস্থানটা সুসংহত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের অবস্থানটা তুলে ধরার চেষ্টা করব। চেষ্টা চলছেই অলরেডি। আন্তর্জাতিক বিষয়ে আমাদের একটা উপকমিটি হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, তারা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছে।
আওয়ার ইসলাম: আপনার হাত ধরে একটা মিডিয়াও যাত্রা শুরু করেছিল এবং আপনার কলাম, লেখা আমরা ছোটবেলায় পড়েছি। দলের নানা রকম পত্রিকা আছে, টেলিভিশন আছে, প্রিন্ট পত্রিকা আছে, অনলাইন পোর্টাল আছে। আপনি দীর্ঘ সংগ্রামের পরে আজকে যে জায়গাটায় এসেছেন, আপনার কি মনে হয় যে, ইসলামী আন্দোলন নিজের মিডিয়া গড়ে তুলবে বা কী পরিকল্পনা আছে?
গাজী আতাউর রহমান: দলের নিজস্ব মিডিয়া থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি না। এখানে যেটা দরকার, সেটা হলো আদর্শের পক্ষে কাজ করার মতো কিছু হলেই হয়। যেমন ‘আওয়ার ইসলাম’-কে আমাদের মিডিয়াই বলতে পারি। এমনিভাবে আরও অনেক পোর্টাল আছে, যেগুলো আমাদেরকে নৈতিকভাবে সমর্থন ও সাপোর্ট করে। আমি মনে করি, সবাই আমাদের। আমি সবাইকেই আমাদের পক্ষের শক্তি ভাবতে চাই। যারা আমাদের সমালোচনা করছে, আমি মনে করি তারাও আমাদের উপকার করছে। দলীয় মিডিয়া থাকতেই হবে—এটা আমি তাৎপর্যপূর্ণ মনে করি না।
আওয়ার ইসলাম: নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামি দলগুলোর পরস্পরের বন্ধুত্ব বা বন্ধুত্ব না থাকার জায়গাটা, কিংবা মূল রাজনৈতিক সরকারি দল বা বিরোধী দল—এই যে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের ভূমিকা কী হবে?
গাজী আতাউর রহমান: এখন তো দেশে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিরোধী দল নেই। পার্লামেন্টে যে বিরোধী দল দেখছি, এটা অনেকটা বিগত আওয়ামী লীগের আমলে সাজানো কিছু বিরোধী দলের মতো। মানুষও তাদেরকে বিরোধী দল হিসেবে তেমন দেখে না। কারণ দীর্ঘদিন তারা একই সঙ্গে ছিল। এখন সরকারি দল আছে, বিরোধী দল আছে—কিন্তু দীর্ঘদিন তারা একসঙ্গেই ছিল। হঠাৎ নির্বাচনে এসে তারা আলাদা নির্বাচন করেছে। কিন্তু তাদের সেই আগের অভ্যাসটা আর যায়নি। তাদের সেই প্র্যাকটিস তো আছে। তারা মাঝেমধ্যে বলে, ‘আসুন আমরা মিলেমিশে দেশ চালাই।’ ঠিক আছে, মিলেমিশে দেশ চালাব। কিন্তু সংসদে বিরোধী দলের নেতা যখন এটা বারবার উচ্চারণ করেন, সেখানে বিরোধী দলের চরিত্র আমরা খুঁজে পাই না।
আমরা দেখেছি, তারা জাতীয় সংকট নিয়ে খুব কম কথাই বলছে। তারা বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়েই কথাবার্তা বলছে। বিএনপিকেও দেখলাম, এক দল আরেক দলের অতীত নিয়ে চর্চা করছে, যেমনটা আগের সংসদে হতো। এটা আমরা চাইনি। আমরা চেয়েছি, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে, নতুন পার্লামেন্ট হবে, সেখানে গঠনমূলক আলোচনা হবে। কিন্তু এখন দেখছি, তারা নিজেরা একে অপরকে ঘায়েল করার জন্য বিভিন্ন সময় অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আসছে।
তারপর দেখলাম, নবীন সংসদ সদস্যরা তাদের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া পার্লামেন্টে তুলে ধরছেন, যার সঙ্গে জাতির কল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই। কেউ মাইক্রোবাস, কেউ ওয়াশিং মেশিন, কেউ পর্দা চাচ্ছেন। এগুলো মানুষের কাছে তেমন ভালো বার্তা যায় না। এতে মানুষ বুঝে ফেলেছে যে, বিরোধী দলটা কোন মানের।
আওয়ার ইসলাম: ঠিক গত নির্বাচনে আমরা যে জোয়ার দেখেছিলাম—ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃত্বে ইসলামি দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, এক বাক্সনীতি তৈরি হচ্ছে। সে জায়গায় ছন্দপতন হয়ে আপনারা এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং একটি আসন পেয়েছেন, যেটি কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেও সেটা আমাদের কাছে ছিল না। এ ব্যাপারে আপনাদের দলীয় অভ্যন্তরে কী আলোচনা বা মূল্যায়ন হয়েছে? এটাকে ভরাডুবি হিসেবে দেখছেন নাকি শক্তি হিসেবে দেখছেন? অথবা আসলেই বাস্তবতা এমন—এটাকে আপনারা কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
গাজী আতাউর রহমান: এটা বাস্তব যে নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি এবং মানুষের যে পারসেপশন আমাদের ব্যাপারে ছিল, সেটা হয়তো বাস্তবায়িত হয়নি। আমাদের করণীয় কিছু ছিল না। ঐক্যের বিষয়টা যে আপনি বললেন, এটার উদ্যোক্তাই আমরা ছিলাম। ঐক্যের জন্য আমরা যে মানদণ্ডটা ঠিক করেছিলাম, সেটা ছিল ইসলামি শক্তির ঐক্য। ইসলামি ঐক্যশক্তির বাক্স হবে আমাদের। সেই ভিত্তিটা যখন থাকে না, তখন আমরা তো আমাদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারি না।
আমাদের সংগঠনটা হলো ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য। আমাদের সকল কর্মকাণ্ড তো এটাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে। নির্বাচন হলো সবচেয়ে বড় কর্মসূচিগুলোর একটি। সেখানেই যদি ইসলামের নীতি-আদর্শ না থাকে, তাহলে আমাদের অস্তিত্ব থাকে না। আমরা যে ভবিষ্যতে রাজনীতি করব, আমাদের কর্মী-সমর্থকদের এই মাঠে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করব—সেই নৈতিক ভিত্তিটাই যদি ধসে যায়, তাহলে আমরা তো আমাদের অস্তিত্ব শেষ করে সাময়িক নির্বাচনী সফলতার চেষ্টা করব না।
যে ঐক্যটা আমরা গড়ে তুলেছিলাম, সেটা আসলে ধরে রাখতে পারিনি। এই জন্য কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আমাদের আসেনি। এর মানে এই নয় যে, আমাদের বিপর্যয় হয়েছে। আমরা সামনে যাওয়ার যতটুকু আকাঙ্ক্ষা ছিল, ততটুকু হয়তো সামনে যেতে পারিনি। এমন তো নয় যে, আমরা পিছিয়ে গেছি। আমাদের যতটুকু টার্গেট ছিল, তার দশ কদম সামনে এগিয়েছি।
আপনি যদি বিগত দিনের ফলাফল বিশ্লেষণ করেন, তাহলে দেখবেন—অবশ্যই আমাদের ফলাফলটাকে বিপর্যয় বলা যাবে না। যেমন বিএনপি জোটে অনেক দল আছে, বিরোধী দলেরও অনেক দল আছে। তাদের মধ্যে কেউ আসন পেয়েছে, আবার কেউ পায়নি। তবু তারা আছে। কিন্তু এর বাইরে আমরা একা। এই নির্বাচনের ফলাফল যদি বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব—দুই জোটের বাইরে কোনো রাজনৈতিক দল এককভাবে কোনো আসন পায়নি। আবার কোনো কোনো দল এককভাবে ১ শতাংশ ভোটও পায়নি।
ইসলামী আন্দোলন এমন একটি রাজনৈতিক দল, যারা দুই জোটের বাইরে থেকেও এক আসন পেয়েছে এবং প্রায় ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বিগত দিনের চেয়ে তিন-চার গুণ ভালো ফলাফল হয়েছে। এটাকে বিপর্যয় বলার কোনো সুযোগ নেই।
আওয়ার ইসলাম: এতোটুকু তো স্বীকার করবেন যে, ফলাফল কাঙ্ক্ষিত হয়নি। আবার দলের মধ্যেও এক প্রকার স্থবিরতা এসেছে। দলকে চাঙা করার জন্য এই ছয় মাস আগেই কমিটি নবায়ন করা অথবা কমিটিকে চাঙা করে গড়ে তোলা—এটাও কিন্তু কাজেরই অংশ। তো দলকে চাঙা করার জন্য যখন কমিটি নবায়ন করা হয়েছে, তখন সারাদেশে আর কী কী উদ্যোগ আপনারা গ্রহণ করবেন বা দল গ্রহণ করবে?
গাজী আতাউর রহমান: এখন আমরা পুনর্গঠনে হাত দেব। কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠিত হয়েছে। জেলা কমিটি, থানা কমিটি ও তৃণমূলের সব কমিটি আমরা নতুন করে সাজাব। আর স্থানীয় নির্বাচন আসবে। ওটা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুতি নেব।
আওয়ার ইসলাম: কী ধরনের প্রস্তুতি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের জন্য আপনারা নিচ্ছেন বা নেবেন?
গাজী আতাউর রহমান: সারাদেশে তৃণমূলের প্রার্থী আমরা বাছাই করা শুরু করে দিয়েছি। স্থানীয় নির্বাচনে সব জায়গায় আমরা অংশগ্রহণ করব। যদিও এবার দলীয়ভাবে হবে না, স্বতন্ত্রভাবে হবে। প্রত্যেকটি ইউনিয়নে আমাদের কমিটি ও সাংগঠনিক কাঠামো আছে। তাই সব কেন্দ্রে আমাদের প্রার্থী দেওয়ার সক্ষমতা আছে। প্রার্থী দেব, যাতে করে সব জায়গায় কর্মীরা সক্রিয় থাকে এবং ভালো মানুষের পক্ষে সবাই ভোট দিতে পারে। কিছু টার্গেটেড এরিয়া থাকে, সেখানে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে ভালো ফলাফল তুলে আনার চিন্তা করি।
আওয়ার ইসলাম: ঠিক একটু আগে আপনি বলছিলেন যে, আমরা নিজেরা ইসলামী আন্দোলন এক বাক্সনীতির প্রবক্তা। যেকোনো কারণেই হোক, সে জোটটি আর হয়নি। স্থানীয় নির্বাচনের পাঁচ বছর পর হয়তো জাতীয় নির্বাচন আসবে। আপনারা কি ইসলামপন্থী দলগুলো নিয়ে আবার জোটের চিন্তা বা পরিকল্পনা আছে কি না?
গাজী আতাউর রহমান: দেখেন, এই যে ঐক্যের বিষয়টা, এটা আল্লাহর নির্দেশ। ইসলামপন্থী দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ‘ওয়াতাসিমু বিহাবলিল্লাহি জামিআঁ ওয়া লা তাফাররাকু’। এখানে আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য। আল্লাহ কিন্তু একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন—হাবলিল্লাহ, আল্লাহর রজ্জু। আল্লাহর দীনের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হবেন। ঐক্যের এজেন্ডা আমাদের স্থায়ী এজেন্ডা। আমাদের দলের বৈশিষ্ট্য হলো ঐক্য প্রয়াসে একটি শক্তি। ঐক্যের চিন্তা, ঐক্যের ভাবনা এবং ঐক্যের মানসিকতা যদি আমরা লালন না করি, তাহলে আমরা প্রকৃত মুমিন হতে পারব না। মুমিনরা তো বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো, সকল মুমিন যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, সেই চেষ্টা আমাদের সবসময়ই থাকবে। কিন্তু মানদণ্ডের বাইরে নয়। আমাদের ভিত্তি হলো ইসলাম। সত্যিকার অর্থেই ইসলামের কল্যাণে আমাদের ডাকে যদি কেউ সাড়া দেয়, তাহলে হবে।
আওয়ার ইসলাম: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামি দলগুলোর ভবিষ্যৎ বা সম্ভাবনা কী আছে আপনার দৃষ্টিতে? দীর্ঘ জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন ইসলামি রাজনীতির জন্য। এ দেশের রাজনীতিতে ইসলামি দলগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
গাজী আতাউর রহমান: ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। সামনে তো ইসলামেরই ভবিষ্যৎ। এখানে ইসলামি শাসন ছাড়া আর তো সব শাসনই চলেছে। বিভিন্ন ধরনের শাসন তো বিগত দিনে আমরা এখানে দেখেছি। অতএব, এখানে উজ্জ্বল সম্ভাবনা যদি থেকে থাকে, তাহলে ইসলামেরই আছে। এই জন্যই তো এই স্বপ্ন বুকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আলহামদুলিল্লাহ, সফলতাও পাচ্ছি। মানুষ এখন সাড়া দিচ্ছে, যুবকদের মাঝে আকর্ষণ বাড়ছে। নারায়ে তাকবির স্লোগান দিচ্ছে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে। আগে যেমন ক্যাম্পাসে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিলে মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক বলা হতো। দেখা যাচ্ছে, এখন আমাদের যুবসমাজে এমন স্পৃহা জেগে উঠেছে। এটাই আমাদের বড় শক্তি।
আওয়ার ইসলাম: যুবসমাজকে আপনার দলে ভেড়ানোর জন্য বা কাছে টানার জন্য আলাদা কী ধরনের বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেছে বা করবে?
গাজী আতাউর রহমান: আমাদের তো ছাত্র সংগঠন ও যুব সংগঠন আছে। আমাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। কীভাবে এই সীমাবদ্ধতা দূর করা যায়, উসুল ঠিক রেখে যুবসমাজের মাঝে কীভাবে আন্দোলনের বিকাশ ঘটতে পারে, তা নিয়ে আমরা গবেষণা করছি। তরুণদের কাছে টানার জন্য আমাদের আলাদা গবেষণা সেল আছে। কাজ চলছে। সামনে এগুলোর আউটপুট পাব।
আওয়ার ইসলাম: আমরা গণমাধ্যম সূত্রে জেনেছি, ইসলামী আন্দোলন নারীদের নিয়ে কাজ করবে। নারীদের তালিম, নারীদের তাকাজা পূরণ করবে। তো এই জায়গাটায় নারীদের জন্য আলাদা উইং হবে। এ ক্ষেত্রে আপনাদের কী ধরনের পরিকল্পনা আছে?
গাজী আতাউর রহমান: নারীদের মাঝে আগেও কাজ ছিল, সেটা এতটা সুসংগঠিত ছিল না। এটা আমরা উপলব্ধি করেছি। আসলে নারীদের মাঝে আমাদের জোরালো অবস্থান কেন নেই। ইসলামী আন্দোলন আসছে কিন্তু ছাত্র আন্দোলন থেকে। একেবারে কেন্দ্র থেকে নিয়ে লোকাল লেভেল পর্যন্ত সব পর্যায়ে। আমাদের নেতৃত্বের প্রোডাকশন হলো ছাত্র আন্দোলন থেকে। আমরা সিরিয়াস কাজ করতে গিয়ে নারীদের মধ্যে উপলব্ধি করলাম যে, এখানে প্রশিক্ষিত জনশক্তি নেই। যারা আগে রাজনীতি করে এসেছে, তাদের মধ্যে রাজনৈতিক প্র্যাকটিস, সাংগঠনিক প্র্যাকটিস—এসবের ক্ষেত্রে আমরা শূন্যতা অনুভব করছিলাম। এখন চিন্তা করলাম যে, আমাদের ছাত্রী সংগঠন করতে হবে। যাতে করে ছাত্রজীবনেই তারা এই চর্চার মধ্যে থাকে, তাদের মধ্যে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক চিন্তা আসে এবং ইসলামি আখলাকের চিন্তাটা ছাত্রাবস্থাতেই আসে। তাদের মধ্যে তালিম-তারবিয়াত করা সহজ। আশা করি, ছাত্রী সংগঠনটাও হয়ে যাবে।
আওয়ার ইসলাম: কবে নাগাদ ঘোষণা আসতে পারে?
গাজী আতাউর রহমান: সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এখন শুধু এটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। এটা একটা সেনসিটিভ বিষয়। এটা নিয়ন্ত্রণ ও কাজ কীভাবে হবে, তা নিয়ে কাজ করছি।
আওয়ার ইসলাম: ঠিক কোন অনুভূতি থেকে আপনি বলেছেন যে, নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের ওপর চাপ অনুভব হচ্ছে? আগামী দিনে দল পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনার কাছে চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে কোন কোন বিষয়?
গাজী আতাউর রহমান: প্রথমত চ্যালেঞ্জ হলো, ইসলামী আন্দোলনের ওপর ইসলামপন্থী মানুষের যে আস্থা আছে, সেই অবস্থাটা ধরে রাখা। মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য সংগঠনকে প্রস্তুত করা। আরেকটা হলো অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেটা হলো, আমাদের এই জনশক্তির মধ্যে দুই ধারা। রাজনৈতিক মাধ্যমে যেমন রাজনৈতিক কর্মী তৈরি হয়, পাশাপাশি আমাদের আধ্যাত্মিক ধারাও আছে। আধ্যাত্মিক তরিকার মাধ্যমে আরেকটি শ্রেণি তৈরি হয়।
আরএইচ/