|| মাওলানা মুনঈম ফায়েজ ||
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মত ছিল যে, কারো নাক দিয়ে রক্ত পড়লে বা সিঙ্গা (হিজামা) করালে অজু ভেঙে যায়। একদিন এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল: আপনার ইমাম যদি এমন হন যার শরীর থেকে রক্ত বের হয়েছে, কিন্তু তিনি পুনরায় অজু করেননি, তাহলে আপনি কি এমন ইমামের পেছনে নামাজ পড়বেন? ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল উত্তর দিলেন: আমার কী হিম্মত আছে যে, আমি ইমাম মালেক ও ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিবের পেছনে নামাজ পড়ব না? (এই দুই ইমামের মতে রক্ত বের হলে অজু ভাঙে না)।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) একবার ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর কবরের পাশে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। তিনি ফজরের নামাজে দোয়ায়ে কুনুত পড়েননি, যদিও ইমাম শাফেয়ীর নিকট ফজরের নামাজে কুনুত পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। কেউ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: আমি কি ইমাম আবু হানিফার উপস্থিতিতেও তার সাথে মতবিরোধ করতে পারি? এরপর তিনি বললেন: আজ আমি ইরাকবাসীদের মাজহাব অনুযায়ী আমল করেছি।
একবার ইমাম শাফেয়ী ঘোড়ায় চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন এবং তার ঘোড়ার লাগাম ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ধরে পায়ে হেঁটে সাথে চলছিলেন। কেউ তা দেখে তার ছেলেকে বলল: তোমার পিতার কি লজ্জা লাগছে না? ইমাম আহমদের ছেলে সালেহ গিয়ে বিষয়টি জানালেন। এ কথা শুনে ইমাম আহমদ জবাব দিলেন: তাকে গিয়ে বলো, যদি তুমিও ইলমে দক্ষতা অর্জন করতে চাও, তবে এসো এবং অন্য পাশ থেকে লাগাম ধরে ইমাম শাফেয়ীর সওয়ারির সাথে হেঁটে চলো। (আদাবুল ইখতিলাফ ফিল ইসলাম, ত্বহা জাবের আলওয়ানি, পৃষ্ঠা: ১১৬ ও পরবর্তী)।
ইউনুস ইবনে আব্দুল আলা আস-সাদাফি তার যুগের বড় আলেম ছিলেন। একদিন ইমাম শাফেয়ীর সাথে তার সাক্ষাৎ হলো এবং কোনো একটি মাসআলা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো। দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর তারা আলাদা হয়ে গেলেন। পরবর্তীতে একদিন দেখা হলে ইমাম শাফেয়ী ইউনুস ইবনে আব্দুল আলার হাত ধরে বললেন: এটি কি উত্তম হবে না যে, একটি মাসআলায় আমাদের মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমরা ভাই ভাই হয়ে থাকি?!
একবার ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম আলী ইবনুল মাদিনির সাক্ষাৎ হলো। একটি মাসয়ালা নিয়ে তাদের মধ্যে বিতর্ক হলো এবং আওয়াজ উঁচু হয়ে গেল। উপস্থিত লোকদের আশঙ্কা হলো যে, হয়তো এই দুই মহান ব্যক্তির মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হবে। কথাবার্তা বেশ কিছুক্ষণ চলল এবং যখন আলী ইবনুল মাদিনি ঘোড়ায় চড়ে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) তার ঘোড়ার লাগাম ধরে ফেললেন। (আদাবুল ইখতিলাফ, শায়খ আওয়ামা, পৃষ্ঠা: ৮১)।
ইলমি মতপার্থক্য সব যুগেই ছিল। এই মতপার্থক্যকে পারস্পরিক লড়াই এবং গালিগালাজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া একটি নিন্দনীয় কাজ।
হজরত শাইখুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী ইসলামিক ফিন্যান্স ও ফিকহে ইসলামির একজন প্রতিভাবান আলেম। তার কোনো ফিকহি মতামত নিয়ে আহলে ইলম অবশ্যই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু তার সম্মানিত সত্তাকে নিয়ে উপহাস বা কটাক্ষ করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)-এর জন্য অর্থনীতির বিষয়টি নতুন নয়, ফিকহের ময়দানেও তার দক্ষতা কারো অজানা নয়। সম্ভবত তিনিই বিশ্বের ইতিহাসের একমাত্র মুফতি, যিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য রেখেছেন। এত প্রতিভার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর একজন বিনয়ী বান্দা, যিনি কখনো নিজের মতকে শেষ কথা মনে করেননি। তিনি একাধিকবার নিজের মত থেকে ফিরে এসেছেন (রুজু করেছেন)।
কারেন্সি নোটের ব্যাপারে তার রুজু করার বিষয়টি তো সাম্প্রতিকই। তার আগের মত ছিল যে, ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতের ভিত্তিতে একই মুদ্রার পারস্পরিক লেনদেনে কম-বেশি করা জায়েজ নেই, তবে একতরফা বাকি রাখা সম্ভব। এই মতের বিপরীতে যখন কেউ তার কাছে হজরত মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানভি (রহ.)-এর ফতোয়া পৌঁছালেন, তখন তিনি শুধু নিজের মত থেকে ফিরে আসেননি, বরং এই রুজুকে সর্বত্র প্রকাশও করে দিয়েছেন যে, একই মুদ্রার পারস্পরিক লেনদেনেও 'রিবার' (সুদ) কারণ 'ইত্তিহাদে জিনস' (একই জাতিভুক্ত হওয়া) পাওয়া যায়, সুতরাং এ ক্ষেত্রে একতরফা বাকি রাখাও নাজায়েজ।
ক্রিপ্টোকারেন্সি এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। পাকিস্তানসহ অনেক দেশ এটি পর্যালোচনা করছে, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোচ্ছে। পাকিস্তানের অধিকাংশ বা সম্ভবত সব দারুল ইফতাই এখন পর্যন্ত এর জায়েজ হওয়ার ফতোয়া দিতে পারেনি। অনেক আলেম, মুফতি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এর বৈধতার পক্ষে। যার মত আপনার কাছে শক্তিশালী মনে হয়, আপনি সে অনুযায়ী আমল করতে পারেন।
আমার ভালো মনে আছে, যখন বাইন্যান্সের অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের ওপর অভিযান চালানো হচ্ছিল, আজ সময় বদলেছে এবং ক্রিপ্টো কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলাবে এবং ফতোয়াও পরিবর্তিত হবে। হযরত শাইখুল ইসলামের সম্মানিত সত্তার কাছ থেকে ক্রিপ্টো কাউন্সিল নির্দেশনা গ্রহণ করুক এবং তাদের কাছে আধুনিক প্রযুক্তিগত তথ্য পৌঁছাতে থাকুক, তবে অনেক নতুন বিষয় সামনে আসতে পারে।
ফতোয়া কোনো ওহি (ঐশ্বরিক জ্ঞান) নয়, বরং এটি একটি ফিকহি বিশ্লেষণ যা বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়, যার জন্য তিনি আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করবেন। আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে যে, খুশি করার জন্য এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বাহবা কুড়ানোর চেয়ে এই মহান আমানত রক্ষাকারী একজন মহান মুফতির মর্যাদা বোঝা বেশি জরুরি। কারণ তার পরে: ‘খুঁজবে যদি দেশ-দেশান্তরে/পাবে না কোথাও, আমরা বড় দুর্লভ।’ আল্লাহ তায়ালা হজরত শাইখুল ইসলাম (দামাত বারাকাতুহুম)-কে নূহ আ.-এর ন্যায় দীর্ঘ হায়াত দান করুন। আমিন।
[একটি উর্দু নিউজ পোর্টাল থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন: সাইমুম রিদা]
