শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৬ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২২ শাওয়াল ১৪৪৭


স্বপ্নের দেওবন্দ: খুলে যাক বৈধ পথ

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
আওয়ার ইসলাম

জহির উদ্দিন বাবর

এদেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসার শিকড় গেঁথে আছে দারুল উলুম দেওবন্দে। ভারতের উত্তর প্রদেশের এই জগদ্বিখ্যাত মাদরাসাটি নিছক কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়; এটি একটি আন্দোলন ও চেতনার সূতিকাগার। ব্রিটিশ বেনিয়া গোষ্ঠীকে এই উপমহাদেশ থেকে তাড়াতে যে প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল, সেটি হচ্ছে দারুল উলুম দেওবন্দ। এখানে নিছক কিছু কিতাবের জ্ঞানই দেওয়া হয় না; সবক শেখানো হয় চেতনা ও আদর্শের। মন্ত্র শেখানো হয় স্বাধীনতার। দীক্ষা দেওয়া হয় সব প্রতিকূলতার সামনে বুকটান করে দাঁড়িয়ে থাকার। মূলত সেই চেতনা ধারণ করেই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও হাজার হাজার কওমি মাদরাসা গড়ে উঠেছে। তবে এই শিক্ষাধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত লাখ লাখ শিক্ষার্থী সরাসরি আদর্শ ও চেতনার সূতিকাগার দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় কয়জনের? লাখ লাখ শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখলেও তা পূরণ হয় কয়েক শ’ তালিবুল ইলমের। দিন যত গড়াচ্ছে সেই সংখ্যাটি ততই কমে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: কওমি সিলেবাসে ‘সিরাত’ অবহেলার শিকার হওয়া বেদনাদায়ক: মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা সময় বেশ সুসম্পর্ক থাকলেও বৈধ পথে দেওবন্দে গিয়ে পড়ার সুযোগ কখনো হয়নি এদেশের শিক্ষার্থীদের। বিগত দিনে যারা সেখানে পড়তে গিয়েছেন তারা নানা কৌশলে গিয়েছেন। যেহেতু বৈধ উপায়ে সেখানে ভর্তির সুযোগ নেই, ফলে অন্য ভিসায় গিয়ে দেওবন্দে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করায় সেই সুযোগও আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসে। এভাবে পড়াশোনা করতে গিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা কারাভোগ পর্যন্ত করেন। আর চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায় দেওবন্দে বাংলাদেশি পড়ুয়ার সংখ্যা একদমই কমে গেছে।

দেওবন্দের সঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামার বরাবরই সুসম্পর্ক ছিল। এখানকার কোনো কোনো আলেমের সত্যায়ন ও সুপারিশে অনেক তালিবুল ইলম দেওবন্দে গিয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু যেহেতু দুটি ভিন্ন দেশ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নানা সময় ওঠানামা করে; এজন্য সবসময় সমান সুযোগ মিলবে না এটাই স্বাভাবিক। ২০১৮ সালের দিকে দেওবন্দ সফরকালে সেখানকার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় হয়েছিল। তখন তারা সেখানে পড়তে যাওয়ার বিড়ম্বনা এবং নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতীয় সরকারের শিক্ষা বিষয়ক কোনো চুক্তি থাকলে সহজেই সেখানে পড়তে যাওয়া যেতো বলে জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কোনো সরকারই এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়নি। এমনকি আলেম-উলামাদের পক্ষ থেকেও কখনো সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানানো হয়নি। কয়েক বছর আগে দেওবন্দ থেকে ফেরার পথে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেই দাবি উঠেছিল। তরুণ আলেমদের ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে সরকারের কাছে দাবিও জানানো হয়েছিল। তবে শীর্ষ আলেমদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় সেটা হয়নি। অথচ তখন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সরকার চাইলে দেওবন্দে পড়তে যাওয়ার বৈধ একটা পথ বের করে দিতে পারতো।

এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। এই সরকারের সঙ্গে আলেমদের একটি অংশের সুসম্পর্ক রয়েছে। আলেম-উলামার সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক বেশ পুরনো। ভারতের সঙ্গে নতুন সরকারের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পথে। এই সরকারও চাইলে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দেওবন্দে পড়ার একটা পথ খুলে দিতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, সেই আন্তরিকতা থাকতে হবে তো! আর কেউ দাবি না জানালে বা চাপ না দিলে সরকার সেটা করতে যাবে না-এটাই স্বাভাবিক। এজন্য এদেশের কওমি তরুণদের দেওবন্দে পড়তে যাওয়ার পথ খুলে দেওয়ার জন্য প্রভাবশালী ও শীর্ষ আলেমদের আন্তরিক হতে হবে। তারা জোরালো দাবি জানালেই কেবল সেটা সম্ভব।

নিঃসন্দেহে দারুল উলুম দেওবন্দ এদেশের হাজারও কওমি তরুণের আবেগের জায়গা। সেখানে অন্তত এক বছর পড়াশোনা করতে পারার স্বপ্ন অনেকের। তবে ওই দেশের সরকারের বৈধ অনুমোদন না থাকায় নানা কৌশল অবলম্বন করে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে, অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে সেখানে পড়তে যাওয়া কতটা সমীচীন সেটা ভাবতে হবে। তাছাড়া দীনি ইলম অর্জনের মতো একটি খালেস বিষয়ে এক ধরনের মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়াটা নৈতিকভাবে কতটা বৈধ সেটাও বিবেচ্য বিষয়। এজন্য শুধু আবেগের বশে নয়, বাস্তবতা বিবেচনা করেই দেওবন্দে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আগে দলে দলে তালিবুল ইলমরা এদেশ থেকে দেওবন্দে যেতেন। তখন এতোটা কড়াকড়ি ছিল না। সে দেশের সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড়ও দিতো। ফলে সহজেই সেখানে গিয়ে ভর্তি হওয়া এবং ইলম হাসিল করা সম্ভব ছিল। এখন যেহেতু বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করেছে, এজন্য বৈধ পথ বের হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা না করাই উত্তম। তবে আগামীতে যারা এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চান তাদের জন্য পথ খোলার ব্যবস্থা করা সবারই দায়িত্ব। আর তা করতে সরকারের কাছে বিভিন্নভাবে দাবি উত্থাপন এবং চাপ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।

এদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়তে যান। সেটা সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমতি নিয়েই হয়ে থাকে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসেন। এমনকি ভারতেরও কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়াশোনা করছে। বিশেষ করে আমাদের মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী বেশি। কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দেওবন্দেও পড়তে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়া চাই। সরকারের কাছে সেই দাবি যত জোরালোভাবে উপস্থাপন করা যাবে তত তাড়াতাড়ি তা বাস্তবায়ন হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখক: আলেম সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সম্পাদক


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ