শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৬ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২২ শাওয়াল ১৪৪৭


কওমি সিলেবাসে ‘সিরাত’ অবহেলার শিকার হওয়া বেদনাদায়ক: মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

মুমিনের জীবনে সিরাত পাঠ খুবই জরুরি। কোরআনে বর্ণিত জীবনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ হচ্ছে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন। তাঁকে পড়া ছাড়া কোনো শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ নয়। সিরাত পাঠহীন শুধু মুমিন নয়, একজন সাধারণ মানুষের জীবনও অপূর্ণ। কিন্তু বেদনাদায়ক হলেও সত্য–আমাদের প্রাণের কওমি সিলেবাসে তা অনেক অবহেলিত। প্রাথমিকে ‘সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া’ নামক ছোট্ট পুস্তিকা ছাড়া সিরাতের মৌলিক কোনো গ্রন্থ কওমি সিলেবাসে নেই। এর কী কারণ এবং এই সংকট নিরসনের কী উপায়?–এমন নানা প্রশ্ন নিয়ে বিশিষ্ট সিরাত গবেষক মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন-এর মুখোমুখি হয়েছেন আওয়ার ইসলামের সহসম্পাদক ইমরান ওবাইদ

একজন মুসলমানের জীবনে সিরাত পাঠের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এমন প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা যাইনুল আবিদীন বলেন, ‘সহজ কথায় বলতে গেলে কুরআন ও হাদিসের বাস্তব মানচিত্র হলো সিরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইসলামকে যদি কেউ সহজ ও স্পষ্টভাবে ধারণ করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই এই মানচিত্র অনুসরণ করতে হবে তথা সিরাত পাঠ করতে হবে। সিরাত ছাড়া ইসলামকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা এবং অনুসরণ করা সম্ভব নয়। সিরাত পাঠহীন একজন মুমিনের জীবন অনেকাংশেই অপূর্ণ।’

আমাদের কওমি সিলেবাসে সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া ছাড়া তেমন মৌলিক কোনো কিতাব নেই, কওমি সিলেবাসে সিরাত বিষয়টা অবহেলিত কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কথাটা অনেক দিন থেকেই নানাভাবে উঠে আসছে। সচেতন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও বলছেন, এটা আমাদের সিলেবাসের অপূর্ণতা, অবশ্যই অবহেলিত বিষয়। এবং আমি নিজেও এর সঙ্গে একমত যে, কওমি সিলেবাসে সিরাত অবহেলার শিকার।

কওমি সিলেবাসে সিরাত বিষয়টা অবহেলার শিকার হওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই সিরাত গবেষক বলেন, আগে আমাদের কওমি সিলেবাসে সিরাতের আরও কিতাব ছিল, তাওয়ারিখে হাবিবে ইলাহ, সিরাতে ইবনে হিশাম, জাদুল মাআদ–যা আমরাও পাইনি। আমাদের পূর্বে যারা ছিলেন তারা পড়েছেন। কিন্তু কালক্রমে দ্রুত আলেম হওয়ার প্রবণতা থেকে সিলেবাস সংক্ষেপ করতে গিয়ে অন্যান্য কিতাবের সঙ্গে সিরাতের বেশ কিছু কিতাবও বাদ পড়েছে। এবং বাদ পড়তে পড়তে সিরাতে খাতামুল আম্বিয়ায় এসে ঠেকেছে। এটা সত্যিই বেদনাদায়ক। এমনটা হওয়া কোনোভাবেই উচিত হয়নি।

এই সংকট নিরসনের কী উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে এটা একটা অসুবিধার দিক আছে অবশ্য যে, আমাদের শিক্ষাকে যারা নেতৃত্ব দেন, শিক্ষা-বোর্ডগুলো যারা পরিচালনা করেন, তারা ঠিক কতটা শিক্ষাবান্ধব মানুষ বা আমাদের সিলেবাসগুলো নিয়ে কতটা ভাবেন, আমাদের সন্তানেরা কী পড়ছে, কেন পড়ছে, যে জন্য পড়ছে সেটা এখান থেকে ঠিক যথাযথভাবে আদায় হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে তারা কতটা ভাবেন, এ নিয়েও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা আছে। তো আমরা মনে করি প্রথমেই এ নিয়ে ভাবা উচিত যে, একজন ছাত্র যদি পরিপূর্ণরূপে সিরাত না জানে, তাহলে কুরআন-হাদিস পরিচ্ছন্নভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

বিশিষ্ট সিরাত গবেষক উত্থাপিত এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেন, কেউ হয়তো অতি পাণ্ডিত্য দেখানোর জন্য এমনও বলবে যে, কুরআন-হাদিসই তো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিরাত, আলাদাভাবে সিরাতের প্রয়োজন কী? এই প্রশ্নের দুইটা উত্তর। প্রথম হলো—তাহলে আমাদের পূর্বসূরিরা সিলেবাসে আরও কিতাব কেন রেখেছিলেন? তারা কি এটা বুঝতেন না?

দ্বিতীয় উত্তর হলো—কুরআন এবং হাদিসের বাইরে আরও যত সাবজেক্ট আছে, যা আমাদের পড়ানো হয়, যেমন—ফিকহ, এগুলো তো কুরআন-হাদিসের মধ্যেই আছে। এর জন্য আলাদা কিতাব কেন পড়ানো হয়? কুরআন-হাদিস পড়ালেই তো হয়ে যায়!

আমি বলব, ওইগুলো যেমন কুরআন-হাদিস পড়ালেই হয়ে যায় তারপরও আলাদা ফন হিসেবে পড়ানো হয়, সিরাতটাকেও ঠিক একইভাবে আরেকটু ব্যাপকভাবে পড়ানো উচিত।

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন বলেন, এই সংকট কাটানোর জন্য আমরা মনে করি যারা আমাদের কওমি শিক্ষাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের একটা বোর্ড বসবে, সিরাতের কিতাবগুলোকে তারা সামনে রাখবেন, তারপরে বয়সগুলোকে চিহ্নিত করবেন, পরে বয়স এবং পাঠ এই দুটোকে সামনে রেখে কোন স্তরের বাচ্চাদেরকে সিরাতের কোন কিতাব পড়ানো যেতে পারে, কোন ভাষায় পড়ানো যেতে পারে তারা সেটা নির্ধারণ করবেন।

তারা ভেবে দেখবে যে, সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া এটাই প্রাথমিক লেভেলের কিতাব কি না—যদি মানা হয়, তাহলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আরেকটা পূর্ণাঙ্গ জীবনী এমন একটা বয়সে গিয়ে পড়ানো উচিত—যখন একজন ছাত্র পড়ার পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনীটাকে সে বুঝে আত্মস্থ করতে পারে।

বিশিষ্ট এই সিরাত গবেষক বলেন, আমি মনে করি, এখন যে ক্লাসে সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া পড়ানো হয়, এই ক্লাস যে স্তরের এবং যে বয়সের বাচ্চারা এই সিরাত পড়ে, তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর জীবনটাকে ধারণ করা, উপলব্ধি করার বয়সটা পায় না। তারা কিছু শব্দ মুখস্থ করে, কিছু গল্প মুখস্থ করে এতটুকুনই। তাই আরেকটু উপরের বয়সে যাওয়ার পরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাঝারি অবয়বের ৩০০-৪০০ পৃষ্ঠার সিরাতের যে কিতাবগুলো আছে, সেটা যে ক্লাসের উপযোগী হয়, সে ক্লাসে তারা সেটা পড়াবে।

মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন সিরাত পাঠের জন্য আরেকটি প্রস্তাব পেশ করেন: শুধু ঘটনা বা গল্প নয়, বরং রাসূল (সা.)-এর পারিবারিক জীবন, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগুলোকেও আলাদা সেমিস্টার করে পড়ানো দরকার। বর্তমান বিশ্বের পারিবারিক সংকট ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অভাব পূরণে সিরাতের এই দিকগুলো আলাদাভাবে পড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

ছাত্রদের সিরাত পাঠে উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ নসিহত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের মেধাবী, সচেতন তরুণদের যারা মনে করেন যে, আলেম হিসেবে মুসলিম জাতিকে আগামী দিনে পথ দেখানো আমাদের কর্তব্য, তাদেরকে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত পাঠ করতে হবে।

তিনি ছাত্রদের পড়া উচিত এমন কিছু কিতাব সাজেস্ট করেন, যা তারা পড়লে ইসলামকে মানচিত্রের মতো করে সহজে বোঝা যাবে। কুরআন-হাদিস বা ইসলামের ঐতিহাসিক যে শ্রেষ্ঠত্ব, সেটা খুব সহজেই বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবে।

 * ডক্টর মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ রচিত ‘মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা.): জীবন ও কর্ম’

 * সায়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর ‘আস সীরাতুন নববীয়্যাহ’

 * ইমাম ইবনে কাসীর রহ.-এর ‘আল-ফুসুল ফি ইখতিসারি সিরাতুর রাসূল’

 * ইমাম ইবনে হিশাম রহ.-এর ‘আস-সিরাতুন নববীয়্যাহ’ (সিরাত ইবনে হিশাম)

 * মাওলানা ইদরিস কান্ধলবী রহ.-এর ‘সীরাতে মুস্তফা’

 * ইমাম ইবনে কাসীর রহ.-এর ‘আস সীরাতুন নববীয়্যাহ’

 * হাফেজ যাহাবী রহ.-এর ‘আস সীরাতুন নববীয়্যাহ’

 * আল্লামা ইবনে কাসীর রহ.-এর ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’

 * মাওলানা আবুল বারকাত আব্দুর রউফ রচিত ‘আসাহহুস সিয়ার’

 

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ