|| মুহাম্মদ উসামা হাবীব ||
কুরবানির পশুর চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য একটি নিত্যব্যবহার্য বস্তু। মুদ্রাস্ফীতি ও মানুষের প্রয়োজনীয় বিষয় হওয়ায় এর বাজার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। চামড়া কাঁচামাল কেন্দ্রিক ট্যানারি শিল্প এদেশের একটি বিকাশমান, সম্ভাবনাময়, জনবান্ধব শিল্প। অনেক মানুষের রুটি-রুজি এর সাথে জড়িত। নতুন নতুন চামড়াজাত পণ্য ক্রমশ দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশের বাজারেও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে।
চামড়াজাত দ্রব্যের কাঁচামালের যোগান আসে প্রধানত কুরবানির মৌসুমে। ট্যানারি মালিকদের সারাদেশ থেকে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, প্রাথমিক সংরক্ষণের মতো জটিল কাজটি করে দেয় এদেশের কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকগণ। অতি সহজে, বলতে গেলে এক প্রকার বিনা খরচে। বিনিময়ে সবসময় সরকারি আনুকূল্য থেকে দূরে থাকা এদেশের কওমি মাদরাসাগুলো তাদের কয়েক মাসের খরচ সংগ্রহ করে মাত্র। আর তাঁরা এর উপযুক্তও। তারা এর জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও যৌক্তিক খাত। কিন্তু দেশ ও জাতির শত্রু পশ্চিমা ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাষ্ট্র ও তাদের এদেশীয় দোসরদের কাছে বিষয়টি গাত্রদাহের কারণ হওয়ায় ট্যানারি শিল্প তাদের রোষানলে পড়ে। ফলে কৌশলে চামড়ার দাম কমিয়ে দেয়।
আমার জানামতে এর শুরু হয় ২০১৫/১৬ সালের পর থেকে। পার্শ্ববর্তী দেশে পাচারসহ বিভিন্ন সিন্ডিকেট তৈরি করে। ফলে চামড়াজাত পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সত্ত্বেও কাঁচা চামড়া মূল্যহীন হয়ে পড়ে। দেশের মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ করে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে এই কালেকশন সীমিত করে ফেলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন এলাকা ও মাদরাসা কর্তৃক ন্যায্য মূল্য না পেয়ে চামড়া পুঁতে ফেলা বা নষ্ট করার খবর পাওয়া গেছে। আর এ বছর তো সিলেট অঞ্চলের মাদরাসাসগুলো চামড়া সংগ্রহ না করার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। তবে এই চামড়া কালেকশন কবে থেকে শুরু হয় এবং এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু—তা আমরা জানবো পরের পর্বে।
চামড়া কালেকশনের শুরুর কথা ও প্রয়োজনীয়তা:
ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়ে যখন এদেশের রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক বিভিন্ন কওমি মাদরাসার সম্প্রসারণ হচ্ছিল, মূলত তখন থেকেই দীনদার শ্রেণি খুশি মনে মাদরাসাগুলোতে কুরবানির পশুর চামড়া দান করতো। মুরুব্বিদের সাথে কথা বলে এমনই ধারণা হয়। পরবর্তীতে এর বিভিন্ন সুবিধাজনক দিক বিবেচনায় রাজধানীসহ সারাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোতে এটি একটি মৌলিক রূপ ধারণ করে। আর সাধারণ ঈমানদার শ্রেণিও সবসময় একাজকে সুন্দরভাবেই স্বাগত জানিয়েছেন।
এ বিষয়টি যৌক্তিকভাবেও সঠিক। কারণ, যেখানে জেনারেল শিক্ষা ব্যবস্থা সেই শুরু থেকে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেয়ে আসছে, ক্ষেত্রবিশেষে অনেক দেশ ও জাতিবিরোধী শর্ত কবুল করে পশ্চিমা ফান্ড সংগ্রহ করা হয়, সেখানে এ সকল মাদরাসাগুলোর বিদেশি ফান্ডিং তো দূরের কথা, কখনো তারা রাষ্ট্রীয় কোনো আনুকূল্যই লাভ করেনি। বরং তারা রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য থেকে দূরে থাকাকে নিরাপদ মনে করে, প্রত্যাশাও করে। অথচ এসকল মাদরাসাগুলোতে ধর্ম, শিষ্টাচার, সাহিত্য, মানবিকতা, পরিমিতি ও মার্জিতাবোধসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখানো হয়। দেশ ও জাতি যার সুফল সর্বদাই ভোগ করে আসছে।
অন্য দিকে জেনারেল শিক্ষায় একটি বৃহদাংশ জনগণের ট্যাক্সের অঢেল সম্পদ আর পশ্চিমা ফান্ড খরচ করে কেবল বেকারত্বের সংখ্যাকেই বৃদ্ধি করছে। আর মেধাবীদের একটা বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় তাদের থেকে কোনো প্রতিফলন আশা করা যায় না।
পক্ষান্তরে কওমি মাদরাসা সমাজের এমন অনেক অভিভাবকহীন অথবা অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের দায়িত্ব গ্রহণ করছে, সত্যিকারার্থে যাদের অভিভাবক রাষ্ট্র ও সমাজ। অতএব বছরে একটি সময় কুরবানির চামড়া সংগ্রহ করা কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নিন্দনীয় নয়।
শরিয়তের দিক থেকেও এর সুযোগ অনুমোদিত। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘অতএব যখন সেগুলো (কুরবানির পশু) কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তা থেকে তোমরা আহার করো এবং অল্পে তুষ্ট সবরকারী ও যাচনাকারীকে আহার করাও।’ (সুরা হজ: ৩৬)
আয়াতের শিক্ষা ব্যাপক। সুতরাং কুরবানির পশুর চামড়াসহ সর্বাংশ নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। আর যদি টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে, তাহলে বিক্রয়লব্ধ টাকা সদকা করতে হবে (কিতাবুল উদহিয়্যা; হিদায়া ৪র্থ খণ্ড)।
চামড়া সংক্রান্ত একটি হাদিসও হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করবে তার কুরবানি বিশুদ্ধ হবে না’ (মুসতাদরাকে হাকেম: ৩৪৬৮)। সুতরাং আমাদের দেশে যেহেতু মানুষ ব্যাপকভাবে কুরবানির পশুর চামড়া ব্যবহার করে না, তাই তা উপযুক্ত খাতে পৌঁছে দেওয়া উচিত।
চামড়া সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ:
★ চামড়া সংক্রান্ত জটিলতা থেকে বের হতে কার্যকরী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। কুরবানির মৌসুমে মাদরাসাগুলোতে লবণ বিতরণের মতো কিছু না। এর দ্বারা মাদরাসার ছাত্রদের বেগার খাটার পরিমাণই কেবল বৃদ্ধি পায়। প্রথমত কথা হলো মাদরাসাগুলোতে বিকল্প অর্থনৈতিক উৎসের ফিকির করা। বিশেষত যখন সাধারণ মানুষের সচ্ছলতা ও জীবনমান তুলনামূলক বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবিদার। তা হলো মাদরাসার ছাত্ররা সারা বছর মার্জিত ও পরিশীলিত একটি পরিবেশে শুদ্ধতার চর্চা করে; সাধারণত যে একটি বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। কিন্তু সহসাই চামড়া সংগ্রহের জন্য এমন একটি পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যেতে হয়, যা অনেক স্পর্শকাতর রক্ষণশীল পরিবারের সন্তানদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। সাথে আলেমসুলভ আত্মমর্যাদার বিষয় তো আছেই। আর কৈশোরিক ঈদ আনন্দ বিসর্জন দেওয়ার বিষয়টি না হয় এড়িয়েই গেলাম। এতে করে আস্তে আস্তে অনেক মাদরাসা স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাবে। এমনকি আজকাল মু'তাদিল ফিকিরের মাদরাসা এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এক্ষেত্রে 'জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া ঢাকা', রাব্বানিয়া, পটিয়া আমাদের জন্য সুন্দর দৃষ্টান্ত হতে পারে।
★ অথবা চামড়া সংগ্রহ করা যেহেতু আমাদের অঞ্চলে বহু দিন ধরে চলে আসা আবহমান কালের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, এ হিসেবে এর কোনো সম্মানজনক বিকল্প পন্থা বের করা উচিত। যেমন, মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামি রহ. তাঁর আত্মজীবনীতে পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোর চামড়া সংগ্রহের যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। সত্যি বলতে আজ থেকে অনেক আগেই আমাদের পূর্বসূরীরাও এমন কথা বলেছেন। উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা নাসিম আরাফাত কর্তৃক রচিত ফরিদপুরী রহ., হাফেজ্জী হুজুর রহ. প্রমুখের জীবনকথায় তা লিপিবদ্ধ আছে। কারণ চামড়া সংগ্রহ একেবারে ছেড়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই, বাস্তবসম্মত অনেক প্রয়োজনও রয়েছে। তাই এরিয়া ভিত্তিক মাদরাসাগুলোর সাথে সাধারণ মানুষের যে আস্থা, যা আবহমান কাল ধরে চলে আসছে—এটাকে উপেক্ষা করারও কোনো সুযোগ নেই। কই! শুধুমাত্র এবছর বৃহৎ আকারে সিলেট ও ঢাকার কিছু মাদরাসা চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দেওয়ার সাথে সাথে সরকার থেকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন চলে এসেছে। আসলে কুকুর অনুযায়ী মুগুরের দরকার হয়।
★ সিন্ডিকেটের বাইরে এসে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মাঝে ট্যানারি শিল্পের সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। আজকাল তো তরুণদের মাঝে নতুন করে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস সঞ্চার হচ্ছে। ইচ্ছে করলে এটাকে এ খাতে কাজে লাগানো যেতে পারে। চামড়াজাত পণ্য যেখানে খুবই উচ্চ মূল্য রাখে। অনেক আগে আরজাবাদ মাদরাসা কেন্দ্রিক এই বিষয়টিকে সামনে রেখে একটি সমিতিও হয়েছিল, বড়দের তত্ত্বাবধানে। নির্দিষ্ট করে দিন-তারিখ মনে নেই। আমার বাবাও ওখানে সদস্য ছিলেন। কিন্তু চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী কওমির অন্যান্য উদ্যোগের মতো এটারও এক পর্যায়ে অকাল মৃত্যু হয়।
★ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বহুবিধ ব্যবহার শুরু করা যেতে পারে। যেমন চামড়া খাওয়া। অনেক অঞ্চলে গরুর মাথার চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে মানুষ আহার করে। যদিও এর প্রচলন খুব সীমিত পরিসরে আছে, কিন্তু শরিয়তে যখন সুযোগ আছে তখন বিবেচনায় রাখতে তো কোনো বাধা নেই।
★ চামড়া থেকে হালাল জেলাটিন বের করার শিল্পকে আমাদের দেশে বিকশিত করার জন্য কী কী কাজ করা দরকার, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। জেলাটিন, যা ওষুধ, কসমেটিকসহ অনেক পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগে। বিশ্ব বাজারে হালাল জেলাটিনের খুব চাহিদা, যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে জেলাটিনের ব্যবহার এখনো আমদানি নির্ভর।
আইও/