|| জহির উদ্দিন বাবর ||
১৯৬৬ সাল। ঠিক ছয় দশক বা ৬০ বছর আগের কথা। এই অঞ্চলের দীন ও ঈমানের রক্ষক কয়েকজন ঊর্বর মস্তিষ্কের আলেম বসলেন একটি সময়োপযোগী ভাবনা নিয়ে। সেই ভাবনাটি হলো, একদল যোগ্য আলেম লেখক, সাংবাদিক ও চিন্তাশীল গড়ে তোলা- যারা বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে দীন ও ঈমানের সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। এজন্য তারা একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেন। নাম ইদারাতুল মাআরিফ। যে প্রতিষ্ঠানের কাজ হবে ইসলামি ইলম ও প্রজ্ঞার ব্যাপক গবেষণা, কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিষয়াদির সর্বাত্মক প্রসার এবং বাতিল ধর্ম ও মতবাদসমূহের অসারতা তুলে ধরা।
এই চিন্তার মহানায়ক যুগের অন্যতম সংস্কারক আলেম ছদর সাহেব খ্যাত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.। কিন্তু তিনি নিজে তো একা পারবেন না এই মিশন সফল করতে! সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন অভিন্ন চিন্তার ধারক এবং ঊর্বর মস্তিষ্কের অধিকারী কয়েকজন আলেম সহচরকে। শুরুতে তাঁর প্রধান সহযোদ্ধা ছিলেন বিখ্যাত লেখক মাওলানা নূর মুহাম্মাদ আযমী রহ. এবং অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক রহ.। ১৯৬৭ সালে নিজের মৃত্যুর মাত্র বছরদুয়েক আগে নিজ প্রতিষ্ঠিত ফরিদাবাদ মাদরাসার পাশে তিনি শুরু করেন এই প্রতিষ্ঠান। সভাপতি ছিলেন ছদর সাহেব রহ. নিজে। আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার সাবেক মুহতামিম মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী রহ.।
ছদর সাহেবের ইন্তেকালের পর দ্বিতীয় সভাপতি হন পটিয়া মাদরাসার সাবেক মুহতামিম মাওলানা হাজী মুহাম্মদ ইউনূস রহ.। মাওলানা নূর মুহাম্মাদ আযমী রহ.-এর ইন্তেকালের পর এই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন বিখ্যাত মনীষী মাসিক মদীনার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.। সঙ্গে ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক।
১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ প্রায় নয় বছর টিকে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যয় বহন করতেন ইসলাম দরদি বিখ্যাত দানবীর হাজী জামিল আহমাদ সাহেব (জামিল গ্রুপ)। প্রায় নয় বছরে প্রতিষ্ঠানটি তার সাধ্য অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখানে গড়ে ওঠা একদল আলেম-বুদ্ধিজীবী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন।
দুই.
এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে আলোকিত দিক ছিল- অগ্রসর চিন্তার খ্যাতিমান কয়েকজন আলেমের সম্মিলিত চেষ্টা। যখন আলেমদের বাংলা চর্চা অনেকটা নিষিদ্ধ পর্যায়ে ছিল তখন তারা ঘটা করে প্রতিষ্ঠান খুলে লেখালেখি, সাংবাদিকতা ও গবেষণা শিখিয়েছেন। বাংলা চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। হাজী ইউনূস রহ. ও মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী রহ. এমন এক অঞ্চলের মানুষ ছিলেন, যেখানে বাংলা চর্চার কোনো বালাই ছিল না। তবু তাঁরা এর প্রয়োজনটা পুরোপুরি অনুধাবন করেছিলেন সেই ছয় দশক আগে। পুরনো ধারার বুজুর্গ আলেম হাজী ইউনূস রহ. এই প্রতিষ্ঠানের জন্য দিনের পর দিন ঢাকায় এসে পড়ে থাকতেন। অথচ তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, বিখ্যাত একজন দানবীরের অর্থ এনে এই আলেমরা একটি প্রোডাকটিভ কাজে ব্যবহার করেছেন, যার সুফল যুগের পর যুগ ভোগ করার মতো।
আক্ষেপের জায়গাটি হলো, গত ছয় দশকে এদেশে ধর্মীয় অঙ্গনে অনেক উন্নতি হয়েছে। আলেমদের চিন্তা-চেতনায় অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। সক্ষমতার দিক থেকেও আলেমরা আজ আর পিছিয়ে নন। চাইলে শত কোটি টাকার ফান্ড কালেকশন করতে পারেন-এমন আলেমের সংখ্যা বহু। কিন্তু সম্মিলিতভাবে সেই ইদারাতুল মাআরিফের মতো প্রতিষ্ঠান তো আলেমরা গড়তে পারেননি। পরবর্তী সময়ে মিরপুরের মুসলিম বাজার মাদরাসায় কিছুদিন এবং মাদরাসা দারুর রাশাদে এখনো সেই আদলে ‘ইদারাতুল মাআরিফ’ চালু আছে। তবে সেটা নিছক একটি মাদরাসার উদ্যোগে এবং এখন অনেকটা ম্রিয়মান। অগ্রসর চিন্তার আলেমরা চাইলে আজও এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু আফসোস, সবাই গতানুগতিকতার পেছনে দৌড়ান। প্রোডাকটিভ পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়ে না।
লেখক: আলেম সাংবাদিক ও কলামিস্ট
এমএম/