|| ড. ওয়ালীয়ুর রহমান খান ||
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সব দিক বিবেচনায় মুসলমানদের মধ্যে ঈমানি চেতনা; আমল আখলাকের চর্চা এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হওয়া অত্যন্ত জরুরি। মহানবী সা এর শিক্ষা ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের ব্যাপক অনুশীলন ব্যতীত এই বন্ধন ও ঐক্য সুসংহত হবে না।
সলফে সালেহীনের চরিত্র ও নসিহত অবলম্বন করে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্তি পরকালের জবাবদিহিতার প্রস্তুতিতেননিরন্তর সাধনা করা সবার জন্য জরুরি।
কোটি কোটি মানুষ হারামে লিপ্ত হচ্ছে। বহু মানুষ ঈমান হারা হচ্ছে। বহু মুসলমান ফরজ ইবাদত ও বিধানগুলো ছেড়ে দিয়ে ফাসেক হয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে যথাযথ চিন্তা কথাবার্তা ও পরিকল্পনা না করে কিছু মানুষ ঈদের মধ্যে ঐক্য কায়েমের জন্য হা হুতাশ করছেন। প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করছেন।
যার কোন দরকার ছিল না। কেননা; বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঈদ তিন দিন হওয়ার ঘটনা কম। তবে ভৌগোলিক কারণে হতে পারে। ঈদ দু দিনে হওয়া স্বাভাবিক; শরীয়ত সম্মত এবং সৌর বিজ্ঞান সমর্থিত। কোন বছর এক দিনেও হতে পারে। তবে তার সংখ্যা খুবই কম।
মহানবী সা এর শাসনামলে বা খুলাফায়ে রাশেদার যুগ থেকে ১৪০০ হিজরি পর্যন্ত কখনও এমন ঘটনা পাওয়া যায় না যে মহানবী সা বা খলীফা কিংবা শাসকগণ আশপাশের দেশে সামর্থ্য অনুযায়ী লোক পাঠিয়ে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন।
কিংবা আঞ্চলিক শাসকগণ দূত মারফত চাঁদ উঠার সংবাদ কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দিয়েছেন।
কোথাও নতুন চাঁদ দেখা গিয়েছে কি না তা জানার পর রোজা শুরু ও ঈদ পালনে ঐক্য কায়েমের চেষ্টা করা হয়েছে মর্মে ইসলামের ইতিহাসে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। কেউ পেয়ে থাকলে দিবেন। গবেষণায় সংযোজন হবে।
তথ্য প্রযুক্তির কারণে গত ৩০ /৪০ বছর ধরে মানুষ জানতে পারছে যে কোথায় কোন তারিখে রোজা শুরু বা ঈদ হচ্ছে।
এর আগে না জানার কারণে একই দিনে হতে হবে মর্মে কোন কথা বা বিতর্ক হয়নি।
বিতর্কের যুগ শুরু হওয়ার পর বহু কনফারেন্স হয়েছে। ফিকহ একাডেমির মিটিংয়ে আলোচনা পর্যালোচনা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের ফুকাহায়ে কেরামের কোন ঐক্যমত্য হয়নি।
এর প্রধান কারণ এ রকম ঐক্য জরুরি নয় এবং ভৌগোলিক ভাবেই সম্ভব নয়।
দ্রাঘিমা রেখায় যে দেশগুলো সৌদি আরব বা চাঁদের উৎপত্তি স্থান থেকে পরে অবস্থিত তারা দিনের মধ্যে থাকে এবং রাতটি বরণ করে তারাবি সাহরি ও রোজার নিয়ত করে। ঈদের দিনটি সামনে হয়।
যেসব দেশ সৌদি আরব বা চাঁদের উৎপত্তি স্থল থেকে পরে অবস্থিত তারা রাতের ১ কিংবা ২ তৃতীয়াংশে চলে আসার কারণে তারাবি সাহরি রোজা শুরু বা ঈদ পালনে পিছিয়ে যাবে। যেমন কখনও ওমান; ঢাকা ; করাচি; জাকার্তা; বার্মা; জাপান; ওশেনিয়া বা অস্ট্রেলিয়া।
তবে কোন কোন বছর জাপান বা অস্ট্রেলিয়া ফিকহি ও সৌর বিজ্ঞানের অনুসরণ না করে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। কিন্তু বেশির ভাগই সরাসরি চাঁদ দেখার উপর সিদ্ধান্ত নেয়।বাংলাদেশ তথা বিশ্বের পূর্ব প্রান্তের যারা সৌদি আরব বা প্রথম উৎপত্তি স্থল অনুসারে ঈদ করেন তারা মূলত সৌদি বা উৎপত্তি স্থানেরও ৩ থেকে ৯ ঘন্টা আগে ঈদের নামাজ পড়েন।
তাদের নামাজের সময়টি ধরে হিসাব করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ইউরোপ ও আমেরিকার দেশ ও প্রদেশসমূহে ঈদের জামাত হচ্ছে ১২ ঘন্টাও বেশি সময় পরে। যখন পূর্বের দেশগুলোতে পরবর্তী দিন চলে এসেছে। ফলে একই দিনে ঈদ হচ্ছে না।।
তাছাড়া শরীয়তে এই বিষয়ে ঐক্য নয় বরং বৈচিত্র ও বিস্তৃতির ব্যবস্থা করেছে।
মুসলিম বিশ্বের কোথাও ফজর কোথাও যোহর কোথাও ইফতার কোথাও সাহরি কোথাও ২৬ রমাদান কোথাও কদরের রাত কোথাও শেষ রোজা আর কোথাও ঈদুল ফিতর পালন হচ্ছে।
এটাই স্বাভাবিক যাদের উপর যে সময় উপস্থিত তারা সে সময়ের আমল করবে। ঈদের দিনে রোজা কেউ রোজা রাখছে; এ কথা বলা অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতা। যেমন কেউ যদি বলে আমরা আসরের (সৌদি) ওয়াক্তে ইশার নামাজ পড়ছি! কোন সুস্থ মস্তিষ্কের আলেম বা মুসলিম কি এ রকম বলেন?
আর শরীয়তের বিধান হল চাঁদ দেখার পর তার মুসলিম সরকার বা অমুসলিম রাষ্ট্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়ে ঈদ পালন করা। তাই যারা বাংলাদেশে সঠিক হিসাব এবং সরকারি ঘোষণার বিরোধিতা করে একদিন এবার দুদিন আগে ঈদ পালন করে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। কারণ ঈদ রোজা শুরু; জিহাদের ডাক ও হজের তারিখ ঘোষসরকার বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ দেওয়ার এখতিয়ার রাখে। কোন ব্যক্তি শ্রেণি বা পীর দরবারের এ অধিকার নেই।
এমএম/