|| মুহাম্মাদ শামসুদ্দোহা কাসেমী ||
শিরোনাম দেখে কি চিন্তায় পড়ে গেলেন? না, চিন্তার কোন কারণ নেই। একটু বাদেই আপনার চিন্তার অবসান ঘটবে ইনশাআল্লাহ।
আসলে, ঈদ শব্দটি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। ঈদ মানে আমরা জানি খুশি, আনন্দ, ফিরে আসা প্রভৃতি। শুধু কি তাই? নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে ঈদগাহে নামায পড়া, সুগন্ধি মাখা, সকলের সাথে প্রফুল্ল চিত্তে দেখা করা, আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া, ভালো ভালো খাবার খাওয়া, আরো কত কী! এক কথায় মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব হল এই ঈদের দিন। এটি খুশির দিন!
দুঃখ কষ্ট ভোলার দিন!
হিংসা বিদ্বেষ ভোলার দিন!
ভেদাভেদ ভোলার দিন!
একে অপরকে ভালোবাসার দিন! সৌভ্রাতৃত্ব বন্ধনের দিন!
সাম্য ও ঐক্যবন্ধনের দিন!
পাশবিকতা বিসর্জনের দিন!
মানবিকতা মেলে ধরার দিন!
আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগের কথা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন তখন দেখেছিলেন মদীনা বাসীরা বছরে দুটি নির্দিষ্ট দিনে খেলাধুলা করে। এ বিষয়ে তিনি জানতে চাইলে তারা বলে, আমরা দীর্ঘদিন থেকে এই দুটো দিনে খেলাধুলা করে আসছি চিত্ত বিনোদনের জন্য। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেন, মহান আল্লাহ তায়ালা এ দুটো দিনকে ঈদের দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। একটি হল ঈদুল ফিতর আরেকটি হল ঈদুল আজহা।
সেখান থেকে চালু হল মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদ পালন। সময়ের হিসাবে এটি শুরু হয়েছিল ৬২৩ খ্রিস্টাব্দে। দ্বিতীয় হিজরীতে। আজ সেটা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। বিশ্বের প্রায় পৌনে ২০০ কোটি মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। ছোট থেকে বড় সবাই। একেবারে আবাল বৃদ্ধ বণিতা।
ঈদুল ফিতর রমযানের শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। এদিন রোজা রাখা হারাম। এটি শুকরিয়া আদায়ের দিন। দু'রাকাত নামায আদায়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালাকে শুকরিয়া জ্ঞাপন করা হয়। কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোজাদাররা এদিন মহান প্রভুর কাছ থেকে পুরস্কার লাভ করে। নিশি জাগরণ করে তারা যে ইবাদাত করেছে, দিনের বেলা অভুক্ত থেকেছে তার পুরস্কার হিসেবে মহান আল্লাহ তায়ালা এদিন তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। সবার মনে অনাবিল আনন্দ প্রদান করেন। ধনী গরিব সকলে একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে। ফিতরা পেয়ে গরিবরাও এই আনন্দে শামিল হয়। পশ্চিম আকাশের এক ফালি চাঁদ এই খুশির বার্তা আমাদের কাছে বহন করে নিয়ে আসে। সেজন্য ঈদুল ফিতরের আগের রাতকে বলা হয় চাঁদ রাত। খুশির রাত।
ঈদুল আজহার ইতিহাস আমরা সকলে জানি। এটি হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের পুত্র হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের কুরবানির স্মৃতি হিসেবে পালন করা হয়। যার কেন্দ্রভূমি ছিল মক্কার মিনা নামক জায়গা। প্রতিবছর জিলহজ মাসের দশ তারিখে এটি উদযাপিত হয়। কুরবানির ঈদ নামে এটি সকলের কাছে সুপরিচিত। কেউ কেউ বলে বকরা ঈদ। এ ঈদেও কুরবানির গোশত বন্টনের মাধ্যমে সকলকে আনন্দ উৎসবে শামিল করা হয়। এটি মূলত মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য করা হয়। তিন দিনের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সকলে মেহমানদারী গ্রহণ করে। সেজন্য এই তিনদিন রোজা রাখা হারাম।
রোজা মূলত আমাদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। আত্ম সংযমের শিক্ষা দেয়। আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। তাকওয়ার জীবন গঠন করতে উৎসাহ প্রদান করে। গরিবের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। সব রকমের বৈষম্য ভুলে সকলকে এক আল্লাহর বান্দা হওয়ার চেতনা প্রদান করে। আদি পিতা ও আদি মাতার বংশধর হিসেবে সকলকে ভাই ভাই হয়ে থাকার অনুভূতি জাগ্রত করে।
অপরপক্ষে কুরবানি আমাদেরকে আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়। সত্য ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্বুদ্ধ করে। সকল প্রকার পশু সুলভ আচরণকে বর্জন করার চেতনা দান করে। মহান প্রভুর ভালোবাসায় নিজেকে উৎসর্গ করতে উৎসাহিত করে।
বস্তুত এ দুটো শিক্ষাই মানব জীবনের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এর পরিণাম অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
এতক্ষণ যে দুটো ঈদের কথা বলা হল সেটা মূলত ছোট ঈদ। বছরে মাত্র দুদিন। তকবীর ধ্বনির মাধ্যমে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। সকলের মুখে থাকে চওড়া হাসি।
এর বাইরে রয়েছে আরেকটি ঈদ। সেটা হল বড় ঈদ। এই বড় ঈদের সূচনা হয় মৃত্যুর পর থেকে। চলতে থাকে অনন্তকাল। একেবারে জান্নাত পর্যন্ত। যেখানে রয়েছে মৃত্যুহীন জীবন! বার্ধক্যহীন জীবন! কষ্টহীন জীবন!
ফুলে ফলে ভরা সবুজ উদ্যান!
প্রবাহিত ঝর্ণা! পানাহারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা!
সুরম্য অট্টালিকা! মুক্তার মত ছোট ছোট শিশু!
অপরূপা সুন্দরী রমণী!
সবশেষে রয়েছে মহান আল্লাহ তাআলার সাথে দিদার বা দর্শন! এটাই মানব জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার!
এই পুরস্কার লাভ করতে হলে আমাদের আমৃত্যু রোজার চেতনা ধারণ করতে হবে। যাকে বলা হয় তাকওয়া। একেবারে নিষ্পাপ জীবন গঠন করতে হবে। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। তার সব বিধি নিষেধগুলো মেনে চলতে হবে। দুই ধরনের হক আদায় করতে হবে। আল্লাহর হক আর মানুষের হক। সেই সাথে থাকতে হবে জীবনে অসামান্য ত্যাগ। যিনি জীবন দান করেছেন তাঁর জন্য জীবনের সবকিছু উৎসর্গ করতে হবে। নিজের জীবন অপেক্ষাও তাঁকে ভালবাসতে হবে। বিসর্জন দিতে হবে সর্ব প্রকারের ভোগ-বিলাস। বর্জন করতে হবে কুপ্রবৃত্তির সকল চাহিদা।
ছোট ঈদের প্রস্তুতি ছোট। আর বড় ঈদের প্রস্তুতি বড়। ছোট ঈদের প্রস্তুতি নিতে হয় এক মাস ব্যাপী। আর বড় ঈদের প্রস্তুতি নিতে হয় জীবনব্যাপী। এই হল ছোট ঈদ ও বড় ঈদের মধ্যকার মূল তফাৎ।
আজ মুসলিম বিশ্ব ছোট ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে খুবই ব্যস্ত। ঈদ চলে যায় সাথে সাথে বিদায় নেয় রোজা ও কুরবানির চেতনা। তারা আবার ডুবে যায় ভোগ বিলাসে আর সাড়া দেয় যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির তাড়নায়। বর্তমানে সৌদি আরব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেজন্য তাদের জীবনে আনন্দও খুব সীমিত। শিশুদের আর্তনাদে পৃথিবীর বাতাস আজ ভারী। ফিলিস্তিনের আর্তনাদ ঈদের আনন্দকে বড় ফিকে করে দেয়। তাদের ঈদ পালিত হয় বোমা ও বুটের আওয়াজে।
যদি ঈদের প্রকৃত আনন্দ মুসলিম বিশ্ব আস্বাদন করতে চায় তাহলে তাদেরকে বড় ঈদের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। ঈমানী বলে তাদেরকে বলিয়ান হতে হবে। নেক আমলে তাদেরকে শক্তিশালী হতে হবে। প্রতিটি কাজ করতে হবে ইখলাস ও নিষ্ঠার সাথে। দূর করতে হবে জীবনের সকল অন্ধকার। সেই সাথে জীবনের সকল ভেদাভেদ।
মহান আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে দুই ঈদের আনন্দ দান করুন। ঘরে ও বাইরে। জীবনে ও মরণে। মাটির উপরে ও মাটির নিচে। আমিন।
লেখক: মাদরাসা শিক্ষক ও আলেম লেখক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
এমএম/