জেরুজালেমে আল-আকসা মসিজদ প্রাঙ্গণে ‘ডোম অব দ্য রক’-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মুসল্লিরা। অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের পুরনো শহরটি তিন ধর্মের মানুষের তীর্থস্থান। মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি। দশকের পর দশক ধরে ‘স্ট্যাটাস কো’ নামে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে এসব স্থানে প্রবেশাধিকার।
তবে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ইসরায়েলের সরকারগুলো ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে, যার কারণে বাড়ছে উত্তেজনা ও সহিংসতা।
ইসরায়েলের এই লঙ্ঘনের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদ। বহু বছর ধরে ইসরায়েল মুসলমানদের প্রবেশে নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে আসছে। একই সঙ্গে ইহুদিদের উপস্থিতি বাড়ানোর চলছে ঘৃণ্য চক্রান্ত।
বিশেষ করে মুসলমান ও ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব একসঙ্গে পড়লে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে এসব লঙ্ঘন। এ সময় ইসরায়েলি বাহিনী প্রায়ই ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের সরিয়ে দিয়ে ইসরায়েলিদের প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অজুহাতে পুরো আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল, যা মুসলিম দেশগুলোতে সমালোচনার জোয়ার তোলে। রমজান ও ঈদুল ফিতরসহ এই দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল ১৯৬৭ সালের পর প্রথম এমন ঘটনা।
যদিও এই সময়ে ইসরায়েলি নাগরিকদেরও প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়। তথাপি, আশঙ্কা রয়েছে ২০২৫ সালের মতো এবারও ইহুদিদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পাসওভার (১–৯ এপ্রিল) উপলক্ষে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের আল-আকসায় ঢুকে ধর্মীয় আচার পালনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
জেরুজালেমের পুরনো শহরের চতুর্থ শতাব্দীর ‘চার্চ অব দ্য হলি সেপালকার’ও বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল এবং শত বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইস্টার সানডের (৫ এপ্রিল) আগে সেখানে জনসমাগম নিষিদ্ধ করেছে। এই গির্জাটি খ্রিস্টানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী এখানে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই তিনি পুনরুত্থিত হন।
ধর্মীয় স্থানগুলোর জন্য কী নিয়ম রয়েছে?
ঐতিহাসিকভাবে ‘স্ট্যাটাস কো’ হলো এমন একটি নিয়মের সেট, যা বিভিন্ন ধর্ম ও উপসম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগাভাগি করা পবিত্র স্থানগুলোর ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নির্ধারণ করে। এর সূচনা ১৭৫৭ সালে অটোমান সুলতান ওসমান তৃতীয়ের জারি করা এক ফরমান থেকে, যা খ্রিস্টান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধ মেটাতে দেওয়া হয়েছিল।
এই ফরমান মূলত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মালিকানা ও দায়িত্ব অপরিবর্তিত রেখে দেয়, যাতে ভবিষ্যতে সংঘাত এড়ানো যায়।
১৮৫২ ও ১৮৫৩ সালে এটি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। তখন গ্রিক অর্থোডক্স ও রোমান ক্যাথলিক গির্জার বিরোধ ক্রিমিয়ান যুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জেরুজালেমের পুরনো শহর:
১৮৭৮ সালের বার্লিন চুক্তির মাধ্যমে এই ‘স্ট্যাটাস কো’ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায় এবং জেরুজালেমের বিভিন্ন পবিত্র স্থানে তা সম্প্রসারিত হয়। সেখানে বলা হয়, ‘পবিত্র স্থানগুলোর বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না’। আজও এটি ধর্মীয় স্থান পরিচালনায় একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত।
আল-আকসা মসজিদে ‘স্ট্যাটাস কো’ কী বলে?
আল-আকসা মসজিদ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান, মক্কা ও মদিনার পরেই এর অবস্থান। জেরুজালেমের পুরনো শহরে অবস্থিত ১৪ হেক্টরের এই কমপ্লেক্সে রয়েছে—ডোম অব দ্য রক, আল-কিবলি মসজিদ, বিভিন্ন প্রাঙ্গণ ও স্থাপনা।
এখানেই রয়েছে ‘ফাউন্ডেশন স্টোন’, যেখান থেকে ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী মহানবী মুহাম্মদ (সা.) মেরাজে গমন করেন।
ইহুদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই স্থানেই প্রাচীন প্রথম ও দ্বিতীয় মন্দির ছিল। তাই এটি তাদের কাছেও অত্যন্ত পবিত্র। পশ্চিম প্রাচীর (ওয়েস্টার্ন ওয়াল), যা মুসলিমদের কাছে বোরাক প্রাচীর নামে পরিচিত, ইহুদিদের জন্য সবচেয়ে পবিত্র প্রার্থনার স্থান। খ্রিস্টানদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় স্থান।
দীর্ঘদিন ধরে ‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী আল-আকসা পুরোপুরি মুসলমানদের ধর্মীয় স্থান হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলেও এই মালিকানা স্বীকৃত হয়। এই ব্যবস্থায় মুসলিম কর্তৃপক্ষই আল-আকসায় প্রবেশ, নামাজ আদায়, রক্ষণাবেক্ষণ ও খনন কাজের দায়িত্ব পালন করে।
বর্তমানে কে নিয়ন্ত্রণ করে?
টোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৯২৩ সালে জেরুজালেম ব্রিটিশদের অধীনে আসে। জেরুজালেম ইসলামিক ওয়াকফের মাধ্যমে আল-আকসার তত্ত্বাবধান করত সুপ্রিম মুসলিম কাউন্সিল। ১৯২৪ সালে এই কাউন্সিল হাশেমি বংশের রাজা হুসাইন বিন আলীকে এর অভিভাবকত্ব নিতে আহ্বান জানায়।
বর্তমানে জর্ডানের বাদশাহর তত্ত্বাবধানে ওয়াকফ কর্তৃপক্ষই আল-আকসা পরিচালনা করছে।
১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। ওয়েস্টার্ন ওয়ালে পৌঁছেই তারা পাশের মরোক্কান কোয়ার্টার ধ্বংস করে প্রার্থনার স্থান তৈরি করে। এই ঘটনাকে ‘স্ট্যাটাস কো’ ভঙ্গের প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দখলদার শক্তির সেই ভূখণ্ডে সার্বভৌমত্ব নেই এবং স্থায়ী পরিবর্তন আনা উচিত নয়। তারপরও ইসরায়েল আল-আকসায় নিরাপত্তা ও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে আর ওয়াকফ কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে চুক্তিতে ইসরায়েল জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোতে জর্ডানের অভিভাবকত্ব স্বীকার করে। তবুও দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর থেকে ইসরায়েল বারবার এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াকফের কর্তৃত্ব সীমিত করা, পুলিশি পাহারায় বসতি স্থাপনকারীদের নিয়মিত প্রবেশের অনুমতি দেওয়া, এমনকি সেখানে ইহুদি প্রার্থনা চালুর অনুমোদন।
আল-আকসায় যা যা ঘটেছে?
১৯৬৭ সালের পর বহুবার আল-আকসা ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে এক অস্ট্রেলীয় নাগরিক আগুন ধরিয়ে দেয়। ১৯৮০-এর দশকে বোমা হামলার পরিকল্পনাও হয়েছিল।
১৯৯০ সালে নতুন মন্দির স্থাপনের চেষ্টা ঠেকাতে গিয়ে প্রতিবাদে ২১ ফিলিস্তিনি নিহত হন। ১৯৯৬ সালে টানেল খোলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ৭৪ ফিলিস্তিনি ও ১৬ ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হয়।
২০০০ সালে এরিয়েল শ্যারনের আল-আকসা সফর দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সূচনা করে। এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়।
২০২১ সালে শেখ জাররাহ এলাকায় উচ্ছেদের প্রতিবাদের সময় ইসরায়েলি বাহিনী মসজিদে অভিযান চালায়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস তাদের হামলার একটি কারণ হিসেবে আল-আকসার এই ঘটনাগুলো উল্লেখ করে
অন্যান্য স্থানেও উত্তেজনা:
শুধু আল-আকসা নয়, অন্যান্য পবিত্র স্থানেও উত্তেজনা দেখা গেছে। বেথলেহেমের রাহেলের সমাধি (মুসলমানদের কাছে বিলাল বিন রাবাহ মসজিদ) নিয়েও বিরোধ রয়েছে।
হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদেও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত রয়েছে।
গির্জাগুলোর পরিস্থিতি
‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী অনেক গির্জা বিভিন্ন খ্রিস্টান সম্প্রদায় ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে।
২০১৮ সালে হলি সেপালকার গির্জা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় ইসরায়েলি নীতির প্রতিবাদে। এমনকি গির্জার ভেতরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
এই গির্জার একটি বিশেষ বিষয় হলো ‘অচল মই’। তিন শতাব্দী ধরে একই জায়গায় রাখা একটি কাঠের মই, যা সরানো যায় না।
আল-আকসা থেকে শুরু করে অন্যান্য পবিত্র স্থান সবখানেই ‘স্ট্যাটাস কো’ ভাঙনের অভিযোগ বাড়ছে। এর ফলে শুধু ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক উত্তেজনাও ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
জেডএম/