সন্ধ্যার পর উঠোনে মাদুর পেতে সবাই গোল হয়ে বসেছে। আকাশভরা তারা। সামান্য বাতাস বইছে। আবহাওয়া শান্ত। নাতি-নাতনিদের মনে আগ্রহ। দাদা আসলেই একজন বলল, দাদু, মক্কা বিজয়ের পর কি সবাই মুসলমান হয়ে গিয়েছিল?
দাদু মুচকি হেসে বললেন, না রে ভাই, সবাই একসঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেনি। মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের শক্তি অনেক বেড়ে গেল। এটা দেখে আরবের কিছু গোত্র, বিশেষ করে হাওয়াযিন ও সাকীফ গোত্রের লোকেরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল, 'এভাবে চলতে থাকলে ইসলামের প্রভাব আরও ছড়িয়ে পড়বে।' এজন্য তারা গোপনে বিশাল এক বাহিনী তৈরি করল। তাদের ইচ্ছা ছিল, মুসলিমদের ওপর হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে তাদের দুর্বল করে দেওয়া।
এই খবর যখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর কাছে পৌঁছাল, তখন তিনি সাহাবিদের নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। এবার তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রায় বারো হাজার সাহাবি— এত বড় মুসলিম বাহিনী আগে কখনো ছিল না।
দাদু একটু থেমে বললেন, জানো, মানুষ যখন খুব শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন কখনো কখনো নিজের শক্তির ওপরই বেশি ভরসা করতে শুরু করে।
একজন নাতি জিজ্ঞেস করল, তাহলে কি সাহাবিরাও এমন করেছিলেন?
দাদু বললেন, সবাই নয়। তবে কিছু মানুষের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, "আজ তো আমাদের সংখ্যা অনেক। আজ আমাদের হারানো কঠিন।" এই কথার মধ্যেই একটা শিক্ষা লুকিয়ে ছিল। কারণ, প্রকৃত বিজয় কখনো শুধু মানুষের সংখ্যা বা অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। বিজয় আসে আল্লাহর সাহায্যে।
ভোরের আলো ফুটতেই মুসলিম বাহিনী হুনাইনের সংকীর্ণ উপত্যকায় প্রবেশ করল। কিন্তু তারা জানত না, শত্রুরা আগেই পাহাড়ের ঢালে ও ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ শোঁ… শোঁ… শোঁ… করে চারদিক থেকে তীর উড়ে আসতে শুরু করল। ঘোড়া ছুটে গেল, উট ছুটে গেল, অনেকেই হঠাৎ দিশেহারা হয়ে পড়লেন। মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ পিছু হটতে শুরু করল।
নাতনিদের একজন অবাক হয়ে বলল, দাদু! তাহলে কি মুসলমানরা হেরে যাচ্ছিল?
দাদু মাথা নেড়ে বললেন, শুরুতে পরিস্থিতি সত্যিই খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল।
দাদুর কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল। তিনি বললেন, সবাই যখন ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল, তখন একজন মানুষ একচুলও পিছিয়ে যাননি। তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি নিজের বাহনের ওপর দাঁড়িয়ে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, 'আমি আল্লাহর নবী, এতে কোনো মিথ্যা নেই। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।' তাঁর চারপাশে অল্প কয়েকজন সাহাবি পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এরপর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের ফিরে আসার আহ্বান জানালেন। সেই আহ্বান শুনে একে একে সাহাবিরা আবার ফিরে এলেন। তাদের হৃদয়ে আবার সাহস ফিরে এল।
যুদ্ধ আবার শুরু হলো। এবার মুসলিমদের মনে ছিল না নিজের সংখ্যার অহংকার। ছিল শুধু আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। আল্লাহ তাআলা তাঁদের অন্তরে প্রশান্তি ও সাহস দান করলেন। ধীরে ধীরে যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল।
যারা একটু আগে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল, তারাই আবার বীরের মতো লড়াই করল। অবশেষে হাওয়াযিন ও সাকীফের বাহিনী পরাজিত হলো। আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দান করলেন এবং তারা বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করল।
দাদা বললেন, এই ঘটনার কথা আল্লাহ তাআলা কুরআনেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, "হুনাইনের দিন তোমাদের সংখ্যা তোমাদেরকে গর্বিত করেছিল; কিন্তু তা তোমাদের কোনো উপকারে আসেনি… অতঃপর আল্লাহ তাঁর রাসুল ও মুমিনদের ওপর তাঁর প্রশান্তি নাজিল করলেন।"-সূরা আত-তাওবা: ২৫–২৬
দাদু বললেন, দেখো, আল্লাহ যেন আমাদের শেখাচ্ছেন— সংখ্যা, সম্পদ কিংবা শক্তি কখনো বিজয়ের নিশ্চয়তা নয়। যদি আল্লাহর সাহায্য না থাকে, তাহলে বড় বাহিনীও দুর্বল হয়ে যায়।
গল্প শেষ করে দাদু নাতি-নাতনিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, হুনাইনের যুদ্ধ শুধু একটি যুদ্ধের গল্প নয়। এটি মানুষের অন্তরের গল্প। যখন মানুষ নিজের শক্তি নিয়ে অহংকার করে, তখন সে দুর্বল হয়ে যায়। আর যখন সে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে, তখন ছোট শক্তিও বড় বিজয় এনে দিতে পারে। তোমরা জীবনে কখনো নিজের বুদ্ধি, অর্থ, শক্তি বা ক্ষমতা নিয়ে অহংকার করবে না। পড়াশোনা, কাজ, পরীক্ষা কিংবা জীবনের যেকোনো কঠিন মুহূর্তে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে।
হুনাইনের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল— তাওয়াক্কুল, বিনয় এবং আল্লাহর সাহায্যের ওপর অটল বিশ্বাসই প্রকৃত বিজয়ের চাবিকাঠি।
দাদা বললেন, নবী জীবনের গল্প তোমাদের ভালো লাগছে তো! সবাই উত্তর দিল, জি দাদু ভাই। দাদা বললেন, তাহলে আগামীকালও গল্প হবে, নবীজির গল্প।
গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ২৫)
লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী
চলবে....
আইও/