বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ।। ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
ইসলামি বইমেলায় লিটলম্যাগ কর্নার না রাখায় ছাত্র জমিয়তের ক্ষোভ এমপিদের নম্বর হ্যাক করে টাকা দাবি, সতর্ক করলেন চিফ হুইপ ধর্মীয় নেতা ও সেবাকর্মীদের জন্য ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ: ধর্মমন্ত্রী মক্কা বিজয়—ক্ষমার সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত র‌্যাব বিলুপ্ত, সংসদে নতুন বাহিনী ‘এসআরবি’ বিল পাস ড. ইউনূসকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে: হাইকোর্টের রায় ‘ভারতের ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনও প্রতিনিধি অংশ নেবে না’  যাচাই বাছাই ছাড়া সংবাদ সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে: হাবিবুর রশিদ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ ইলম, আমল ও সমাজসংস্কারে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এনায়েতুল্লাহ বদরপুরী (রহ.)

মক্কা বিজয়—ক্ষমার সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

নবী জীবনের গল্প সামনে যত এগোচ্ছে, নাতি-নাতনিদের মধ্যে কৌতুহল তত বাড়ছে। তারা সকাল সকাল নিজেদের পড়ালেখা শেষ করে বসে যায়। দাদার কাছ থেকে গল্প শোনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। দাদাও ক্লান্তিহীনভাবে তাদেরকে নবী জীবনের গল্প শোনায়।

দাদা গল্পের আসরে উপস্থিত হলেন। চেয়ারে বসার সাথে সাথে এক নাতি প্রশ্ন করলো, দাদু, আজ কি সেই গল্প বলবে, যেদিন নবীজি আবার তাঁর নিজের শহর মক্কায় ফিরে গিয়েছিলেন?

দাদা মুচকি হেসে বললেন, হ্যাঁ দাদুভাই, আজ আমরা শুনব এমন এক বিজয়ের গল্প, যেখানে তলোয়ারের চেয়ে ক্ষমার শক্তি অনেক বড় হয়ে উঠেছিল।

দাদা একটু থেমে বলতে শুরু করলেন—

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর আরবজুড়ে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। অনেক মানুষ সত্যকে চিনতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল, যুদ্ধের দিনগুলো হয়তো শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু সবাই শান্তি চায়নি।

কুরাইশদের মিত্র গোত্র বানু বকর এক রাতে হঠাৎ মুসলিমদের মিত্র বানু খুযাআ গোত্রের ওপর আক্রমণ চালাল। শুধু তাই নয়, কুরাইশের কিছু লোকও গোপনে তাদের সাহায্য করল। এতে হুদায়বিয়ার সন্ধি ভেঙে গেল।

অত্যাচারিত খুযাআ গোত্রের কয়েকজন প্রতিনিধি অনেক কষ্ট করে মদিনায় এসে নবীজির সামনে দাঁড়ালেন। তারা বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের সাহায্য করুন। আমাদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে।"

দাদা বললেন, নবীজি কখনো তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতেন না। তিনি প্রথমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করলেন। কিন্তু কুরাইশ নেতারা নিজেদের ভুল স্বীকার করল না। তখন আর কোনো উপায় রইল না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দশ হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মক্কার পথে রওনা হলেন।

এক নাতি বলল, দাদু, তারা কি যুদ্ধ করতে যাচ্ছিলেন?

দাদা মাথা নেড়ে বললেন, না দাদুভাই। তাঁর উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া ছিল না। নবীজি চেয়েছিলেন রক্তপাত ছাড়াই আল্লাহর ঘর কাবাকে শিরকের কলুষতা থেকে মুক্ত করতে।

রমজান মাসের এক রাতে। মুসলিম বাহিনী মক্কার চারদিকে শিবির স্থাপন করল। হাজার হাজার আগুনের আলো মরুভূমিকে আলোকিত করে তুলল। মক্কার লোকেরা দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেল। তাদের নেতা আবু সুফিয়ান মুসলিম শিবিরে এসে বুঝতে পারলেন, সত্যকে আর থামিয়ে রাখা যাবে না। পরে তিনিও ইসলাম গ্রহণ করলেন। অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন।

৮ হিজরির ২০ রমজান। যে শহর একদিন নবীজিকে কষ্ট দিয়ে বের করে দিয়েছিল, আজ তিনি সেই শহরে ফিরে আসছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কী জানো?

বিজয়ীর মতো বুক ফুলিয়ে নয়। তিনি এতটাই বিনয়ী ছিলেন যে, তাঁর মাথা উটের পিঠে নত হয়ে ছিল। তিনি বারবার আল্লাহর প্রশংসা করছিলেন।

দাদা বললেন, এটাই ছিল সত্যিকারের বিজয়ীর পরিচয়। সংঘর্ষ ছাড়াই পুরো মক্কা শান্তিপূর্ণভাবে মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে এল।

এরপর নবীজি সরাসরি কাবা শরিফে গেলেন। কাবাঘরের চারপাশে তখন অসংখ্য মূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি একে একে সেগুলো অপসারণ করতে লাগলেন এবং আল্লাহর বাণী তিলাওয়াত করলেন-

"সত্য এসে গেছে, আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।"-সূরা আল-ইসরা: ৮১)

এরপর এল ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। যারা বছরের পর বছর তাঁকে অপমান করেছিল, যারা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, যারা তাঁর সাহাবিদের নির্যাতন করেছিল, যারা তাঁকে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল, আজ তারা সবাই মাথা নিচু করে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

তারা ভাবছিল— আজ বুঝি কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। সবাই অপেক্ষা করছে। ঠিক তখনই দয়ার নবী বললেন, 'আজ তোমাদের প্রতি কোনো ভর্ৎসনা নেই। তোমরা সবাই মুক্ত।'

দাদা ধীরে ধীরে বললেন, দাদু ভাইয়েরা, পৃথিবীর ইতিহাসে বিজয়ী হয়ে এমন ক্ষমা খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছেন।

নাতি-নাতনিদের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। একজন বলল, দাদু, যারা এত কষ্ট দিয়েছিল, তাদেরও ক্ষমা করে দিলেন?

দাদা মৃদু হেসে বললেন, হ্যাঁ দাদুভাই। কারণ নবীজি মানুষের হৃদয় জয় করতে এসেছিলেন, প্রতিশোধ নিতে নয়। এই ক্ষমা মানুষের মনকে বদলে দিল। অনেকেই বুঝতে পারল, এমন মহান চরিত্র কোনো সাধারণ মানুষের হতে পারে না। এরপর অসংখ্য মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরবের সর্বত্র ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ল।

দাদা গল্প শেষ করে বললেন, মনে রেখো, প্রকৃত বিজয় শুধু শত্রুকে হারানো নয়। প্রকৃত বিজয় হলো ক্ষমা করতে পারা, দয়া দেখানো এবং মানুষের হৃদয় জয় করা। নবীজি আমাদের শিখিয়েছেন—ক্ষমতা হাতে থাকলেও যে ক্ষমা করতে পারে, সেই-ই প্রকৃত বিজয়ী। আর হ্যাঁ, আগামীকাল তোমাদেরকে নবী জীবনের আরেকটি গল্প শোনাব ইনশাআল্লাহ। তোমরা প্রস্তুত থেকো।

নাতিনাতনিরা ইনশাআল্লাহ বলে নীরবে বসে রইল। আজকের গল্প থেকে তাদের ছোট্ট মনে যেন একটি নতুন শিক্ষা চিরদিনের জন্য গেঁথে গেল— ক্ষমাই সবচেয়ে বড় শক্তি।

গল্পে গল্পে প্রিয় নবীজি (পর্ব: ২৪)

লেখক: আকিদুল ইসলাম সাদী

চলবে....

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ