নিজস্ব প্রতিবেদক
ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার শক্তি কারও নেই। তবে ইসলামি কার্যক্রমের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কা বাইরের শত্রুতা, হিংসা কিংবা অপপ্রচার নয়; বরং নিজেদের কাজের ত্রুটি, আমলে ইখলাসের ঘাটতি ও আত্মশুদ্ধির অভাব। নিজেদের মধ্যে রিয়া, লোভ ও ব্যক্তিগত খাহেশাত পূরণের প্রবণতা থাকলে বড় বড় দীনি কার্যক্রমও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত আজিমুশ্বান ইসলাহী ইজতেমায় জুমার নামাজের আগে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম শায়খে বর্ণভী (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি কাফেলা। উত্তর-পূর্ব বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক নানা অসংগতি, সমস্যা ও অন্যায় সংশোধনের লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সংগঠনটি দ্বীনি ও আত্মশুদ্ধিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রতিবছর সেখানে তিন দিনব্যাপী আজিমুশ্বান ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের বর্তমান আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মুফতি রশীদুর রহমান ফারুক বর্ণভী এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তারই অংশ হিসেবে এবার ঢাকায় এ ইজতেমার আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় এ ধরনের আত্মশুদ্ধিমূলক কর্মসূচি শুধু ঢাকাবাসীর জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের জন্যই উপকারী। আগামী দিনে ঢাকায়ও সিলেটের মতো তিন দিনব্যাপী পূর্ণাঙ্গ ইজতেমা আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এ আয়োজন সফল করতে ঢাকাবাসী নিজেদের সাধ্যের সবটুকু দিয়ে সহযোগিতা করবেন বলে আশা করি।
ইসলামি সমাজে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের মতো ইসলাহি কার্যক্রম আমাদের শেকড়ের কাজ। একটি বিশাল বৃক্ষের ডালপালা, পাতা, ফুল ও ফল দৃশ্যমান হলেও মাটির নিচে থাকা শেকড় নীরবে পানি ও পুষ্টি সংগ্রহ করে পুরো বৃক্ষকে সজীব রাখে। শেকড় দুর্বল হয়ে গেলে একসময় পুরো বৃক্ষই প্রাণহীন হয়ে পড়ে। তেমনি ইসলামী সমাজের দৃশ্যমান কার্যক্রম ও অগ্রগতি টিকিয়ে রাখতে আত্মশুদ্ধি ও ইসলাহের মেহনতকে শক্তিশালী করতে হবে।
দেশের ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় চর্চার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে সন্তানদের শৈশব থেকেই কোরআন ও ঈমানের মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অভিভাবকেরা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা রাখছেন। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়ে কোরআন ও ঈমানের মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এ ক্ষেত্রে আলেম-ওলামারা যে ভূমিকা পালন করছেন, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের দিকে ঝুঁকছেন।
ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় জাগরণ নিয়ে যারা বিরূপ মনোভাব পোষণ করছেন, তাদের প্রতি হেদায়েতের দোয়া করে তিনি বলেন, এসব বিরূপতা ও অপপ্রচার ইসলামের অগ্রযাত্রা থামাতে পারবে না। বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকেই বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে নতুন করে জাগরণ শুরু হয়েছে। এ জাগরণ একসময় বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিজয়ের মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তরুণ আলেমদের আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, উম্মতের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার আগে আলেম-ওলামাদের নিজেদের অন্তর পরিশুদ্ধ করা জরুরি। শিক্ষকতা, দ্বীনি খেদমত কিংবা পেশাগত জীবনে প্রবেশের আগে প্রত্যেকের আত্মগঠন সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এ জন্য কোনো মুসলিহ, শায়খ ও মুরুব্বির তত্ত্বাবধানে থেকে নিজের সংশোধন ও রুহানিয়াত জাগ্রত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে তরুণ আলেমদের মধ্যে আত্মশুদ্ধির চর্চা এবং মুরুব্বিদের তত্ত্বাবধানে ইসলাহের মেহনতে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের মধ্যবর্তী সময়ে তরুণ আলেমদের আত্মশুদ্ধির জন্য মাশায়েখদের পরিচালিত মেহনতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা জরুরি। এটি শুধু খানকাহের দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব নয়; বরং সমগ্র উম্মত ও আলেমসমাজের দায়িত্ব।
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা আমাদের সন্তানতুল্য। তোমাদের মাধ্যমে আল্লাহ ভবিষ্যতে অনেক বড় দ্বীনি খেদমত গ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা করি। তাই কর্মজীবনে প্রবেশের আগে একজন মুসলিহ, মুর্শিদ ও মুরুব্বির তত্ত্বাবধানে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
ইসলামী আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, বাইরের শত্রুতা, হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা অপপ্রচার আমাদের বড় কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে নিজেদের ত্রুটি। আমলে ইখলাসের ঘাটতি, রিয়া, লোভ কিংবা আত্মশুদ্ধি ছাড়া ব্যক্তিগত খাহেশাত পূরণের প্রবণতা আমাদের সুমহান কাজগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে হজরত মুসা (আ.)-এর যুগের বালাম ইবনে বাউরার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শত্রুপক্ষ যখন সরাসরি মোকাবিলায় সফল হতে পারেনি, তখন পাপাচারের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত থেকে একটি বাহিনীকে বঞ্চিত করার কৌশল নিয়েছিল। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীলদের কর্মীদের নৈতিক ও আত্মিক সংশোধনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ইসলাহের মারকাজগুলোকে তরুণ প্রজন্মের আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনের কাজে আরও বেশি মনোযোগী হওয়ার অনুরোধ করেন।
এমএম/