|| ইমরান ওবাইদ ||
হজ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ স্তম্ভের একটি। কুরআনে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর স্পষ্টভাবে হজ ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ।’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৭)
ইসলামের অন্যান্য ফরজের মতো হজের গুরুত্বও অনেক। হাদিসে আছে, ঈমান ও জিহাদের পরই হজের স্থান। হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর কোনটি? তখন তিনি বলেন, হজ্জে মাবরুর। (সহিহ বুখারি: ১৫১৯)
হজ্জে মাবরুরের ফজিলত বিষয়ক হাদিসও বর্ণিত হয়েছে অনেক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হজ্জে মাবরুরের বিনিময় কেবল জান্নাত। (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩, সহিহ মুসলিম: ১৩৪৯)
হাজিদের বিশেষ মর্যাদার কথাও বর্ণিত হয়েছে হাদিসের পাতায়। এক হাদিসে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হজ ও ওমরাহকারীরা হচ্ছেন আল্লাহর দাওয়াতি কাফেলা। তারা আল্লাহ তায়ালার নিকট দোয়া করলে তিনি তা কবুল করেন এবং তারা তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন।’ (মেশকাত শরিফ: ২৫৩৬)
হজ ফরজ হওয়ার শর্তাবলি
পবিত্র হজ ফরজ হওয়ার জন্যও নির্দিষ্ট কিছু শর্ত রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে শর্তগুলো পাওয়া
যায়, তাহলে তার ওপর হজ ফরজ। অলসতা না করে হজ আদায় করা কর্তব্য। শর্তগুলো হলো—
এক. মুসলমান হওয়া।
দুই. আকেল অর্থাৎ, বিবেকবান হওয়া, পাগল না হওয়া।
তিন. বালেগ অর্থাৎ, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া।
চার. স্বাধীন হওয়া। অর্থাৎ কারো গোলাম না হওয়া (এটা বর্তমানে পাওয়া যায় না)।
পাঁচ. দৈহিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া।
ছয়. হজে যাওয়া-আসার পথ নিরাপদ হওয়া।
মহিলাদের জন্য হজ আদায় ফরজ হওয়ার বিশেষ শর্ত:
মহিলাদের হজ ফরজ হওয়ার জন্য শুধু সামর্থ্যবান আর প্রাপ্তবয়স্কা হওয়াই যথেষ্ট নয়; উপরে দেওয়া শর্তগুলোর পাশাপাশি তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ শর্ত। তা হলো— স্বামী বা কোনো মাহরাম পুরুষ (যাদের সাথে বিয়ে হারাম, দেখা দেওয়া জায়েজ) সঙ্গে থাকা।
হজের ফরজ
পবিত্র হজ পালনে ফরজ কাজ হচ্ছে তিনটি। এর কোনো একটিও যদি ভুলবশতও ছুটে যায়, তার হজ অসম্পূর্ণ।
এক. ইহরাম বাঁধা।
দুই. উকুফে আরাফা (অর্থাৎ, ৯ জিলহজ জোহর থেকে ১০ জিলহজ ফজরের আগপর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা)।
তিন. তাওয়াফে জিয়ারাহ। (১০ জিলহজ ভোর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোনো সময় পবিত্র কাবা তাওয়াফ করা।)
হজের ওয়াজিব
হজের ওয়াজিব ৭টি। কেউ যদি এর কোনো একটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয় বা ভুলবশত ছুটে যায়, তাহলে দম (জরিমানা) দিতে হবে।
এক. আরাফা থেকে মিনায় ফেরার পথে মুজদালিফায় ১০ জিলহজ ভোর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কিছু সময় অবস্থান করা।
দুই. সাফা ও মারওয়া সায়ি করা বা দৌড়ানো।
তিন. ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ জামারায় শয়তানকে পাথর মারা।
চার. তামাত্তু ও কিরান হজের ক্ষেত্রে কোরবানি করা।
পাঁচ. মাথার চুল মুণ্ডন করা বা চুল ছোট করে ইহরাম ত্যাগ করা।
ছয়. বিদায়ী তাওয়াফ করা।
সাত. মিকাত বা নির্ধারিত সীমা পার হওয়ার আগেই ইহরাম বাঁধা। (কোনো কোনো বর্ণনা মতে, মদিনা শরিফে গিয়ে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা জিয়ারত করা।)
হজের সুন্নত
হজের সুন্নত অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
* বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করা।
* তাওয়াফে কুদুম বা প্রথম তাওয়াফ করা (ইফরাদ ও কিরান হজকারীর জন্য)।
* তাওয়াফের সময় রমল করা (প্রথম তিন চক্কর সৈনিকের মতো বীরদর্পে চলা)।
* খলিফা অথবা তাঁর প্রতিনিধি তিন দিন তিন স্থানে খুতবা প্রদান করা বা ভাষণ দেওয়া। (৭ জিলহজ কাবার হারাম শরিফে, ৯ জিলহজ আরাফায় মসজিদে নামিরাতে, ১১ জিলহজ মিনায়।)
* ৮ জিলহজ মক্কা শরিফ থেকে মিনায় গিয়ে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজর—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা এবং রাতে সেখানে অবস্থান করা।
* ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফার দিকে রওনা হওয়া।
* উকুফে আরাফা বা আরাফায় অবস্থানের জন্য সকালে (দুপুরের পূর্বে) গোসল করা।
* ৯ জিলহজ আরাফায় অবস্থান করে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফার দিকে রওনা করা।
* ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় রাত যাপন করা।
* মিনা থেকে মক্কা শরিফ প্রত্যাবর্তনের সময় ‘মুহাচ্ছার’ নামের জায়গায় কিছু সময় অবস্থান করা।
লেখক: সাব-এডিটর, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম
আইও/