বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ ।। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। ৪ জিলহজ ১৪৪৭


ইসলামে শ্রমিকের অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| মুফতী রবিউল ইসলাম রফিক ||

বছর ঘুরে আবার দুয়ারে হাজির মে মাস। শ্রমিকের অধিকার আদায় আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এ মাসের ১ তারিখ সারা বিশ্বে পালিত হয় ‘বিশ্ব শ্রমিক দিবস’। এ দিবসটি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার এবং মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক, দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা।

ইসলাম শ্রমকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করে। ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে যথাযথ নির্দেশনা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ পূর্ণ করা হবে, তখন জমিনে ছড়িয়ে পড়ো; আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।’ (সুরা-৬২ জুমুআহ, আয়াত: ১০)

শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমগ্রহীতার কর্তব্য সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে, নবীজি  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দেন- إِخْوَانُكُمْ خَوَلُكُمْ، جَعَلَهُمُ اللهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ، فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلاَ تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ.  অর্থ: তোমাদের সেবকেরা তোমাদের ভাই। তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের অধীন করেছেন। কারও অধীনে কোনো ভাই থাকলে সে যা খায় তাকেও যেন তা খাওয়ায়, সে যা পরিধান করে তাকেও যেন তা পরায়। তোমরা তাদের ওপর কষ্টকর কাজ চাপিয়ে দিয়ো না। যদি দিতেই হয়, তাহলে তাদেরকে সহযোগিতা কর। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩০)

তাই শ্রমিকের পারিশ্রমিকের পরিমাণ অন্তত এমন হতে হবে, যাতে তাঁর খোরপোশ ও বাসস্থানের বন্দোবস্ত ভালোভাবে হয়ে যায় এবং তাঁর নিজের ও পরিবারের জীবনধারণে কোনো কষ্ট না হয়। হজরত শুআইব (আ.) হজরত মুসা (আ.) কে কাজে নিয়োগ দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ‘আর আমি আপনাকে কষ্টে ফেলতে চাই না; ইনশাআল্লাহ! আপনি আমাকে কল্যাণকামী রূপে পাবেন।’ (সুরা-২৮ কছাছ, আয়াত: ২৭)

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার :

শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ধর্ম ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের কথা বলা হয়েছে। শ্রমিকদের প্রতি সুবিচারের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। ইসলাম শ্রমের প্রতি যেমন মানুষকে উৎসাহিত করেছে (জুম‘আহ ১০), তেমনি শ্রমিকের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পূর্ণ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষকে অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। কারণ যারা মানুষের সুখের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজেদেরকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়, তারাতো মহান আল্লাহর কাছেও মর্যাদার অধিকারী।

শ্রমের মর্যাদা বুঝাতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ خَيْرًا مِنْ أَنْ يَّأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدَيْهِ وَإِنَّ نَبِىَّ اللهِ دَاؤُوْدَ عَلَيْهِ السَّلاَمُ كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدَيْهِ- ‘কারো জন্য স্বহস্তের উপার্জন অপেক্ষা উত্তম আহার্য আর নেই। আর আল্লাহর নবী দাঊদ (আ.) স্বহস্তে জীবিকা নির্বাহ করতেন’। (সহীহ বুখারী. হাদীস ২০৮০)

শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলাম বদ্ধপরিকর। আর একজন শ্রমিকের সবচেয়ে বড় অধিকার বা দাবী হ’ল, তার শ্রমের যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভ করা। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, أُعْطُوا الْأََجِيْرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَّجِفَّ عَرقُهُ- ‘তোমরা শ্রমিককে তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও’। (ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৪৪৩)

ইসলামে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক :

ইসলামে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক হবে পিতা-সন্তানের ন্যায়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- أَكْرِمُوهُمْ كَكَرَامَةِ أَوْلَادِكُمْ، وَأَطْعِمُوهُمْ مِمَّا تَأْكُلُونَ. তাদেরকে সন্তানের মতো মর্যাদা দাও (আদর-যতœ কর)। তোমরা যা খাও তাদেরকেও খাওয়াও। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৬৯১) এসব ঘোষণার পর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসালাম বলেছেন- لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ سَيِّءُ الْمَلَكَةِ. রূঢ় স্বভাবের মানুষ জান্নাতে যাবে না। চাকর-নফরের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের শাস্তি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলে গিয়েছেন-

عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ الْأَنْصَارِيِّ، قَالَ: كُنْتُ أَضْرِبُ غُلَامًا لِي، فَسَمِعْتُ مِنْ خَلْفِي صَوْتًا: اعْلَمْ أَبَا مَسْعُودٍ، للهُ أَقْدَرُ عَلَيْكَ مِنْكَ عَلَيْهِ، فَالْتَفَتُّ فَإِذَا هُوَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، هُوَ حُرٌّ لِوَجْهِ اللهِ، فَقَالَ: أَمَا لَوْ لَمْ تَفْعَلْ لَلَفَحَتْكَ النَّارُ، أَوْ لَمَسَّتْكَ النَّارُ.

আবু মাসউদ আনাসারী রাযি. বলেন, আমি একদিন গোলামকে মারছিলাম। পেছনে কাউকে বলতে শুনলাম, মনে রেখ আবু মাসউদ, আল্লাহর ক্ষমতা তোমার ওপর এর চেয়েও বেশি। পেছনে ফিরে দেখি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম দাঁড়িয়ে। বললাম, হে আল্লাহার রাসূল, সে আল্লাহর ওয়াস্তে আযাদ। নবীজী বললেন, তুমি এমনটি না করলে আগুন তোমাকে পুড়িয়ে দিত কিংবা বলেছেন, স্পর্শ করত। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৬৫৯)

কাজ করতে গিয়ে মানুষের নানা রকম ভুল হয়ে। ভুল যে মানুষের কতভাবে হতে পারে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আমার উস্তাযে মুহতারাম মুফতী আবদুস সালাম ছাহেব বলতেন, ‘ভুলের কোনো মূলনীতি নেই। ভুল যে কোনোভাবেই হতে পারে। এক সাহাবী নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামকে জিজ্ঞেস করলেন, কর্মচারীকে কত বার মাফ করব? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব। সাহাবী আবার জিজ্ঞেস করেন। নবীজী কোনো উত্তর দেননি। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে নবীজী বলেন-  اعْفُوا عَنْهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ سَبْعِينَ مَرَّةً.  প্রতিদিন সত্তর বার ভুল করলে সত্তর বার ক্ষমা করো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫১৬৪)

নিজের পরম আত্মীয়ের মতোই শ্রমিকের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করা, পরিবারের সদস্যদের মতই তাদের আপ্যায়ন করা, শ্রমিকের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার প্রতিটি মুহূর্তের প্রতি মালিকের খেয়াল রাখা এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করা মালিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শ্রমিককে তার প্রাপ্য পূর্ণভাবে যথাসময়ে প্রদান করাও মালিকের একটি প্রধান দায়িত্ব। অনেক সময় শ্রমিকদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মালিকগণ উপযুক্ত মজুরী না দিয়ে যৎ সামান্য মজুরী দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার বঞ্চিত করে। এ ধরনের মালিকদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন এরশাদ করেন, ‘মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ক্বিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে। তাদের মধ্যে একজন হ’ল- وَ رَجُلٌ أسْتَأْجَرَ أَجِيْرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ- ‘যে শ্রমিকের নিকট থেকে পূর্ণ শ্রম গ্রহণ করে অথচ তার পূর্ণ মজুরী প্রদান করে না’। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২২৮৩)

অপরদিকে একজন শ্রমিকের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো- চুক্তি মোতাবেক মালিকের প্রদত্ত কাজ অত্যন্ত নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে সম্পাদন করা। 

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, إِنَّ اللهَ تَعَالَى يُحِبُّ مِنَ الْعَامِلِ إِذَا عَمِلَ أَنْ يُّحْسِنَ- ‘আল্লাহ ঐ শ্রমিককে ভালবাসেন যে সুন্দরভাবে কার্য সমাধা করে’। (ফাইযুল কদীর ২/২৮৭) কিন্তু কোন কোন শ্রমিক মালিকের কাজে ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত হাযিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বেতন উত্তোলন করে থাকে, যা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এজন্য তাকে ক্বিয়ামতের মাঠে অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন হ’তে হবে। আর যদি শ্রমিক তার উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে, তাহলে তার জন্য নবীজি আলাইহিস সালাম দ্বিগুণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করে বলেন, ‘তিন শ্রেণির লোকের দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো-

وَالْعَبْدُ الْمَمْلُوْكُ إِذَا أَدَّى حَقَّ اللهِ وَ حَقَّ مَوَالِيْهِ ‘ঐ শ্রমিক যে নিজের মালিকের হক্ব আদায় করে এবং আল্লাহর হক্বও আদায় করে’। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৭)

শ্রমিকদের যে বিষয়টি মনে রাখা জরুরি তা হলো- বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা রয়েছে। সুতরাং মে দিবসে যেকোন ব্যক্তির যানবাহন চালানোর বা শিল্প প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট খোলা রাখারও অধিকার আছে। তাতে বাধাদানের অধিকার কারো নেই। কিন্তু আমাদের দেশে মে দিবসে যদি কেউ যানবাহন চালায় বা দোকানপাট খোলা রাখে তাহ’লে উচ্ছৃংখল কিছু শ্রমিককে গাড়ি ভাংচুর করতে এবং দোকানপাট জোর করে বন্ধ করে দিতে দেখা যায়। যা আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়। অনুরূপভাবে হরতাল-ধর্মঘটও বর্জন করা আবশ্যক।

শেষ কথা, এ সুন্দর পৃথিবীর রূপ-লাবণ্যতায় শ্রমিকদের কৃতিত্বই অগ্রগণ্য। কিন্তু শত আক্ষেপ! সভ্যতার কারিগর এ শ্রেণিটি সর্বদাই উপেক্ষিত, অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত। উদয়াস্ত উষ্ণ ঘামের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নিয়ে খেটে যে শ্রমিক তার মালিকের অর্থযন্ত্রটি সচল রাখে, সেই মালিকেরই অবিচারে শ্রমিকদের অচল জীবনটি আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এটাকে সেই মৌমাছির সাথে তুলনা করা যায়, যারা দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করে চাকে সঞ্চয় করে, কিন্তু তার ভাগ্যে একফোঁটা মধুও জোটে না। সুতরাং সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় মালিক-শ্রমিকের বৈরিতাপূর্ণ সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা ও শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আর এজন্য সর্বাগ্রে উচিত ইসলাম প্রদর্শিত মালিক-শ্রমিক নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ ও বাস্তবায়ন। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন-আমীন!

লেখক: মুহাদ্দিস, মারকাযুল কুরআন মাদরাসা, আদিতমারী, লালমনিরহাট

আইও/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ