সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ।। ২৯ চৈত্র ১৪৩২ ।। ২৫ শাওয়াল ১৪৪৭


হজ গমনের পূর্ব প্রস্তুতি ও কিছু করণীয়

নিউজ ডেস্ক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: সংগৃহিত

|| যাকারিয়া মাহমুদ || সাব-এডিটর

হজ—মুমিনের অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। মুমিন-হৃদয়ে ঝলঝল করতে থাকা এক আকুল প্রত্যাশার নাম। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সময় থেকে যুগ-যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে এই মহান ইবাদত। আরবি বর্ষের ‘জিলহজ’ মাস এ ইবাদতের মৌসুম। মৌসুম আসার আগেই মুমিন-মুসলিম সমাজে শুরু হয় তোড়জোড়। প্রাণে বাজে খুশির কোরাস। প্রভুপ্রেমের রহমধারা মুষলধারে বর্ষিত হয়—হৃদয় জমিনে। তবে যারা সামর্থহীন—তাদের বুকে বয় ব্যাথার জোয়ার।

প্রতি বছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে হজের প্রস্তুতি। হজ যেহেতু ভিন্নরকম ইবাদত—দৈনন্দিন জীবনে পালিত নয়। তাই হজগমনের পূর্বপ্রস্তুতির অনেক কিছুই অনেকের অজানা। কেউ অজ্ঞ, কেউ-বা জেনেও অসেচতন। তাই এখানে হজ গমনের পূর্ব প্রস্তুতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো—

১. নিয়ত পরিশুদ্ধ করা—সর্বপ্রথম নিয়তকে পরিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন করা আবশ্যক। নিয়তে ত্রুটি থাকলে, হজই নয় শুধু; কোনো আমলই কবুল হয় না। নিয়তের একবিন্দু গড়মিল—ধুলোয় মেশাতে পারে সমস্ত আমল ও সাধনা। রাসুল সা. বলেছেন, সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ০১)

২. হালাল উপার্জন—নিয়ত ঠিক করার পর, উপার্জন হালাল কি না, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি। সুদ-ঘুষ বা যেকোনো ধরনের হারাম সম্পদের সামান্যও যদি হজের ব্যয়-খরচে মিশ্রণ হয়, তাহলে হজ ব্যর্থ হবে। কেননা, হালাল উপার্জন ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন—হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র, তোমরা তা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)

রাসুল সা. বলেছেন, ফরজ আদায়ের পর মুসলমানের আবশ্যক হলো হালাল রিজিক উপার্জন। (বায়হাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৮৩৬৭)

অন্য হাদিসে এসেছে—হারাম ভক্ষণকারীর শরীর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬১৪)

৩. ঋণ পরিশোধ—হজে বেরোবার আগে অবশ্যই সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে বের হওয়া চাই। অন্যের কোনো দাবি-দাওয়া থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত হয়ে রবের দরবারে হাজিরা দেওয়া মুমিনের একান্ত কর্তব্য। কেননা, আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করলে হয়তো তিনি তার বান্দাকে মাফ করে দেবেন, কিন্তু অন্যের হক আল্লাহ তায়ালা কখনোই ক্ষমা করবেন না। রাসুল সা. বলেছেন, ঋণ ছাড়া শহীদের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭৩০)

৫. প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন—সফরে বেরোনোর আগে হজ-ওমরা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মাসায়েল, দোয়া-দুরুদ ও তাসবিহ-তাহলিল ভালোভাবে আত্মস্থ করা। যাতে করে, নিজের সামান্য ত্রুটি বা অজ্ঞতা স্বপ্নের হজকে নষ্ট না করে দেয়। তাছাড়া, প্রয়োজন মাফিক জ্ঞানার্জন ফরজও বটে! রাসুল সা. বলেছেন, দীনের ন্যূনতম জ্ঞান শেখা ফরজ।

৬. আত্মশুদ্ধি—মনকে হিংসা-বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে পবিত্র করতে হবে। এসব অন্তরে থাকলে আল্লাহর নৈকট্য লাভ অসম্ভব। তাই আত্মাকে দুনিয়ার অপবিত্রতা থেকে পরিশুদ্ধ করে একমাত্র আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া চাই। বেশি-বেশি দুরুদ-ইস্তেগফার, জিকির ও কুরআন তেলাওয়াত অন্তর পরিষ্কার করে। হজে বেরোবার আগে—আগে হজ-ওমরা করেছে এমন কারো মুখ থেকে সেখানকার গল্প শোনা যেতে পারে। এতে, অন্তরে আল্লাহ- রাসুলের ভালোবাসা জন্মাবে। হজ-ওমরার ভ্রমণ সংক্রান্ত অসংখ্য বই পাওয়া যায় বাজারে। বেরোবার আগে বেছে বেছে সেসব ভ্রমণকাহিনীর দুএকটা পড়ে নিলেও মন্দ হয় না। এতে আত্মশুদ্ধি যেমন হবে, প্রথম হজযাত্রীদের জন্য হজের পালনীয় নিয়মগুলোও সহজ ও পরিচিত মনে হবে।  

৭. শারীরিক পরিচ্ছন্নতা—নখ-চুল কাঁটা, গোফ ছাটা, নাভির নিচের চুল ইত্যাদি পরিষ্কার করা। কেননা, রাসুল বলেছেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। আর এসব করতে হবে, হজের ইহরাম বাঁধার আগেই। ইহরাম বাঁধার সঙ্গে সঙ্গে এসব কাঁটা-ছাটা নিষিদ্ধ হয়ে যায়, একেবারে ১৩ জিলহজ, হালাল হওয়া অবধি। সুতরাং ইহরাম বাঁধার আগেই সব পরিচ্ছন্ন করতে হবে।

৮. ইহরাম বাঁধার আগে গোসল করা—হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধার আগে শরীর পরিষ্কার ও গোসল করার ব্যাপারে তাগিদ এসেছে হাদিসে। এ সময় গোসল করা সুন্নত।

৯. বিদায়ি নামাজ—হজের সফরে বের হওয়ার আগে অন্তত দুই রাকাত নামাজ পড়ে বের হওয়া। হাদিসে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হওয়ার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়তেন। সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এ আমলে গুরুত্ব দিতেন।

১০. তাওবা ও ক্ষমাপ্রার্থণা করা—সফরে বেরোবার আগে নামাজ পড়ে অবশ্যই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করা। বলা তো যায় না, সফরেই কারো মৃত্যু চলে আসে কিনা! যদি কাবায় পৌঁছানোর আগেই চলে আসে মৃত্যুর পরোয়ানা—তাই সফরে বেরোবার আগেই তাওবা করে নেওয়া উচিত। মূলত, যে কোনো সফরে বেরোবার আগেই তাওবা ও ইস্তেগফার করা উচিত। যেমনটা রাসুল সা. করতেন। হাদিসে এসেছে—রাসুল সা. প্রতিদিন সত্তরবারের অধিক তাওবা করতেন। (সহিহ বোখারি, হাদিস: ২৩২৩)

এছাড়াও সফরের পুরো সময় বেশি-বেশি তালবিয়া পাঠ করা। আল্লাহকে স্মরণ করা। আল্লাহর কুদরত নিয়ে ভাবনা-বিভোর থাকা। তাঁর কাছে রোনাজারি করা। মনে-মনে দোয়া ও ইস্তেগফার পাঠ করা। নমনীয় থাকা। সফরে বেরোবার আগে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে দাবি-দাওয়া মিটিয়ে যাওয়া। কাউকে কষ্ট না-দেওয়া। প্রয়োজন ছাড়া দুনিয়াবি কথাবার্তা না-বলা।

হজ মৌসুম—সজীবতা বয়ে আনুক সবার জীবনে। হৃদয় হোক সুন্দর ও স্বচ্ছন্দ। যাদের কপালে জুটেছে এই মহাসৌভাগ্য—মাকবুল হোক তাদের প্রতিটা রোকন। আর যাদের তাওফিক হয়নি আজও কাবা জিয়ারতের, রওজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণের নবীজিকে সালাম জানানোর—তাদের মনোবাসনা পূরণ হোক শিগগির। এই তো আকুল আরজি মহান রবের দরবারে।

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ