আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘর কাবা শরিফের হেফাজত নিজেই করেন। যারা এর ক্ষতি করতে চায়, তারা শেষ পর্যন্ত নিজেরাই ধ্বংসের মুখে পতিত হয় বলে মন্তব্য করেছেন লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম ইন্টেলেকচুয়াল সোসাইটির সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ ইদরিস নদভি।
সম্প্রতি ভারতের লখনৌর মসজিদে ইবরাহিমি আগা মীরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম ইন্টেলেকচুয়াল সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত এক দারসুল কোরআনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি সূরা আলে ইমরানের ৯৬ নম্বর আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
ড. ইদরিস নদভি বলেন, কাবাতুল্লাহ পৃথিবীর বুকে মানুষের জন্য স্থাপিত প্রথম ঘর। এটি বরকতের উৎস এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়াতের কেন্দ্র। এই পবিত্র ঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিরাপত্তা ও শান্তি। আল্লাহ তাআলা এখানে মানুষের জন্য প্রশান্তি, রহমত ও ইবাদতের অসংখ্য সুযোগ রেখেছেন।
তিনি বলেন, খেদমতে হারামাইন শরিফাইনের অধীনে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখ লাখ হাজি, ওমরাহ পালনকারী ও মুসল্লিদের সুবিধার্থে ব্যাপক পরিসরে আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববিতে পরিচ্ছন্নতা, জমজমের পানি সরবরাহ, ভিড় ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, পথনির্দেশনা, অনুবাদ ও তথ্যসেবা, বিদ্যুৎ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও আলোকসজ্জাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
হারামাইন শরিফাইনের সম্প্রসারণ প্রকল্প, বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জিয়ারতকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা এবং যাতায়াতের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সেবা আল্লাহর মেহমানদের সর্বোচ্চ সুবিধা ও স্বস্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কাবা শরিফের মর্যাদা প্রসঙ্গে ড. ইদরিস নদভি বলেন, কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বায়তুল্লাহকে নিজের ঘর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-কে তিনি এ ঘর তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী ও নামাজ আদায়কারীদের জন্য পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কই বায়তুল্লাহর মর্যাদা ও পবিত্রতাকে আরও স্পষ্ট করে।
তিনি বলেন, কাবা শরিফের উপস্থিতির কারণে কুরাইশরা আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে সম্মান, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা লাভ করেছিল। কোরআনের সূরা কুরাইশেও এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘরের হেফাজত নিজেই করেন। আবরাাহা হাতির বাহিনী নিয়ে কাবা শরিফ ধ্বংসের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আবাবিল পাখির মাধ্যমে আবরাাহা ও তার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেন। একইভাবে ইতিহাসে যারা বায়তুল্লাহর অবমাননা বা এর পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছে, তারাও পরিণামে শিক্ষণীয় পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে।
কুরামিতাদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তারা হাজরে আসওয়াদ দীর্ঘদিন নিজেদের দখলে রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা বায়তুল্লাহর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
ড. ইদরিস নদভি আরও বলেন, বায়তুল্লাহর সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক শুধু আবেগের নয়; এটি গভীর ঈমানি সম্পর্ক। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে কোনো মুসলমান নামাজ আদায় করলেও তার কিবলা এক—কাবাতুল্লাহ। এটি উম্মাহর ঐক্য, তাওহিদ ও ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অন্যতম বড় নিদর্শন।
তিনি বলেন, তাওহিদের সঙ্গে কাবাতুল্লাহর গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং সুন্নাতে নববির সঙ্গে মক্কা ও মদিনার হারামাইন শরিফাইনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এসব পবিত্র স্থানের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধকে ঈমানের অংশ হিসেবে ধারণ করা।
কখনো বায়তুল্লাহ বা হারামাইন শরিফাইনের পবিত্রতার ওপর কোনো আঘাত বা হুমকি দেখা দিলে মুসলিম উম্মাহর ঈমানি দায়িত্ব হলো এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা এবং প্রকৃত তথ্য বিশ্বের সামনে তুলে ধরা বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দারসের শেষ পর্যায়ে বায়তুল্লাহ ও হারামাইন শরিফাইনের সঙ্গে নিজেদের আত্মিক ও ঈমানি সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার জন্য উপস্থিতদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি তাওহিদ ও সুন্নাহর শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির জন্য দোয়া করার আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে লখনৌ শহরের বিভিন্ন শ্রেণির নারী-পুরুষ ও মসজিদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অল ইন্ডিয়া মুসলিম ইন্টেলেকচুয়াল সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি ড. আম্মার আনিস নদগ্রামিও এতে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শেষে মুসলিম উম্মাহ ও সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে হারামাইন শরিফাইনের নিরাপত্তা ও হেফাজতের জন্যও দোয়া করা হয়।
এসএইচ/