আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত ডা. আবদুল এল-সাইদ। দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হয়ে মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে মার্কিন সিনেট নির্বাচনের চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি।
চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে তিনি এই মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারাতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়বেন ৪১ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।
আবদুল এল-সাইদের প্রার্থিতা শুধু তার মিসরীয় বংশোদ্ভূত পরিচয় কিংবা মুসলিম রাজনীতিক হওয়ার কারণে আলোচনায় আসেনি। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পক্ষে অবস্থান, রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানোর দাবি এবং ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীতে মার্কিন অর্থায়নের বিরোধিতা তাকে জাতীয় রাজনীতিতে আলোচিত করে তুলেছে।
তার নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম মূল বক্তব্য ছিল—‘মানি আউট অব পলিটিক্স, মানি ইন ইওর পকেট, হেলথকেয়ার ফর অল’। অর্থাৎ রাজনীতি থেকে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনৈতিক সুবিধা ফিরিয়ে দেওয়া এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
রাজনীতিতে ‘আউটসাইডার’ হিসেবে উত্থান
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বড় ধরনের সমর্থন ছাড়াই মিশিগানের মনোনয়ন দৌড়ে জয় পাওয়ায় এল-সাইদকে দলের ‘আউটসাইডার’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
তবে মার্কিন রাজনীতিতে তার সক্রিয় পথচলা নতুন নয়। ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে তিনি প্রথম ব্যাপকভাবে জাতীয় আলোচনায় আসেন। সেই নির্বাচনে জয় না পেলেও ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি। তখনও তার প্রচারণার প্রধান বিষয় ছিল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো।
২০১৭ সালে গভর্নর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার আগে তিনি ডেট্রয়েট শহরের পাবলিক হেলথ বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১৫ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় শহরের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।
ডেট্রয়েটে দায়িত্ব পালনকালে শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং শতাধিক স্কুলে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
বিল ক্লিনটনের প্রশংসা থেকে রাজনীতিতে অনুপ্রেরণা
এল-সাইদের রাজনৈতিক জীবনের পেছনে ২০০৭ সালের একটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ওই বছর মিশিগান ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন।
এল-সাইদের বক্তব্যের প্রশংসা করে ক্লিনটন পরে অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যেই মন্তব্য করেন। এরপর তার সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেও প্রশংসা করেন সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ধারণা করা হয়, ওই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে এল-সাইদের জনজীবনে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
ইসরায়েল ইস্যুতে কঠোর অবস্থান
এবারের সিনেট নির্বাচনের প্রাইমারিতে এল-সাইদের আলোচনায় আসার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েল বিষয়ে তার অবস্থান।
ইসরায়েলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিরোধিতা করে আসছেন তিনি। তার বক্তব্য, মার্কিন নাগরিকরা কর দেন দেশের রাস্তা, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবার মতো জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয়ের জন্য; অন্য দেশের সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য নয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে মার্কিন অর্থ সহায়তা দেওয়াকে তিনি ‘আমাদের ট্যাক্স ডলারের নিকৃষ্টতম ব্যবহার’ হিসেবেও সমালোচনা করেছেন।
তার এই অবস্থানের কারণে মিশিগানের ইহুদি সম্প্রদায়ের একাংশ তাকে সমর্থন করলেও অন্য একটি অংশ তার বিরোধিতা করেছে।
অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হেইলি স্টিভেন্স ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে ছিলেন। তার নির্বাচনী প্রচারণায় ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সমর্থনও ছিল।
ট্রাম্পের সমালোচনাও এনে দিয়েছে সমর্থন
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতিরও তীব্র সমালোচনা করেছেন এল-সাইদ। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট ভোটারদের একটি অংশ তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এল-সাইদ নিজেও তার প্রচারণায় ট্রাম্পবাদকে পরাজিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মাইক রজার্স ও ‘ট্রাম্পবাদ’কে পরাজিত করতে ডেমোক্র্যাটদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যারা গণতন্ত্র ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বাস করে।
ট্রাম্প অবশ্য এল-সাইদের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এক পর্যায়ে তিনি এল-সাইদকে ‘ইহুদি বিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং অভিযোগ করেন, তিনি ইহুদিদের ও ইসরায়েলকে ভালোবাসেন না।
এল-সাইদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। মিশিগানের ইহুদি ভোটারদের নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি বারবার বলেছেন, তিনি তাদের ঠিক ততটাই নিরাপত্তা দিতে চান, যতটা নিরাপত্তা তিনি নিজের দুই মেয়ের জন্য চান।
বামপন্থী ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী অংশের জনপ্রিয় নেতা বার্নি স্যান্ডার্স এবং আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এল-সাইদকে সমর্থন দিয়েছেন।
করপোরেট অর্থের প্রভাবমুক্ত রাজনীতি, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং বিদেশি সামরিক সহায়তা কমানোর মতো তার অবস্থান দলের প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এল-সাইদ নিজেকে করপোরেশনের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন শ্রমজীবী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার প্রচারণায় ইসরায়েলপন্থী অর্থদাতা এবং দলীয় রাজনীতির প্রচলিত কাঠামোর বিরুদ্ধেও বক্তব্য ছিল।
সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ
মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার পর এখন এল-সাইদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবেন তিনি।
একই সঙ্গে তার বিজয় মিশিগানের রাজনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেওয়া মিশিগানে একজন প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটের সিনেট নির্বাচনে জয় দলটির জন্য বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এল-সাইদ শেষ পর্যন্ত সিনেট নির্বাচনে জয়ী হলে তা শুধু একজন মুসলিম রাজনীতিকের ঐতিহাসিক বিজয় হবে না; বরং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলের মধ্যপন্থী রাজনীতির পরিবর্তে আরও বামঘেঁষা প্রার্থীদের গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা জোরালো হতে পারে। সূত্র: বিবিসি বাংলা
আরএইচ/