|| মুফতি জুবায়ের বিন আব্দুল কুদ্দুস ||
প্রিয় মুসলিম যুবক ভাইয়েরা! গত ২৭ সেপ্টেম্বর হাফপ্যান্ট পরিহিত একজন মুসলিম ভাইয়ের সাথে মেট্রোরেলে ওঠার সময় দায়িত্বশীল ব্যক্তির কথা-কাটাকাটি হয়। এটিকে কেন্দ্র করে যুবক ভাইদের পক্ষ থেকে হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোতে ওঠার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে এবং ১৬০০ যুবক তাতে সাড়া দিয়েছেন বলে তারা প্রকাশ করেছে। তবে মূল কর্মসূচিতে পাঁচজন যুবককে পাওয়া গিয়েছে। তাই আমি আমাদের প্রিয় মুসলিম যুবক ভাইদের সমীপে এই খোলা চিঠি পেশ করছি।
এক. প্রিয় যুবক বন্ধুগণ! আমরা সবাই মুসলমান। আমাদের ধর্ম ইসলাম। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম। এতে পোশাকের বিধানও বিদ্যমান আছে। সুতরাং যিনি ইসলামের বিধান মেনে চলেন, তিনিই প্রকৃত মুসলমান ও সফলকাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
مَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ یُدۡخِلۡہُ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۚ وَ مَنۡ یَّتَوَلَّ یُعَذِّبۡہُ عَذَابًا اَلِیۡمًا
অর্থ: আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত। কিন্তু যে ব্যক্তি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, তিনি তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন। (সূরা আল-ফাতহ, আয়াত নং ১৭)
দুই. প্রিয় মুসলিম তরুণেরা! হাঁটু ও রান ঢেকে রাখাই ইসলামের বিধান। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
عَوْرةُ الرَّجُلِ ما بيْنَ سُرَّتِه إلى رُكْبَتِه
পুরুষের সতর, যা ঢেকে রাখা ফরয, তা নাভি থেকে হাঁটু (র নিচ) পর্যন্ত। (বায়হাকী, হাদীস নং ৩৩৬২)
অপর এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তার রান উন্মুক্ত ছিল। নবীজি তাকে বললেন—
غَطِّ فَخِذَكَ فَإِنَّهَا مِنَ الْعَوْرَةِ
তোমার উরু বা রান ঢেকে রাখো, কেননা উরুও সতরের অন্তর্ভুক্ত। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৭৯৮)
প্রিয় ভাইয়েরা! এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, রান ও হাঁটু উন্মুক্ত রেখে চলাফেরা করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম এবং কবীরা গুনাহ। মনে রাখবেন, একটি কবীরা গুনাহই জাহান্নামে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তিন. প্রিয় মুসলিম যুবক বন্ধুরা! এটিকে কি আপনি পোশাকের অধিকার বলবেন? অথচ এর দ্বারা আপনি নিজেও গুনাহগার হচ্ছেন এবং দর্শকদেরও গুনাহগার বানাচ্ছেন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
يَا عَلِيُّ لَا تُبْرِزْ فَخِذَكَ وَلَا تَنْظُرْ إِلَى فَخِذِ حَيٍّ وَلَا مَيِّتٍ
হে আলী! তুমি নিজের উরু (রান) খুলো না এবং কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির উরুর দিকেও দৃষ্টিপাত করো না। (আবূ দাঊদ, হাদীস নং ৩১৪০)
তাহলে বোঝা গেল, যারা হাফপ্যান্ট বা শর্টপ্যান্ট পরে বের হন, তারা শুধু নিজেরাই গুনাহগার হন না; বরং রাস্তার অসংখ্য নারী-পুরুষকেও গুনাহগার বানিয়ে ছাড়েন।
চার. প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! অশ্লীলতার কি আপনাদের কাছে কোনো সংজ্ঞা আছে? মনে রাখবেন, পোশাকের ক্ষেত্রে এটাই অশ্লীলতা। আজ থেকে ৮-১০ বছর আগেও কি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা এ ধরনের পোশাক পরার কল্পনা করতেন? বরং এ জাতীয় পোশাককে তখন অশালীন, অশ্লীল ও নির্লজ্জ পোশাকই গণ্য করা হতো। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৮-১০ বছর পর কী হবে, ভেবে দেখেছেন কি? এক সময় কি শয়তান আমাদের উলঙ্গ করে ছাড়বে না?
এ ব্যাপারে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন—
یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ لَا یَفۡتِنَنَّکُمُ الشَّیۡطٰنُ کَمَاۤ اَخۡرَجَ اَبَوَیۡکُمۡ مِّنَ الۡجَنَّۃِ یَنۡزِعُ عَنۡہُمَا لِبَاسَہُمَا لِیُرِیَہُمَا سَوۡاٰتِہِمَا ؕ اِنَّہٗ یَرٰىکُمۡ ہُوَ وَ قَبِیۡلُہٗ مِنۡ حَیۡثُ لَا تَرَوۡنَہُمۡ ؕ اِنَّا جَعَلۡنَا الشَّیٰطِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ لِلَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ
অর্থ: হে আদমের সন্তানগণ! শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই ফিতনায় না ফেলে, যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল; তাদের লজ্জাস্থান তাদেরকে দেখানোর জন্য তাদের পোশাক খুলে ফেলেছিল। নিশ্চয় সে নিজে এবং তার দলবল তোমাদেরকে এমন স্থান থেকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। যারা ঈমান আনে না, শয়তানকে আমি তাদের অভিভাবক (বন্ধু) বানিয়ে দিয়েছি। (সূরা আল-আরাফ, আয়াত নং ২৭)
পাঁচ. প্রিয় মুসলিম যুবকবৃন্দ! হাফপ্যান্টের পক্ষে আপনারা ১৬০০ মুসলিম যুবক প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে গেলেন? একবারও কি ভেবে দেখলেন না, এতে আপনি কাকে সন্তুষ্ট করছেন? আপনি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করছেন? আপনাদের এই অভিনব প্রতিবাদ কার পক্ষে বা কার বিপক্ষে? একবার ভাবুন।
ছয়. প্রিয় যুবক ভাই! এই ছোট্ট জীবনের অস্থায়ী যৌবনের ধোঁকায় পড়বেন না। অচিরেই আপনার যৌবন ও সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে, শরীরের শক্তি শেষ হয়ে যাবে, হাড় দুর্বল হয়ে পড়বে, মস্তিষ্ক আর কাজ করবে না। তাই সময় থাকতে মন ও খেয়ালখুশির অনুসরণ ছেড়ে আপনার রবের ইবাদতে ছুটে আসুন।
সাত. প্রিয় মুসলিম তরুণেরা! একটি হাদীস বলে আমি কথা শেষ করতে চাই। আপনি কি হতে পারেন সেই যুবক, যাকে দেখে আল্লাহ আশ্চর্যান্বিত হন, অর্থাৎ যাকে আল্লাহ অত্যন্ত পছন্দ করেন? হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে—
إنَّ اللهَ لَيَعجَبُ مِنَ الشابِّ ليست له صَبْوةٌ
আল্লাহ তাআলা সেই যুবকের ব্যাপারে বিস্মিত হন, যার মধ্যে গুনাহের প্রতি আকর্ষণ নেই। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৭৩৭১) অর্থাৎ তার মধ্যে গুনাহের সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সে আল্লাহর ভয়ে গুনা থেকে বিরত থাকে।
প্রিয় যুবক ভাই! হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি হতে পারেন। আপনার মাঝে সেই যোগ্যতা আছে। আপনি শুধু নিয়ত করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি হতে পারবেন সেই যুবক, যাকে দেখে আল্লাহ বিস্ময় প্রকাশ করেন।
হে আল্লাহ! আপনি আমার যুবক ভাইদেরকে সব ধরনের গুনাহ থেকে রক্ষা করুন, আমীন। তাদেরকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার তাওফীক দান করুন। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা ও অশালীনতা থেকে তাদেরকে হেফাজত করুন।
পরিশেষে আমরা যারা মানুষকে মন্দ কাজ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করি, আমাদের উচিত নম্র ও শালীন ভাষায় কথা বলা। দাওয়াতের ভাষায় কথা বলতে হবে। রুক্ষ ও কঠোর আচরণ পরিহার করতে হবে, কারণ এতে মানুষ দ্বীনবিমুখ হয়ে যায়।
আমাদের মনে রাখা দরকার, আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা ও হারূন আলাইহিমাস সালামকে ফেরাউনের কাছে নম্র ভাষায় দাওয়াত দিতে বলেছিলেন। আর আমরা মূসা ও হারূন আলাইহিমাস সালাম থেকে উৎকৃষ্ট হয়ে যাইনি, আবার হাফপ্যান্ট পরিধানকারী মুসলিম ভাইয়েরাও ফেরাউন থেকে নিকৃষ্ট হয়ে যাননি।
তাই আসুন, ইসলামের নিয়ম মেনে দাওয়াতী কাজ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন, আমীন।
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসা ঢাকা;
খতিব, আজিমপুর ছাপড়া জামে মসজিদ পরিচালক, দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশ
এসএইচ/