শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ ।। ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ ।। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

শিরোনাম :
দাড়ি নবীর সুন্নত, কটাক্ষ করার এখতিয়ার কারও নেই: সংসদে মনিরুল হক চৌধুরী নেতানিয়াহুকে ‘জাহান্নামে পাঠানোর’ হুঁশিয়ারি ইরানের মেজর জেনারেলের ২৮ আগস্ট ২০২৬: ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি কত? তানযীমুল আইম্মাহ ওয়াল উলামার উদ্যোগে দুই পর্বে সিরাত প্রতিযোগিতা নেপালে ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানি ৪৬৯, এখনও নিখোঁজ ১৪৬৮ আমিরে মজলিসের তত্ত্বাবধানে ৫০ হুইলচেয়ার ও ৫০ ভ্যান বিতরণ কুমিল্লায় খেলাফত মজলিসের উলামা ও সুধী সমাবেশ সিরাজগঞ্জে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মতবিনিময় সভা লখনৌয়ে ১২ দিনব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) অধিবেশনের সমাপ্তি কিশোরগঞ্জের জামিআ আবু বকরে ভাষা-সাহিত্যের বিশেষ কোর্স শুরু 

রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, আকাবিরের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি


নিউজ ডেস্ক

নিউজ ডেস্ক
শেয়ার
ছবি: বিশেষ প্রতিনিধি

|| মাওলানা আজগর সালেহী ||

বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি, দাওয়াত, তরিকত ও দীনি শিক্ষার অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন আল্লামা অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ছরওয়ার কামাল আজিজী রহ.। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রাজ্ঞ আলেমে দীন, সফল সংগঠক, বিচক্ষণ রাজনৈতিক নেতা, অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ, লেখক, সমাজসংস্কারক ও নেককার বুজুর্গ। আজীবন ইসলামের বিজয়, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আদর্শ প্রচার এবং দীনি শিক্ষা বিস্তারে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিজীবনে ছিল অসাধারণ বিনয়, নম্রতা, তাকওয়া ও আখলাকের অনুপম দৃষ্টান্ত। জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর মাঝে কোনো অহংকার ছিল না; বরং তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল, সদালাপী ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবকতুল্য রাহবার এবং আকাবির ও আসলাফের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আল্লামা অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ছরওয়ার কামাল আজিজী রহ. ১৯৪৪ সালের ২৩ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলা-এর পদুয়া ইউনিয়ন-এর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আলহাজ হাকিম বক্স চৌধুরী ছিলেন পদুয়া ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং মাতা ছিলেন ফাতেমা খাতুন। তাঁর দাদা আমির হোসাইন ছিলেন সমাজে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। পরিবার থেকেই তিনি দ্বীনদারী, নেতৃত্ব ও সমাজসেবার শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর ভাইদের মধ্যেও সমাজসেবা ও রাজনীতির চর্চা ছিল উল্লেখযোগ্য।

শৈশবে তিনি পদুয়া নয়াপাড়াস্থ হাকিমিয়া আজিজিয়া ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ১৯৫৫ সালে পদুয়া মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে পদুয়া জামিয়াতুল আনওয়ার হেমায়তুল ইসলাম মাদ্রাসা ও রাজঘাটা হোছাইনিয়া আজিজুল উলুম মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। এরপর ১৯৬০ সালে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া মাদ্রাসায়। তিনি ১৯৬৬ সালে দাওরায়ে হাদিস এবং ১৯৬৭ সালে দাওরায়ে তাফসির সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি তিনি সাধারণ শিক্ষাতেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৮ সালে সাতকানিয়া আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন।

উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি সৌদি আরব গমন করেন। পবিত্র কাবা শরিফ সংলগ্ন বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মা'হাদুল হারামুল মক্কী আশ শরীফ-এ ভর্তি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করেন। তাঁর মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ সৌদি সরকার তাঁকে ফ্রি একামা প্রদান করে। পরবর্তীতে তিনি মাদ্রাসাতুল সুলুতিয়া-এ তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার আগেই তিনি শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬৮ সালে টাঙ্গাইল করোটিয়া রোকেয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে রসুলাবাদ ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, কেরানিহাট ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসা এবং পদুয়া আইনুল উলুম দারুচ্ছুন্নাহ মাদ্রাসায় অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন। ১৯৮২ সাল থেকে সুদীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে তিনি পদুয়া জামিয়াতুল আনওয়ার হেমায়তুল ইসলাম মাদ্রাসা-এর প্রধান পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের অন্যতম সুপরিচিত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ দেন।

ইসলামী আন্দোলন ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ইসলামী ছাত্র সমাজের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন এবং ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি-এর কেন্দ্রীয় শ্রম ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে দলের সহ-সম্পাদক, যুগ্ম আহ্বায়ক, সিনিয়র সহ-সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন। ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় আমীর নির্বাচিত হন এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর নায়েবে আমীর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

আল্লামা আজিজী রহ. ছিলেন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি শাহ ওয়ালীউল্লাহ একাডেমি-এর প্রধান পরিচালক, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার সভাপতি, লোহাগাড়া হাকিমিয়া আজিজিয়া মাদ্রাসা ও বায়তুর রহমান জামে মসজিদের সভাপতি এবং শাহ ওয়ালীউল্লাহ গ্রামার স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা ও আদর্শ নাগরিক গঠনের লক্ষ্যে তিনি সারাদেশে পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তোলেন।

তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যপ্রেমী আলেম। বাংলা, আরবি ও উর্দু ভাষায় অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও পুস্তিকা রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, হুজ্জিয়াতে হাদিস, মুদাদ্দিস শাহ আবুল মোজাফ্ফর (রহ.) জীবনীগ্রন্থ, আতিয়বুন্নগম এবং শানে নবুওয়াত। এছাড়া ‘ইসলামী রাষ্ট্র কি ও কেন’, ‘ইয়াদে আছলাফ’ ও ‘পাক, ভারত ও বাংলাদেশের পীর আউলিয়াগণ’ প্রকাশনাধীন ছিল।

তরিকত ও আধ্যাত্মিক জগতেও তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি পীরে কামেল মাওলানা জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ.)-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন এবং ২০০৪ সালে খেলাফত লাভ করেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মাহফিল, সেমিনার ও কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করে ইসলামের দাওয়াত ও ইসলামী আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দেন। এ উপলক্ষে তিনি সৌদি আরব, জর্দান, মালয়েশিয়া, কুয়েত, চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারত সফর করেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও পরহেজগার। ১৯৬৯ সালের ৭ মার্চ সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের খলিফাপাড়ার করিমদাদ চৌধুরীর কন্যা রাবেয়া বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি দুই পুত্র ও সাত কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন।

২০২৬ সালের ৮ মে শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ইন্তেকালের দিন তিনি নিজ হাতে অজু করে আসরের নামাজ আদায় করেন। হজের মৌসুমে, জুমার দিনের এই মৃত্যু অনেকের কাছে তাঁর নেককার জীবনের সৌভাগ্যময় সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

পরদিন শনিবার দুপুর ২টায় আল জামেয়াতুল আনওয়ার হেমায়তুল ইসলাম মাদ্রাসা মাঠে লাখো মুসল্লির অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন আল্লামা কুতুবউদ্দিন নানুপুরী। পরে মাদ্রাসা কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত আলেম-ওলামা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্র ও তাওহিদী জনতার উপস্থিতিতে পুরো এলাকা শোকাহত পরিবেশে পরিণত হয়।

তাঁর ইন্তেকালে ইসলামী অঙ্গন ও জাতীয় রাজনীতিতে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। নেতৃবৃন্দ বলেন, তিনি ছিলেন ইসলাম, দেশ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন একজন মুজাহিদ আলেম। তাঁর ইলমি খেদমত, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা, ত্যাগ, তাকওয়া ও সংগ্রামী জীবন আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। তাঁকে হারিয়ে জাতি একজন বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, সৎ, দীনদার ও বিচক্ষণ রাহবারকে হারালো; যার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

লেখক: সাংবাদিক; সেক্রেটারি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ও সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটি

জেডএম/


সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ সংবাদ